বাজেট অধিবেশন শুরু হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। সংসদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বাজেট নিয়ে আলোচনার উত্তাপ ছড়ানোর আগেই কাঁচাবাজারে আগুনের উত্তাপে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর গত তিন মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা, সরবরাহ ঘাটতি এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে নিত্যপণ্যের দাম এখন সাধারণের নাগালের বাইরে। মানুষের আয় বাড়েনি, কিন্তু ব্যয়ের বোঝা পাহাড় সমান হয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের পকেট এখন গড়ের মাঠ; অনেকের দিন কাটছে ধার-দেনা করে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত জানুয়ারি মাসে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৭৫ টাকা। এপ্রিলের শেষে সরকারিভাবে তা ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হলেও খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২১০ থেকে ২২০ টাকায়। উদ্বেগের বিষয় হলো, ভোজ্যতেলের সরবরাহ ব্যবস্থার ৯৯ শতাংশ মাত্র ৫টি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট এই সিন্ডিকেটই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে।
আমিষের প্রধান উৎস গরুর মাংসের দাম গত এক মাসে প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ৮০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। সবজির বাজার যেন এখন কোনো ‘জুয়েলারি শপ’। ফেব্রুয়ারিতে যে বেগুনের দাম ছিল ৬০ টাকা, এখন তা ১০০ টাকা। কাঁচামরিচ সব রেকর্ড ভেঙে ৮০ টাকা থেকে লাফিয়ে ২০০ টাকায় পৌঁছেছে—অর্থাৎ এক মাসেই দাম বেড়েছে ১৫০ শতাংশ। আলুর বাজারে চলছে অদ্ভুত নাটক; মৌসুম শেষ না হতেই মার্চে যে আলুর দাম ৬৫ টাকা ছিল, এপ্রিলে তা ২০ টাকায় নামলেও বর্তমানে ভরা মৌসুমে তা আবার ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চালের বাজারেও একই অস্থিরতা। ইরি চাল ৭০ টাকা এবং মিনিকেট ৭৫ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মসুর ডাল ১৬০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।
বাজারের বর্তমান অস্থির চিত্র: এক নজরে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি
বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েক মাসের ব্যবধানে আকাশচুম্বী হয়েছে। নিচে প্রধান কিছু পণ্যের দামের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
ভোজ্যতেল: গত জানুয়ারি মাসে এক লিটার সয়াবিন তেলের বোতল ছিল ১৭৫ টাকা, যা বর্তমানে খুচরা বাজারে ২১০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চাল: সাধারণ ইরি চাল এখন ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর ভালো মানের মিনিকেট চালের দাম কেজি প্রতি ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
গরুর মাংস: গত এক মাসে গরুর মাংসের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে। আগে ৭৫০ টাকার আশেপাশে থাকলেও এখন তা ৮০০ টাকায় ঠেকেছে।
কাঁচামরিচ: সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচামরিচের দাম। ৮০ টাকার মরিচ এক লাফে ১৫০ শতাংশ বেড়ে এখন ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজি (বেগুন): ফেব্রুয়ারি মাসে যে বেগুনের কেজি ছিল ৬০ টাকা, এখন তা ১০০ টাকায় পৌঁছেছে।
ডাল: বাজারে মানভেদে মসুর ডাল এখন ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এলপিজি গ্যাস: জানুয়ারি মাসে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১৪৬৫ টাকা। বর্তমানে সরকারি দর ১৫৪০ টাকা হলেও বাজারে তা ১৬০০ টাকার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
জ্বালানি তেল: ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম সরকার ২০ শতাংশ বাড়ানোর ফলে পরিবহন খরচ এক লাফে প্রায় ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, সরকারি হিসেবে মূল্যস্ফীতি সাড়ে আট শতাংশ বলা হলেও কাঁচাবাজারে অনেক পণ্যের দাম ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর ফলে বাজেটের আগেই সাধারণ মানুষের পকেট কার্যত শূন্য হয়ে পড়েছে।
সরকার সম্প্রতি ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এর প্রভাবে পরিবহন খরচ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। ব্যবসায়ীরা পরিবহন খরচ বাড়ার অজুহাতে প্রতিটি পণ্যের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যখন নিজেই দাম বাড়ানোর মিছিলে নেতৃত্ব দেয়, তখন খুচরা ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করার নৈতিক সাহস তারা হারিয়ে ফেলে।
পূর্ববর্তী সরকারের ১৫ বছরের ‘জঞ্জাল’ পরিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বর্তমান বিএনপি সরকার। সংবিধান সংস্কার, জুলাই বিপ্লবের চেতনা রক্ষা কিংবা গণভোটের মতো তাত্ত্বিক আলোচনা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এখন সবার আগে প্রয়োজন ‘দু’মুঠো ভাত’। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা মূল্যায়িত হয় সাধারণ মানুষের পেট ও পকেটের পরিস্থিতি দেখে। মানুষের হাতে কাজ নেই, পকেটে টাকা নেই—ফলে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে অপরাধ। আইওএম-এর তথ্যমতে, জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার মানুষ ঢাকায় ভিড় করছে।
আগামী বাজেট অধিবেশনে বড় বড় মেগা প্রকল্প আর জিডিপি প্রবৃদ্ধির গল্প শোনানো হবে ঠিকই, কিন্তু সেই বাজেটের চাকচিক্য কি সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের উত্তাপ কমাতে পারবে? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার কি এই অজেয় সিন্ডিকেট ভাঙতে পারবে, নাকি তারাও পূর্বসূরিদের মতো বাজারের কাছে হার মানবে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। পেটের জ্বালা নিয়ে মানুষ খুব বেশি দিন গালভরা সংস্কারের গল্পে সন্তুষ্ট থাকবে না।
“বাজারের এই নিরব কান্না যদি না থামে, তবে অতীতের মতো একই ফাঁদে পড়তে হতে পারে বর্তমান সরকারকেও। পেটের ক্ষুধা রাজনৈতিক আলোচনার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।”