ভবিষ্যতে মেগা প্রকল্পের নামে যেন মেগা দুর্নীতি বা ডাকাতি না হয়, সে বিষয়ে বর্তমান সরকারের প্রতি কড়া আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তিনি বলেছেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কোনো ঠিকাদারকে যেন ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া না হয়। পাশাপাশি ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচার সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করার দাবিও জানান তিনি।
রোববার (৩ মে) দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি সংস্কার ও গণভোট’ বিষয়ক জাতীয় কনভেনশনে তিনি এসব কথা বলেন।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে একটি ‘লুটের রাজ্যে’ পরিণত করেছিল উল্লেখ করে সারজিস আলম বলেন, “বিগত ১৬ বছরে আমরা দেখেছি, মেগা প্রকল্পের নামে মেগা ডাকাতি হয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলোও দীর্ঘমেয়াদে দেশের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “রাশিয়ার রোসাটমের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। একটি মার্কিনভিত্তিক ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, এই প্রকল্পে টিউলিপ সিদ্দিকীকে নেগোশিয়েটর হিসেবে রেখে শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয় এবং শেখ হাসিনা—এই সিন্ডিকেট মিলে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, যা বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়েছে।”
আদানি গ্রুপের সাথে বিদ্যুৎ চুক্তির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ভারতের সাংবাদিক পরাঞ্জয় গুহ ঠাকুরতার লেখা অনুযায়ী, এই চুক্তিটি বাংলাদেশের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্য।
তিনি আরও বলেন, “এই চুক্তির মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার ‘ফি’ হিসেবে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে প্রতিবছর কোটি কোটি ডলার দেওয়া হতো—বিদ্যুৎ কেনা হোক বা না হোক। এমনকি এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য নীতিমালায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছিল।”
দেশের ঋণের পরিসংখ্যান তুলে ধরে এনসিপির এই নেতা জানান, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের মোট ঋণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আওয়ামী লীগের পতনের সময় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকায়, যা আগের তুলনায় প্রায় ছয় থেকে সাড়ে ছয়গুণ বেশি।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই ঋণ পরিশোধ করতে আগামী ৪০ বছর লাগবে। আজ প্রতিটি নবজাতকের মাথায় প্রায় দেড় লাখ টাকার ঋণ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিগত ১৬-১৭ বছরে দেশ থেকে প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, যা দিয়ে ৩৫-৪০টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। এমনকি পদ্মা সেতু প্রকল্পেও ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে।”
ব্যাংকিং খাতের ভয়াবহ লুটপাটের চিত্র তুলে ধরে সারজিস বলেন, “সালমান এফ রহমান একাই প্রায় ৭টি ব্যাংক থেকে ৩৬ হাজার কোটি টাকা লুট করেছেন। শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে এভাবেই লুটপাট চালিয়েছে।”
দুর্নীতির ভয়াবহতা বোঝাতে তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি একজন পিয়নের কাছেও ৪০০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে, আবার সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের লন্ডনে ৩৬০টি বাড়ি থাকার তথ্যও সামনে এসেছে।”
বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সারজিস বলেন, আন্ডারটেবিল নেগোসিয়েশনই (গোপন আঁতাত) আজকের সবচেয়ে বড় সমস্যা। রাজস্ব কম হলে সরকারকে বারবার ঋণ নিতে হয়, যা দেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
সবাইকে সতর্ক করে তিনি বলেন, “আমরা যখন নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যাই, তখন এই লুটপাটকারীরা দর্শক হয়ে বসে থাকে এবং আমাদের বিভাজন উপভোগ করে। তাই আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”
রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ ও আমলাসহ সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব পলিসি মেকারদের। আমরা চাই বর্তমান সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নেতৃত্ব দিক এবং কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখুক।”
সরকারকে সতর্ক করে তিনি যোগ করেন, “জনগণ এখন সচেতন। যেকোনো অপচেষ্টা তারা প্রতিহত করবে। আমরা সবাই যদি সংসদ থেকে রাজপথ পর্যন্ত আমাদের কণ্ঠস্বর ও প্রতিবাদ অব্যাহত রাখি, তবে ভবিষ্যতে আর কেউ বাংলাদেশকে বিপথে নিতে পারবে না।”