আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনইসি সম্মেলনকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই মেগা উন্নয়ন বাজেট চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।
এবারের এডিপিতে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন, সামাজিক সুরক্ষা এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এডিপির আকার ও অর্থায়নের উৎস
পরিকল্পনা কমিশনের কার্যপত্র অনুযায়ী, অনুমোদিত তিন লাখ কোটি টাকার মূল এডিপির অর্থায়নের রূপরেখা হলো:
সরকারি অর্থায়ন: ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা।
বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান: ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।
স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন: মূল এডিপির বাইরে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনগুলোর নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পের জন্য আরও ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট উন্নয়ন ব্যয়ের আকার দাঁড়াচ্ছে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকার বেশি।
উন্নয়নের পাঁচ মূল স্তম্ভ
প্রস্তাবিত এই উন্নয়ন কর্মসূচিটি পাঁচ বছর মেয়াদি সংস্কার ও কৌশলগত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করা হয়েছে। এর প্রধান পাঁচটি স্তম্ভ হলো:
১. রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার (বিচার ও আইনি সেবা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক ডিজিটাল রূপান্তর এবং সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ)।
২. বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও কারিগরি শিক্ষায় জোর)।
৩. ভঙ্গুর অর্থনীতির কাঠামোগত পুনর্গঠন।
৪. অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন।
৫. ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিভিত্তিক সামাজিক সংহতি জোরদার।
খাত ও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সর্বোচ্চ বরাদ্দ
খাতভিত্তিক বরাদ্দে এবার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এছাড়া বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
পরিবহন ও যোগাযোগ খাত: ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা (মোট এডিপির ১৬.৭০%)।
শিক্ষা খাত: ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা।
স্বাস্থ্য খাত: ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত: ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।
গৃহায়ণ ও কমিউনিটি সুবিধা: ২০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা।
মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ (৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা)। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ (৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা)।
প্রকল্পের পরিসংখ্যান ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা
এবারের উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট ১,১২১টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪৯টি বিনিয়োগ প্রকল্প, ১০৭টি কারিগরি সহায়তা এবং ৪৩টি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব প্রকল্প রয়েছে। পাশাপাশি, আরও ১,২৭৭টি নতুন অননুমোদিত প্রকল্প তালিকায় রাখা হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে অনুমোদন পাবে। আগামী জুনের মধ্যে ২২৩টি প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সভায় প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ওপর কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়। আগামী ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে সমাপ্তিযোগ্য প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে এবং যেসব প্রকল্পের মেয়াদ ইতোমধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে, সেগুলোতে নতুন করে ব্যয়সীমা সীমিত রাখার কঠোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।