শিরোনামঃ
দক্ষিণ এশিয়ার ‘ল্যান্ড ব্রিজ’ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ মান্দায় চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে জমি দখলের অভিযোগ: চরম ভোগান্তিতে কৃষক ও এলাকাবাসী থানকুনি পাতা: ১০টি জাদুকরী ভেষজ গুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা ইরানে অবিস্ফোরিত বোমা নিষ্ক্রিয়কালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ: আইআরজিসির ১৪ সদস্য নিহত ঢাকা বার নির্বাচন: নিরঙ্কুশ আধিপত্যে সব পদে জয়ী বিএনপিপন্থি ‘নীল প্যানেল’ রিয়ালে ফেরার গুঞ্জনে মুখ খুললেন মরিনহো ‘আহারে ব্রো, লাইফটাই স্পয়েল হয়ে গেল!’: আসিফ মাহমুদকে নীলার কটাক্ষ জেল থেকে ফিরে সিদ্দিকুর রহমানের নতুন জীবনের বার্তা তেহরানকে দমাতে পেন্টাগনের নতুন ছক: মাঠে নামছে ভয়ংকর ‘ডার্ক ঈগল’ ‘ইরান চুক্তি চায়, তবে আমি সন্তুষ্ট নই’—ট্রাম্প; অন্যদিকে হুমকি বন্ধের শর্তে কূটনীতিতে আগ্রহী তেহরান
শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৫:২২ অপরাহ্ন

৩৭ হাজার কোটি টাকার মেগা ডিল: বিমান কি ডানা মেলছে, নাকি জড়াচ্ছে বড় ঝুঁকির জালে?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৭ বার
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে, ২০২৬

৩৭ হাজার কোটি টাকার বিপুল বিনিয়োগ, ১৪টি সর্বাধুনিক উড়োজাহাজ এবং একটি জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ—সব মিলিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ চুক্তির সাক্ষী হলো দেশ। জাতীয় পতাকাবাহী এই সংস্থা কি সত্যি বিশ্বসেরাদের কাতারে ডানা মেলতে যাচ্ছে, নাকি বিশাল ঋণের জালে নিজেদের জড়াতে চলেছে, তা নিয়ে এভিয়েশন ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মাঝে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। শেষ মুহূর্তে ইউরোপীয় কোম্পানি এয়ারবাসকে পেছনে ফেলে কেন মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের দিকে ঝুঁকলো ঢাকা—গত বৃহস্পতিবার স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আদ্যোপান্ত ও নেপথ্যের হিসাবনিকাশ নিয়েই এই বিশেষ বিশ্লেষণ।

ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও মার্কিন কূটনীতি

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, বোয়িংয়ের সাথে এই বিপুল অঙ্কের চুক্তিটি কি হঠাৎ করেই হলো? বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির বীজ বপন করা হয়েছিল চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সাথে বাংলাদেশের যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি সই হয়েছিল, গত বৃহস্পতিবারের এই ক্রয়াদেশ মূলত তারই একটি সরাসরি ধারাবাহিকতা। এটি কেবল উড়োজাহাজ কেনা নয়, বরং মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুসংহত করার একটি বড় মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পণ্য আমদানির মাধ্যমে বাংলাদেশ মূলত ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার রপ্তানি বাণিজ্যের ভারসাম্য বজায় রাখার এক কূটনৈতিক চেষ্টা চালাচ্ছে।

এয়ারবাসকে পেছনে ফেলে বোয়িংয়ের চমক

গত দুই বছর ধরে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার ব্যাপারে জোরালো আলোচনা চলছিল। এমনকি এয়ারবাসের সাথে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করার কাছাকাছি পর্যায়েও পৌঁছে গিয়েছিল বিমান। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বোয়িংয়ের সাথে এই মেগা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়াকে অনেকেই স্রেফ ব্যবসায়িক চুক্তির বদলে ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি’ বা রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি চাল হিসেবে দেখছেন। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের চেয়ে এখানে দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত গুরুত্ব ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।

