শিরোনামঃ
দক্ষিণ এশিয়ার ‘ল্যান্ড ব্রিজ’ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ মান্দায় চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে জমি দখলের অভিযোগ: চরম ভোগান্তিতে কৃষক ও এলাকাবাসী থানকুনি পাতা: ১০টি জাদুকরী ভেষজ গুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা ইরানে অবিস্ফোরিত বোমা নিষ্ক্রিয়কালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ: আইআরজিসির ১৪ সদস্য নিহত ঢাকা বার নির্বাচন: নিরঙ্কুশ আধিপত্যে সব পদে জয়ী বিএনপিপন্থি ‘নীল প্যানেল’ রিয়ালে ফেরার গুঞ্জনে মুখ খুললেন মরিনহো ‘আহারে ব্রো, লাইফটাই স্পয়েল হয়ে গেল!’: আসিফ মাহমুদকে নীলার কটাক্ষ জেল থেকে ফিরে সিদ্দিকুর রহমানের নতুন জীবনের বার্তা তেহরানকে দমাতে পেন্টাগনের নতুন ছক: মাঠে নামছে ভয়ংকর ‘ডার্ক ঈগল’ ‘ইরান চুক্তি চায়, তবে আমি সন্তুষ্ট নই’—ট্রাম্প; অন্যদিকে হুমকি বন্ধের শর্তে কূটনীতিতে আগ্রহী তেহরান
শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৫:২৪ অপরাহ্ন

৭টি নতুন বাঁধের ফাঁদে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২০ বার
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে, ২০২৬

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে উজান থেকে নেমে আসা নদ-নদীর পানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা ও দুর্বলতা চিরকালের। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন আন্তঃসীমান্ত নদ-নদী রয়েছে, যা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয়। এর মধ্যেই নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের একটি উদ্যোগ। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মেঘালয়ের দুটি প্রধান নদের বুকে সাতটি নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তুলতে যাচ্ছে ভারত। বিশ্লেষকরা ভারতের এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের জন্য সরাসরি ‘মরণফাঁদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে আকস্মিক বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে ভয়াবহ খরার কবলে পড়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ।

নদীর গতিপথ ও প্রস্তাবিত ৭টি প্রকল্প

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের জৈন্তিয়া পাহাড় দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ‘মিন্তুদু’ নদ বাংলাদেশের সমতলে প্রবেশ করেছে, যা এ দেশে ‘সারি গোয়াইন’ নদ নামে পরিচিত। অন্যদিকে, মেঘালয়ের অপর একটি নদ ‘কিনসি’ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ‘জাদুকাটা’ নাম ধারণ করেছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই দুটি নদই পরবর্তীতে সুরমা নদীতে গিয়ে মিশেছে। সুরমাও একটি আন্তঃসীমান্ত নদী, যার উজানের অংশ ভারতে ‘বরাক’ নামে পরিচিত।

জানা গেছে, ভারতের মেঘালয় রাজ্য সরকার মিন্তুদু ও কিনসি নদীর ওপর সম্মিলিতভাবে সাতটি নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মেঘালয়ের বিদ্যুৎমন্ত্রী মেথবা লিংদোহ জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর কাজ অত্যন্ত জোরেশোরে এগিয়ে নিচ্ছে এবং এরই মধ্যে এসব প্রকল্পের বিস্তারিত প্রতিবেদন (ডিপিআর) বা নকশা তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। উল্লেখ্য, মেঘালয়ে বর্তমানে ১০টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু রয়েছে, যেখান থেকে সম্মিলিতভাবে ৩৭৮.২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। নতুন সাতটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ যে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

বন্যা ও খরার জোড়া বিপদ: কেন এটি মরণফাঁদ?

নদীর উজানে বাঁধ নির্মাণ বাংলাদেশের জন্য বরাবরই একটি আতঙ্কের বিষয়। এই সাতটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রাকৃতিক নিয়মে বয়ে চলা মিন্তুদু এবং কিনসি নদের পানিপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভারতের হাতে চলে যাবে। এর প্রত্যক্ষ ও ভয়াবহ প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের সুরমা অববাহিকা ও হাওর অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ এবং জনজীবনের ওপর।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে যখন ভারতের বাঁধগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পানি জমবে, তখন অবকাঠামো বাঁচাতে তারা একযোগে বাঁধের স্লুইসগেটগুলো খুলে দেবে। এর ফলে উজানের সেই বিপুল জলরাশি প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে এসে বাংলাদেশে আকস্মিক ও প্রলয়ংকরী বন্যার সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে, শুষ্ক মৌসুমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ভারত যখন জলাধারগুলোতে নদীর পানি আটকে রাখবে, তখন ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তীব্র পানি সংকটে পড়বে। নদে চর জেগে উঠবে, সেচকাজ ব্যাহত হবে এবং এই অঞ্চলে চরম খরা পরিস্থিতি তৈরি হবে। অর্থাৎ, বর্ষায় ডুবে মরা এবং শুকনায় তৃষ্ণায় মরা—এই দুই নির্মম পরিণতির দিকে ধাবিত হতে পারে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল।

অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও শঙ্কার মেঘ

ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বা নদীশাসনের উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা সবসময়ই তিক্ত। সবচেয়ে বড় উদাহরণ তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি। বাংলাদেশ দীর্ঘ দশক ধরে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি করে আসলেও, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের বিরোধিতার অজুহাতে তা আজও আলোর মুখ দেখেনি।

এই মেঘালয় সীমান্তেই ২০১২ সালে ভারত মিন্তুদু নদের ওপর ‘মিন্তনদু লেশকা স্টেজ-১’ নামে একটি বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করেছিল। সে সময় ভারতের যুক্তি ছিল, এটি নদীর স্রোতের ওপর নির্ভরশীল (রান-অব-দ্য-রিভার) প্রকল্প এবং এখানে পানি আটকে রাখার জন্য কোনো বড় জলাধার নেই; কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চ্যানেলের সাহায্যে পানি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে পুনরায় ভাটিতে ছেড়ে দেওয়া হবে। এই যুক্তিতে বাংলাদেশ সে সময় কোনো আনুষ্ঠানিক বিরোধিতা করেনি। কিন্তু বর্ষায় অতিবৃষ্টির সময় এই স্টেজ-১ প্রকল্প থেকেই প্রায় ১০৪০ কিউসেক পানি নির্গত হয়ে বাংলাদেশে প্লাবনের সৃষ্টি করে।

এই ঘটনার পর, ২০১৩ সালে ভারত যখন ‘মিন্তনদু লেশকা স্টেজ-২’ নির্মাণের ঘোষণা দেয়, তখন বাংলাদেশ এতে জোরালো আপত্তি জানায়। তখন থেকে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে এটি আলোচনার একটি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। প্রায় একই সময়ে বরাক নদের ওপর ভারতের পরিকল্পিত বিতর্কিত ‘টিপাইমুখ বাঁধ’ নিয়েও বাংলাদেশে বড় পরিসরে বিক্ষোভ ও আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, যার প্রেক্ষিতে ভারত প্রকল্পটি হিমঘরে পাঠাতে বাধ্য হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত হুমকি

উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ হলো, বাংলাদেশের মেঘালয় সীমান্তের পরিবেশ ও আবহাওয়াতে এরই মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই অঞ্চল ধীরে ধীরে আরও শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে। আবার কখনো কখনো হঠাৎ অতিভারী বৃষ্টির কারণে মারাত্মক আকস্মিক বন্যা (Flash Flood) পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এমন একটি অস্থিতিশীল পরিবেশগত পরিস্থিতির মধ্যে উজানে নতুন করে সাতটি বাঁধ নির্মাণ করা হলে তা এই অঞ্চলের ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থানকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে।

ভারতেই স্থানীয়দের আপত্তি: বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক সুযোগ

এই মেগা প্রকল্পের বিরুদ্ধে কেবল বাংলাদেশেই উদ্বেগ তৈরি হয়নি, খোদ ভারতের মেঘালয়ের স্থানীয় বাসিন্দারাও এর তীব্র বিরোধিতা করছেন। সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলো যেমন—খারকানা, বরঘাট এবং পাসাদুয়ারের সাধারণ মানুষ তাদের পরিবেশ ও জীবিকার ক্ষতির আশঙ্কায় এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের ভেতরের এই স্থানীয় অসন্তোষ ও বিরোধিতাকে বাংলাদেশ একটি মোক্ষম কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আন্তঃসীমান্ত নদীর ক্ষেত্রে উজানের দেশ একতরফাভাবে কোনো প্রকল্প করতে পারে না, এর জন্য আন্তর্জাতিক রীতিনীতি রয়েছে।

তারেক রহমান সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তারেক রহমানের সরকারের জন্য এই ইস্যুটি একটি বিরাট কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিগত দিনগুলোতে ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের যে ধারা দেখা যাচ্ছে, তার আলোকে এখন প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশ কি এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে নীরব দর্শক হয়ে থাকবে, নাকি নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় জোরালো পদক্ষেপ নেবে?

বিশ্লেষকদের মতে, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি খরস্রোতা নদীর মতোই। বাংলাদেশ সরকারকে যা করার অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে। তবে কোনোভাবেই তাড়াহুড়ো করে এলোমেলো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। একটি সুপরিকল্পিত ও কার্যকর কূটনৈতিক ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করতে হবে। যৌথ নদী কমিশনকে (জেআরসি) সক্রিয় করে অবিলম্বে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানাতে হবে।

বাংলাদেশের প্রধান দাবি হওয়া উচিত—প্রকল্পগুলোর কারণে আন্তঃসীমান্ত নদ-নদী, পরিবেশ এবং ভাটির দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় কতটা বিরূপ প্রভাব পড়বে, তার একটি স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (Environmental Impact Assessment- EIA) সম্পন্ন করা। ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব রয়েছে, এই নতুন ৭টি বাঁধ সেই আগুনে আরও ঘি ঢালার আগেই সরকারকে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায়, অদূর ভবিষ্যতে এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের জন্য এক স্থায়ী ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।


এ জাতীয় আরো খবর...