জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বয়স সংশোধনের ক্ষমতা মাঠপর্যায় থেকে সরিয়ে পুরোপুরি ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে ন্যস্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষকে সেবা নিতে ঢাকায় আসতে হচ্ছে, যা তাদের চরম আর্থিক ও মানসিক ভোগান্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সেবা বিকেন্দ্রীকরণের বদলে উল্টো ঢাকামুখী করায় এই পদ্ধতিকে ‘সেবার নামে একধরনের অত্যাচার’ বলে আখ্যায়িত করেছেন খোদ ইসির কিছু কর্মকর্তা।
কেন এই ভোগান্তি?
সম্প্রতি এনআইডি সংশোধনের জন্য ইসি তাদের স্ট্যান্ডার্ড অপারেশন প্রসিডিউর (এসওপি) সংশোধন করেছে। নতুন এসওপি অনুযায়ী, বয়স সংশোধনের এখতিয়ার মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের হাত থেকে নিয়ে এনআইডি মহাপরিচালকের (ডিজি) হাতে দেওয়া হয়েছে। ফলে সামান্য সন বা তারিখ সংশোধনের জন্যও কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ বা দেশের দূরদূরান্ত থেকে মানুষকে ঢাকার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে আসতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একেকবার ঢাকায় এসে থাকা-খাওয়ার পেছনে তাদের তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। অনেক সময় পুরো পরিবারকে শুনানির জন্য ঢাকায় তলব করা হয়। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি বিশাল আর্থিক বোঝা। তদুপরি, বারবার ধর্ণা দিয়েও কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা থাকছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সারাবিশ্বে সেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়। কিন্তু এখানে উল্টো মানুষকে ঢাকায় ডেকে ভোগান্তি বাড়ানো হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে সেবা বিকেন্দ্রীকরণ করা উচিত ছিল। কিছু জটিল ক্ষেত্রে ঢাকায় আপিল শুনানি হতে পারত, কিন্তু ঢালাওভাবে সব ঢাকায় নিয়ে আসা অযৌক্তিক।
ইসির নতুন এসওপি ও সংশোধনের ক্যাটাগরি
সংশোধিত এসওপি অনুযায়ী, আবেদনের জটিলতা বিবেচনা করে সংশোধনের ধরনকে সাতটি ক্যাটাগরিতে (ক, ক-১, খ, খ-১, গ, গ-১ ও ঘ) ভাগ করা হয়েছে:
ক-১ ক্যাটাগরি: করণিক ভুল ও স্বাক্ষর পরিবর্তন। এটি নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সহকারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে।
ক ক্যাটাগরি: মূল নাম ঠিক রেখে বানান সংশোধন। এর ক্ষমতা পেয়েছেন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা।
খ ক্যাটাগরি: বানান পরিবর্তনের কারণে নাম পরিবর্তন হলে তা নিষ্পত্তি করবেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা।
খ-১ ক্যাটাগরি: ধর্ম বা শিক্ষাগত যোগ্যতা পরিবর্তনের কারণে নাম পরিবর্তন হলে তা নিষ্পত্তি করবেন অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা।
গ ক্যাটাগরি: পুরো নাম পরিবর্তনের আবেদন নিষ্পত্তি করবেন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা।
ঘ ক্যাটাগরি: বয়স সংশোধনের সব আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষমতা এখন কেবল এনআইডি মহাপরিচালকের হাতে।
এছাড়া ‘খ’ ও ‘খ-১’ ক্যাটাগরিতে বাতিল হওয়া আবেদন নিষ্পত্তি করবেন অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা। কোনো আবেদন বাতিল হলে ইসির সচিবের কাছে আপিল করা যাবে এবং প্রয়োজনে কমিশনের কাছে রিভিশনের সুযোগও রাখা হয়েছে।
কেন্দ্রীয়করণের পক্ষে ইসির যুক্তি
মাঠ পর্যায়ে এই সেবা বিকেন্দ্রীকরণ করা হলেও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়মের কারণে কমিশন এই কঠোর সিদ্ধান্তে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “এনআইডি সংশোধনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে এবং অসৎ উদ্দেশ্যে বয়স সংশোধনের প্রবণতা রুখতেই এই উদ্যোগ। সবদিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এখন সহজেই সেবা মিলছে এবং অনৈতিক অর্থ লেনদেনও কমেছে।”
সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় দলিলাদি
তথ্য সংশোধনের প্রক্রিয়াও আগের চেয়ে কঠিন করা হয়েছে। বিভিন্ন সংশোধনের জন্য ইসির নির্ধারিত কাগজপত্রগুলো হলো:
১. নামের বানান সংশোধনের জন্য:
অনলাইন জন্ম নিবন্ধন, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ/অ্যাডমিট কার্ড, পাসপোর্ট/ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্টার্ড কাবিননামা (বিবাহিত হলে), স্বামী/স্ত্রী এবং সন্তানদের এনআইডি বা জন্ম/শিক্ষাগত সনদ।
২. নাম সম্পূর্ণ পরিবর্তনের জন্য:
অনলাইন জন্ম নিবন্ধন, কারণ উল্লেখ করে স্বাক্ষরিত আবেদন, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অনাপত্তি পত্র (এনআইডি নম্বরসহ), জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের হলফনামা, উত্তরাধিকার সনদ, AFIS যাচাই রিপোর্ট, কাবিননামা, স্বামী/স্ত্রী/সন্তানদের এনআইডি ও সনদ, চাকরিজীবী হলে চাকরি বহি ও সুপারিশপত্র, অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন বহি, পাসপোর্ট/ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ।
৩. জন্মতারিখ (বয়স) সংশোধনের জন্য:
অনলাইন জন্ম নিবন্ধন, কারণ উল্লেখ করে আবেদনপত্র, ওয়ারিশ সনদ, পিতা-মাতা এবং ভাই-বোনের এনআইডি/জন্ম সনদ/পাসপোর্ট, কাবিননামা, স্বামী/স্ত্রী এবং সন্তানদের এনআইডি ও সনদ, সিভিল সার্জন প্রদত্ত বয়স প্রমাণের রেডিওলজিক্যাল টেস্ট রিপোর্ট, চাকরিজীবী হলে সার্ভিস বুক/এমপিও ও কর্তৃপক্ষের সুপারিশ, অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন বহি, পাসপোর্ট/ড্রাইভিং লাইসেন্স, মুক্তিযোদ্ধা সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ বা অ্যাডমিট কার্ড।
সেবা প্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা আনার কথা বলা হলেও, প্রক্রিয়াগত এই দীর্ঘসূত্রিতা ও ঢাকামুখী ব্যবস্থার কারণে প্রান্তিক পর্যায়ের সাধারণ মানুষ যে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।