বিমান বহরে যুক্ত হচ্ছে যেসব উড়োজাহাজ

বিমানের বর্তমান বহরে দূরপাল্লার রুটের জন্য ড্রিমলাইনারের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। এই ঘাটতি মেটাতে নতুন চুক্তিতে থাকছে ৮টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার। এটি বোয়িংয়ের ড্রিমলাইনার সিরিজের সবচেয়ে বড় সংস্করণ, যা দীর্ঘপাল্লার রুটে ৩৩০ জনের বেশি যাত্রী বহন করতে সক্ষম এবং এটি জ্বালানি সাশ্রয় করে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। নিউইয়র্ক, সিডনি এবং টরন্টোর মতো রুটগুলোকে নিয়মিত ও লাভজনক করতে এই বড় বডির উড়োজাহাজগুলো অপরিহার্য।

এছাড়া চুক্তির বাকি ৬টি উড়োজাহাজ হলো ৭৩৭ ম্যাক্স। আঞ্চলিক রুটগুলোতে, যেখানে যাত্রীসংখ্যা তুলনামূলক কম কিন্তু ফ্লাইটের ফ্রিকোয়েন্সি বা যাতায়াতের হার বেশি প্রয়োজন, সেখানে এই উড়োজাহাজগুলো গেম চেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হওয়ার পর ঢাকাকে একটি এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, সেখানে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বিমানের নিজস্ব বড় বহরের কোনো বিকল্প নেই।

খরচের খতিয়ান ও ঋণের ফাঁদ

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই বিপুল অঙ্কের অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে? চুক্তির আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছে ৩.৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই অর্থায়ন নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, এই কেনাকাটার জন্য মার্কিন এক্সিম ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং কনসোর্টিয়াম থেকে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ নেওয়া হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ সরকার এই ঋণের ‘সার্বভৌম গ্যারান্টার’ হিসেবে থাকছে। এর অর্থ হলো, বিমানকে তার ভবিষ্যৎ আয় থেকেই এই ঋণের কিস্তি শোধ করতে হবে। তবে আশার কথা হচ্ছে, ড্রিমলাইনারের মতো আধুনিক ও জ্বালানি সাশ্রয়ী উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হলে বিমানের বার্ষিক পরিচালন ব্যয় কয়েকশত কোটি টাকা কমে আসবে, যা কিস্তি পরিশোধে বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

নিরাপত্তা বিতর্ক ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

বোয়িংয়ের ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলটি নিয়ে অতীতে বিশ্বজুড়ে যে ভয়াবহ নিরাপত্তা বিতর্ক ও দুর্ঘটনার ইতিহাস ছিল, চুক্তির পর সেটিও পুনরায় আলোচনায় আসছে। যদিও বোয়িং দাবি করেছে, বর্তমান সংস্করণে সেই কারিগরি ত্রুটিগুলো সম্পূর্ণ দূর করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এই মেগা চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হয়। বিমানের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়জার সোহেল আহমেদ এবং বোয়িংয়ের প্রতিনিধিরা এতে সই করেন।

তবে বাস্তবতা হলো, চুক্তি সই হওয়ার পরপরই উড়োজাহাজগুলো দেশে আসছে না। ডেলিভারি শুরু হবে ২০৩১ সাল থেকে এবং শেষ হবে ২০৩৫ সালে। অর্থাৎ, আগামী এক দশকে বিমানকে তাদের নিজস্ব অবকাঠামো, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এবং কারিগরি দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য একটি বড় সুযোগ ও সময় দেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে, হাজার কোটি টাকার এই আধুনিক উড়োজাহাজগুলো বিমানের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে কেবল ‘সাদা হাতি’ হয়ে দাঁড়ানোর তীব্র ঝুঁকি থেকেই যায়।


এ জাতীয় আরো খবর...