ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ যখন বিশ্বকে এক ভয়াবহ পরমাণু ধ্বংসযজ্ঞের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছিল, ঠিক তখনই ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন এক সময়ের সাধারণ মাদ্রাসা শিক্ষার্থী—পাকিস্তানের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির। গত মঙ্গলবার রাতে যখন মধ্যপ্রাচ্যের আগুন পুরো বিশ্বকে গ্রাস করার উপক্রম হয়েছিল, তখন আসিম মুনিরের মধ্যস্থতায় আসা দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে নিশ্চিত পতনের হাত থেকে রক্ষা করেছে।
পাকিস্তানের শীর্ষ জেনারেলরা সাধারণত ব্রিটিশ ধাঁচের বোর্ডিং স্কুল বা অভিজাত মিলিটারি কলেজ থেকে উঠে আসেন। কিন্তু আসিম মুনিরের গল্পটা ভিন্ন। তিনি পড়াশোনা করেছেন সাধারণ এক সরকারি মাদ্রাসায়। এমনকি তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি (PMA) থেকে নয়, বরং ‘অফিসার্স ট্রেনিং স্কুল’ (OTS)-এর মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। আজ সেই মাদ্রাসা ছাত্রই বিশ্বের দুই পরাশক্তিকে এক টেবিলে বসিয়ে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো কঠিন নেতার আস্থা অর্জন করা সহজ কথা নয়। তবে আসিম মুনির তা করেছেন অত্যন্ত সুকৌশলে।
নোবেল প্রাইজ কার্ড: ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য পাকিস্তানের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেওয়া ছিল আসিম মুনিরের এক ‘মাস্টারস্ট্রোক’। এটি ট্রাম্পের হৃদয়ে মুনিরের জন্য বিশেষ জায়গা তৈরি করে দেয়।
দশ দফার প্রস্তাব: আসিম মুনির ইরানের টেবিলে একটি বাস্তবসম্মত ১০ দফার প্রস্তাব রাখেন। যেখানে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার বিনিময়ে ইরানের জন্য কিছু নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক ছাড়ের নিশ্চয়তা ছিল।
হোয়াইট হাউসে রাজকীয় আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প ও মুনিরের যে নতুন সমীকরণ শুরু হয়েছিল, তার প্রতিফলন দেখা গেল গত মঙ্গলবার। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার সময় ট্রাম্প অকপটে আসিম মুনিরের প্রশংসা করেন।
এই মধ্যস্থতার পেছনে আসিম মুনিরের নিজস্ব কৌশলও ছিল স্পষ্ট। তেহরানের পতন মানেই পাকিস্তানে শরণার্থী সংকট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি। তাই ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক ঝালাই করে একদিকে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় এবং অন্যদিকে থমকে থাকা ‘ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন’ প্রকল্পটি সচল রাখাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। গত বছর ভারতের সাথে যুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থান এবং ইমরান খানের সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জয়ী হওয়া আসিম মুনিরকে আজ পাকিস্তানের একছত্র অধিপতিতে পরিণত করেছে।
সাফল্যের জোয়ারের মধ্যেও বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না আসিম মুনিরের। দেশের অভ্যন্তরে ইমরান খান সমর্থকদের তীব্র ক্ষোভ এবং লিবিয়া বা সুদানের সংকটে অস্ত্র বিক্রির অভিযোগ তাঁর ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সমালোচকরা বলছেন, এই জাঁকজমকপূর্ণ কূটনীতির আড়ালে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের সংকট ঢাকা পড়ছে কি না, সেটিও দেখার বিষয়।
করাচি চেম্বার অব কমার্স থেকে শুরু করে তেহরান—সবখানেই এখন আসিম মুনিরের কূটনৈতিক সাফল্যের জয়ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। তবে এই দুই সপ্তাহের বিরতি কি স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেবে? সময় বলে দেবে আসিম মুনিরের এই যাত্রা কোথায় গিয়ে থামে।