শিরোনামঃ
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের ১০ম বৈঠক অনুষ্ঠিত: ৭ হাজার কোটি টাকার ১৭ প্রকল্প উপস্থাপন স্বস্তির বৃষ্টি শুরু বিভিন্ন স্থানে: বিকেলে ঢাকায়ও বৃষ্টির পূর্বাভাস এপ্রিলের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ১৯৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গরমে শিশুদের টিফিনে কী দেবেন? সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী গোলাম সারোয়ার মিলনের ইন্তেকাল এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে সন্তুষ্ট সরকার: ডিসেম্বরের মধ্যেই সব পাবলিক পরীক্ষা শেষের পরিকল্পনা সাগর-রুনি হত্যা মামলা: তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে আরও ৬ মাস সময় দিল হাইকোর্ট প্রখ্যাত আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই সেমিফাইনালে শক্তিশালী ভারতের মুখোমুখি বাংলাদেশ, নিশ্চিত হলো ব্রোঞ্জ পদক কোটি টাকার সম্পদে ভাসছেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের নেত্রীরা, জামায়াতের নেই মামলা
রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৭ অপরাহ্ন

মে মাসের আগে কমছে না হামের প্রকোপ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬

দেশজুড়ে হামের প্রকোপ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। চলমান টিকাদান কর্মসূচি সত্ত্বেও প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃতের তালিকা, যাদের অধিকাংশই নিষ্পাপ শিশু।  স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী মে মাসের মাঝামাঝি বা দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে পরিস্থিতির দৃশ্যমান বা উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতির সম্ভাবনা নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বাস্তবতা এবং টিকাদান কর্মসূচির ধীরগতির কারণেই মূলত এই দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।


উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান ও শিশুদের প্রাণহানির মিছিল

হাম একসময় দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে প্রায় নির্মূল হওয়ার পথে থাকলেও, সাম্প্রতিক এই প্রাদুর্ভাব নতুন করে গভীর সংকটের সৃষ্টি করেছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তার পাশাপাশি যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষের জন্যই চরম বেদনদায়ক। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী মাত্র ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও ১১ জন রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুগুচ্ছ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি গত কয়েক সপ্তাহের ধারাবাহিকতা মাত্র। গত ১৫ই মার্চ থেকে দেশে হামের প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করার পর থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২০৯ জনে দাঁড়িয়েছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, মারা যাওয়া এই রোগীদের অধিকাংশই শিশু। যাদের বয়স মূলত এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম থাকায় এবং হামের কারণে সৃষ্ট জটিলতাগুলো (যেমন—নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়া) দ্রুত শরীরকে দুর্বল করে দেওয়ায় প্রাণহানির এই হার এতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

টিকাদান কর্মসূচি: লক্ষ্য ও বাস্তবতার ফারাক

হামের এই ভয়াবহ বিস্তার রোধে সরকার এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও হামের প্রকোপ বেশি এমন ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় একযোগে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় বাদ পড়া এবং নতুন করে ঝুঁকির মুখে থাকা শিশুদের হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু সমস্যা হলো, একটি মহামারি বা প্রাদুর্ভাব যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন শুধু টিকা দিলেই রাতারাতি ম্যাজিকের মতো তার ফল পাওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অন্যান্য অনেক এলাকায় এই টিকাদান কর্মসূচি বেশ দেরিতে শুরু হয়েছে। যেসব স্থানে প্রকোপ ধীরে ধীরে ছড়াচ্ছে, সেখানে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে টিকাদান কর্মসূচি আরও আগে শুরু করা গেলে হয়তো আক্রান্তের সংখ্যা অনেকটাই সীমিত রাখা সম্ভব হতো। দেরিতে টিকা পৌঁছানোর কারণে সেসব এলাকার শিশুদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এখনো প্রবল, এবং সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসতে আরও অনেকটা সময় লেগে যাবে।

অ্যান্টিবডি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বিজ্ঞান

মে মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত কেন অপেক্ষা করতে হবে—এর পেছনে একটি সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ইমিউনোলজিস্টরা ব্যাখ্যা করেছেন যে, যেকোনো টিকা শরীরে প্রবেশ করার পর তা সাথে সাথেই কাজ শুরু করতে পারে না। হামের টিকা দেওয়ার পর মানবদেহে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে অন্তত দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে।

