ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের অধীনে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করেছিল জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রাজপথের আন্দোলনেও তাদের যুগপৎ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে (সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ) জোটবদ্ধ নয়, বরং আলাদাভাবে নির্বাচন করে নিজেদের সাংগঠনিক সামর্থ্য ও জনসমর্থন যাচাই করতে চায় দল দুটি।
ইউপিতে একক লড়াই: সিটি করপোরেশনে শেষ মুহূর্তে কোনো সমঝোতা হলেও ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে এককভাবেই লড়বে দল দুটি।
প্রস্তুতি: তফসিল ঘোষণার আগেই উভয় দল নিজেদের প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
এনসিপির লক্ষ্য: গ্রামাঞ্চলে এবং তৃণমূল পর্যায়ে দলের প্রকৃত জনসমর্থন ও প্রভাব কতটা, সেটি যাচাই করতে চায় এনসিপি।
জোটগত সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত একক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েই এগোচ্ছে উভয় দল।
জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান:
দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সমঝোতা নিয়ে ১১ দলের মধ্যে এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, “আমরা আপাতত সব জায়গায় নিজেদের প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ করছি। সমঝোতা হলে তখন কাকে কোথায় ছাড় দেওয়া হবে, তা ঠিক করা হবে। তবে যেহেতু এখনো সমঝোতার আলোচনা হয়নি, আমরা একক নির্বাচনের প্রস্তুতিই নিচ্ছি।”
এনসিপি’র অবস্থান:
এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সারজিস আলমও একই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এনসিপি এককভাবে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় আছে। এ কারণে আমরা এখন প্রতিটি জায়গায় এককভাবে এনসিপির প্রার্থী ঘোষণা করব। পরে যদি দেশের ও দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের স্বার্থে জোট করতে হয়, সেটা তখনকার সিদ্ধান্ত।”
আইন অনুযায়ী এবার দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন হচ্ছে না। তবুও দলগুলো তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের নাম নিয়ে ভেতরে-ভেতরে কাজ শুরু করেছে।
জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী:
ঢাকা উত্তর: মুহাম্মদ সেলিমউদ্দিন (মহানগর উত্তরের আমির)।
ঢাকা দক্ষিণ: সাদিক কায়েম (ডাকসু ভিপি ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক)।
গাজীপুর: ড. হাফিজুর রহমান।
চট্টগ্রাম: মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী।
এনসিপি ঘোষিত সম্ভাব্য প্রার্থী:
ঢাকা উত্তর: আরিফুল ইসলাম আদিব।
ঢাকা দক্ষিণ: আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া (সাবেক উপদেষ্টা)।
কুমিল্লা: তারিকুল ইসলাম।
সিলেট: আব্দুর রহমান আফজাল।
রাজশাহী: মোবাশ্বের আলী।
প্রকাশ্যে একক নির্বাচনের কথা বলা হলেও ভেতরে-ভেতরে ১১ দলীয় জোটের মধ্যে সিটিতে সমঝোতার আলোচনা চলছে। জোটের সূত্রমতে, ঢাকা উত্তরে জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী হওয়ায় সেখানে জামায়াতের মুহাম্মদ সেলিমউদ্দিন এবং দক্ষিণে এনসিপির আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে জোটের সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
সাদিক কায়েম বনাম আসিফ মাহমুদ: ঢাকা দক্ষিণে জামায়াতের সাদিক কায়েম এবং এনসিপির আসিফ মাহমুদকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে প্রকাশ্য বিতর্ক দেখা গেছে। তবে জোটের এক নেতার মতে, সাদিক কায়েমকে সামনে আনা জামায়াতের দর-কষাকষির একটি কৌশল মাত্র। তাছাড়া ছাত্রশিবিরের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। তাই শেষ পর্যন্ত তাকে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।
চট্টগ্রামে নতুন চমক:
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে সাবেক মেয়র মনজুর আলমকে ঘিরে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। তিনি এনসিপিতে যোগ দিলে তার পক্ষে জোটের সমর্থন আদায়ে এনসিপি দর-কষাকষি করবে বলে জানা গেছে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায় না দলগুলো। এনসিপির নেতারা মনে করছেন, ইউপি নির্বাচনে এককভাবে অংশ নিলে শহরাঞ্চলের বাইরে দলের প্রকৃত প্রভাব স্পষ্ট হবে। এই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতে অন্যান্য নির্বাচনে জোটের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করা হবে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, “নির্বাচনে সক্ষমতা যাচাই এবং বহুমতের সমর্থন পাওয়া—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। সার্বিক দিক বিবেচনা করে সিটি করপোরেশনগুলোতে ১১ দলীয় ঐক্য পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে অংশ নিতে পারে। তবে তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাচন এককভাবেই হতে পারে।” সে ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ সমঝোতায় দলের কোনো বাধা থাকবে না।
সূত্র: আজকের পত্রিকা