শিরোনামঃ
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের ১০ম বৈঠক অনুষ্ঠিত: ৭ হাজার কোটি টাকার ১৭ প্রকল্প উপস্থাপন স্বস্তির বৃষ্টি শুরু বিভিন্ন স্থানে: বিকেলে ঢাকায়ও বৃষ্টির পূর্বাভাস এপ্রিলের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ১৯৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গরমে শিশুদের টিফিনে কী দেবেন? সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী গোলাম সারোয়ার মিলনের ইন্তেকাল এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে সন্তুষ্ট সরকার: ডিসেম্বরের মধ্যেই সব পাবলিক পরীক্ষা শেষের পরিকল্পনা সাগর-রুনি হত্যা মামলা: তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে আরও ৬ মাস সময় দিল হাইকোর্ট প্রখ্যাত আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই সেমিফাইনালে শক্তিশালী ভারতের মুখোমুখি বাংলাদেশ, নিশ্চিত হলো ব্রোঞ্জ পদক কোটি টাকার সম্পদে ভাসছেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের নেত্রীরা, জামায়াতের নেই মামলা
রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৬ অপরাহ্ন

নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের রাজত্ব: লাগামহীন দামে দিশেহারা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৬ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত এবং অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের সংঘবদ্ধ কারসাজিতে দেশের নিত্যপণ্যের বাজার এখন পুরোপুরি টালমাটাল। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে কাঁচাবাজারের সবজি, মাছ, মাংস ও ডিম—প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামই আকাশছোঁয়া। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে চরম অস্বস্তি ও হাঁসফাঁস অবস্থায় পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষেরা নিত্যদিনের দুই বেলা খাবার জোগাড় করতেই এখন হিমশিম খাচ্ছেন। বাজার বিশ্লেষকদের সুস্পষ্ট অভিযোগ, বিগত সরকারগুলোর আমলের মতোই বর্তমান সময়েও বাজার সেই গুটিকয়েক প্রভাবশালীর সিন্ডিকেটের কাছেই জিম্মি হয়ে আছে। বিভিন্ন সময় শুল্ক ছাড় দিয়েও ভোক্তাকে স্বস্তি দেওয়া যায়নি, উল্টো চক্রটিই এর সুবিধা লুটে নিয়েছে।

খুচরা বাজারের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে অন্তত ৫ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সাধারণ গরিব মানুষের মোটা চাল হিসেবে পরিচিত স্বর্ণা জাতের চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়, যা কিছুদিন আগেও ৫০ টাকার ঘরে ছিল। মাঝারি দানার পাইজাম চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৮ টাকায় এবং সরু বা চিকন মিনিকেট চাল কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে ৮৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কারওয়ান বাজারের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক ও চাল বিক্রেতা মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে মূলত মিল মালিকরাই চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়েছেন। পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে ধান থেকে চাল প্রক্রিয়াজাতে কেজিতে সর্বোচ্চ ২-৩ টাকা বাড়ার কথা থাকলেও, তারা বাড়িয়েছেন ৫-৬ টাকা। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার পাইকারি ও খুচরা বাজারে অভিযান চালালেও মূল কারিগর সেই প্রভাবশালী মিল মালিকদের টিকিটিও ছুঁতে পারছে না। সব দায় খুচরা বিক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে জরিমানা আদায় করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, দেশের ভোজ্যতেলের বাজারে চলছে রীতিমতো নৈরাজ্য। সরকারের সঙ্গে বৈঠকের পরও ভোজ্যতেলের প্রভাবশালী আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে বাজার থেকে একপ্রকার উধাও হয়ে গেছে বোতলের তেল। বোতলজাত তেলের কৃত্রিম এই সংকটের সুযোগে খোলা সয়াবিন তেলের দাম এক লাফে লিটারে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ২১০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। রাজধানীর জিনজিরা কাঁচাবাজারের মুদি ব্যবসায়ী সাগর জানান, হাতেগোনা কয়েকটি বড় কোম্পানি পুরো তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। সরকারকে চাপে ফেলে নিজেদের মতো করে সুবিধা আদায় করতে তারা সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো বোতলের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যেই (এমআরপি) ডিলারদের কাছে তেল বিক্রি করছে, ফলে খুচরা বিক্রেতারা বাধ্য হয়ে ক্রেতাদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছেন। অথচ তদারকি সংস্থাগুলো কারসাজির মূল হোতাদের কাছে যেতে সাহস না পেয়ে কেবল সাধারণ মুদি দোকানিদের ধরে হয়রানি করছে।

কাঁচাবাজারের পরিস্থিতিও সাধারণ মানুষের নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছে। বেশির ভাগ সবজির কেজিই এখন ৮০ থেকে ১০০ টাকার ওপরে। ডালের দাম বেড়ে কেজি ছুঁয়েছে ১৬০ টাকায়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ডজনে ১০ টাকা বেড়ে ১৩০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। আমিষের বাজারেও নিম্নবিত্তের জন্য কোনো সুখবর নেই। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায় এবং সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৬০ টাকায়। গরুর মাংস প্রতি কেজি ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১,২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি সব ধরনের মাছের দাম কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত সপ্তাহে ২২০ টাকায় বিক্রি হওয়া পাঙাশ মাছ এখন ২৩০ টাকা এবং এক কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের রুই মাছ ৩৪০ থেকে ৩৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর দুই কেজির বেশি ওজনের রুই বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকায়।

বাজারের এই লাগামহীন অবস্থা নিয়ে অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরী বলেন, শুধু খুচরা পর্যায়ে তদারকি করে বা জরিমানা করে বাজার নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সরকারকে আগে খুঁজে বের করতে হবে এই সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য কারা। আমদানিকারক বা উৎপাদনকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে কয়েকবার হাতবদল হয়। এ পর্যায়ে যারা শক্তিশালী এবং যাদের প্রভাব বেশি, তারা নিজ স্বার্থে শক্তি ব্যবহার করে পণ্যের দাম বাড়ায়। তাদের ক্ষমতা নষ্ট করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিলেই সিন্ডিকেট ভাঙা সহজ হবে। শক্তিশালীরা কী দামে পণ্য আমদানি বা উৎপাদন করছে, প্রক্রিয়ায় কত খরচ হচ্ছে এবং কত দামে বিক্রি করছে, তা সরকারের পক্ষে বের করা খুব সহজ। সেখানে নজরদারি বাড়াতে হবে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে দেশের সাধারণ ভোক্তা জিম্মি হয়ে আছে। তদারকি সংস্থাগুলো খুব ভালো করেই জানে কারা, কোন পণ্যের দাম কী পন্থায় বাড়াচ্ছে। তাদের লাগাম টান দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু অদৃশ্য কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

সব মিলিয়ে আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেলাতে না পেরে পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে সাধারণ মানুষের। তবে সাধারণ ভোক্তাদের আশ্বস্ত করে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদেই বাজার থেকে সিন্ডিকেট পুরোপুরি মুছে দেওয়া হবে এবং এর জন্য যা যা করণীয়, সরকার তার সবই করবে। সরকারের এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবিক প্রয়োগ কবে দৃশ্যমান হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে সারা দেশের মানুষ।


এ জাতীয় আরো খবর...