যেহেতু গত ৫ এপ্রিল থেকে মূল টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে, সেহেতু এর সুফল পেতে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ বা মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যেসব শিশু এরই মধ্যে ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছে, তারা টিকার আওতাভুক্ত হলেও আক্রান্ত হতে পারে। এই বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার কারণেই মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে দেশব্যাপী হামের প্রকোপ কমার কোনো সুনির্দিষ্ট সম্ভাবনা দেখছেন না চিকিৎসকরা।

সংক্রমণ কমলেও মৃত্যুহার কমার ক্ষেত্রে ধীরগতি

এই সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা যে সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন, তা হলো—সংক্রমণের হার ও মৃত্যুহারের মধ্যকার সময়ের ব্যবধান বা ‘ল্যাগ ইফেক্ট’। চিকিৎসকদের মতে, মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে গিয়ে যদি নতুন করে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমতেও শুরু করে, তবুও মৃত্যুর এই অনাকাঙ্ক্ষিত ধারা সহসাই থামবে না। আক্রান্তের গ্রাফ নিচের দিকে নামতে শুরু করার পরেও মৃত্যুহার আরও অন্তত এক মাস অব্যাহত থাকতে পারে।

এর কারণ হলো, হাম সরাসরি মৃত্যুর চেয়ে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা জটিলতার কারণে বেশি প্রাণ কাড়ে। একটি শিশু হামে আক্রান্ত হওয়ার পর তার শরীরের সার্বিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। হাম সেরে যাওয়ার পরেও অনেক শিশু অপুষ্টি, মারাত্মক নিউমোনিয়া, এনকেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ) বা তীব্র ডায়রিয়ায় ভুগে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বর্তমানে যারা হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছে, তাদের মধ্যে এই জটিলতাগুলো প্রবল। ফলে সংক্রমণ নতুন করে না বাড়লেও, আগে থেকে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের বাঁচিয়ে রাখা চিকিৎসকদের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

কেন এই ভয়াবহতা এবং আমাদের করণীয়

হাম মূলত একটি অত্যন্ত সংক্রামক বায়ুবাহিত রোগ। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এটি খুব দ্রুত একজন থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে যেসব শিশু আগে থেকে অপুষ্টিতে ভুগছে বা যাদের রুটিন টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কোনো ডোজ বাদ পড়েছে, তারাই এই ভাইরাসের প্রধান শিকারে পরিণত হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সরকার এবং সাধারণ নাগরিকদের সমন্বিতভাবে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই:

১. টিকাদান নিশ্চিতকরণ: যেসব অভিভাবক এখনো তাদের সন্তানকে হামের টিকা দেননি, তাদের জরুরি ভিত্তিতে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে টিকা গ্রহণ করতে হবে।

২. লক্ষণ দেখলেই চিকিৎসা: শিশুর শরীরে জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরবর্তীতে গায়ে লালচে র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দিলেই কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

৩. আইসোলেশন বা সঙ্গনিরোধ: আক্রান্ত শিশুকে অবশ্যই সুস্থ শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখতে হবে, যাতে সংক্রমণ পরিবারের বা আশেপাশের অন্য শিশুদের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে না পারে।

৪. পুষ্টি নিশ্চিতকরণ: হামে আক্রান্ত শিশুর শরীর থেকে প্রচুর পানি ও পুষ্টি বের হয়ে যায়। তাই এই সময়ে শিশুকে পর্যাপ্ত তরল খাবার, মায়ের বুকের দুধ এবং পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে, যা হামের জটিলতা কমাতে দারুণ কার্যকর।

পরিশেষে বলা যায়, হামের এই বর্তমান প্রাদুর্ভাব আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত হয়তো আমাদের এই চরম বাস্তবতার মধ্য দিয়েই যেতে হবে। তবে এই মৃত্যুমিছিল থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনে রুটিন টিকাদান কর্মসূচিতে যেন একটি শিশুও বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করাই হবে রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। শিশুদের সুরক্ষায় কোনো ধরনের অবহেলা বা প্রশাসনিক ধীরগতি যে কতটা মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, এই ২০৯টি নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যুই তার সবচেয়ে বড় ও কষ্টদায়ক প্রমাণ।


এ জাতীয় আরো খবর...