সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হওয়া নিয়ে এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আনা অধ্যাদেশটিকে স্থায়ী আইনে রূপ দিতে গিয়ে খোদ সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর আপত্তির মুখে পড়তে হয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে আনা এই আইনের সংশোধনীতে জামায়াতের এই ‘রহস্যময়’ অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ২০০৯ সালের মূল ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ সংশোধন করে। আগে এই আইনে কোনো ব্যক্তিকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা গেলেও কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার সরাসরি বিধান ছিল না। নতুন এই সংশোধনীর মাধ্যমে “গণহত্যার সাথে জড়িত কোনো সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণ”-এর বিধান যুক্ত করা হয়। এই আইনের ওপর ভিত্তি করেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পথ সুগম হয়েছিল।
অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপ দেওয়ার আগে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির সুপারিশ ছিল ১৫টি অধ্যাদেশ হুবহু এবং ২০টি সংশোধিত আকারে পাস করা। এই সন্ত্রাসবিরোধী আইনটি ছিল সেই ১৫টি পজিটিভ সুপারিশের তালিকার অন্যতম। অথচ সংসদে বিলটি পাসের সময় দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। সরকারি ও বিরোধী দল—উভয় পক্ষের সদস্য থাকা সত্ত্বেও কমিটির সুপারিশ কেন সংসদে প্রশ্নের মুখে পড়ল, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জেগেছে।
বিলটি পাসের কয়েক মিনিট আগে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এটি পাসের জন্য আরও সময় দাবি করেন। তিনি একে একটি ‘স্পর্শকাতর আইন’ হিসেবে অভিহিত করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই আপত্তির পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে:
১. গণহত্যার সংজ্ঞা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি: এই আইনে ‘গণহত্যার সাথে জড়িত সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ করার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে জামায়াতের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হতে পারে কিনা—এমন একটি আশঙ্কা দলটির মধ্যে কাজ করতে পারে। ১৯৭১ সালের গণহত্যার দায়ে জামায়াতের বিচার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
২. আইনের স্থায়ী রূপ: অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জামায়াত আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পক্ষে সোচ্চার থাকলেও, এখন এটি স্থায়ী আইনে পরিণত হওয়ায় তারা সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। কারণ, আজ আওয়ামী লীগকে লক্ষ্য করে তৈরি করা আইন কাল অন্য যেকোনো দলের জন্য গলার ফাঁস হতে পারে।
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার জন্য যে পথ একদিন জামায়াত নিজেই তৈরি করতে সাহায্য করেছিল, আজ সেই পথ স্থায়ী রূপ পাওয়ায় কেন তারা পিছু হটছে—সেটিই এখন দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক রহস্য। বিশ্লেষকদের মতে, “যে অস্ত্র দিয়ে শত্রুকে ঘায়েল করা হয়, সেই অস্ত্র যেন নিজের দিকে না ঘুরে আসে”—এই সাবধানী নীতিই সম্ভবত জামায়াতকে সংসদে আজ কথা বলতে বাধ্য করেছে।