রেমিট্যান্স প্রবাহে ধীরগতি, রাজস্ব আদায়ের বিশাল ঘাটতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী চাপে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। নিত্যপণ্যের চড়া দাম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নাভিশ্বাস তুলেছে। এমন বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মাঝেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বর্তমান নির্বাচিত সরকারের এই প্রথম বাজেটটি ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। আগামী ৭ জুন জাতীয় সংসদে দেশের ৫৪তম বাজেট অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে এবং ১১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে তা উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সরকারের প্রথম বাজেটটিকে জনবান্ধব করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। বাজেটের মূল লক্ষ্য হিসেবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ৬.৫ শতাংশ উচ্চতর জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের অর্থের জোগান দিতে রাজস্ব আদায়ের অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে, যার মধ্যে কেবল এনবিআরের মাধ্যমেই ৬ লাখ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের পরিচালন বা অনুন্নয়ন ব্যয় লাফিয়ে বেড়ে ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াচ্ছে। বিশাল আকারের এই বাজেট করতে গিয়ে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা মোট জিডিপির ৩.৪ শতাংশ। এই পাহাড়সম ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে এবং তাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে বাজেটে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ করছাড়ের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, চিনি, আটা, পেঁয়াজ ও মসলার মতো নিত্যপণ্যের ওপর থেকে বিদ্যমান উৎসে কর বাতিল করার চিন্তাভাবনা চলছে। পাশাপাশি নিত্যপণ্যের ওপর আরোপিত ১ শতাংশ টার্নওভার করও যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হতে পারে। দেশে কাঠামোগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ধনীদের জন্য বর্তমানে প্রচলিত সারচার্জের বদলে সরাসরি সম্পদের নিট মূল্যের ওপর ‘সম্পদ কর’ বা ওয়েলথ ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাব করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশে ও বিদেশে থাকা অপ্রদর্শিত সম্পদ বৈধ করতে কালোটাকা সাদা করার বিশেষ সুযোগ চালুর বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। বাংলাদেশে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় পাবজি, কল অব ডিউটির মতো গেমিংয়ের ওপরও কর বসানোর কথা ভাবা হচ্ছে।
আগামী বাজেটে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) হাতে নেওয়া হচ্ছে। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার পূরণের লক্ষ্যে এই এডিপির প্রায় ৩৯ শতাংশই থোক ও বিশেষ বরাদ্দের আওতায় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের আওতায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিতে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর ফলে প্রায় ৪৮ লাখ ৩০ হাজার পরিবার মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা পাবে। এছাড়া কৃষক কার্ডের জন্য ১ হাজার ৪০০ কোটি এবং ইমাম-পুরোহিতদের ভাতার জন্য ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে এডিপি বরাদ্দ বর্তমান সংশোধিত বাজেটের প্রায় ছয়গুণ বাড়িয়ে ২০ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে চলচ্চিত্র, সংগীত, ক্রীড়া ও গ্রামীণ সংস্কৃতির দিকেও বাজেটে বাড়তি নজর দেওয়া হচ্ছে।
বিশাল এই বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভর্তুকি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ভর্তুকির চাপ মারাত্মকভাবে বেড়েছে। আগামী বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি, এলএনজিতে ৬ হাজার ৫০০ কোটি, সারে ২৭ হাজার কোটি এবং খাদ্য সহায়তায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকাসহ মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ হিসেবে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। তবে এত বড় বাজেট ও লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, রাজস্ব আদায়ের এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা কোনোভাবেই অর্জনযোগ্য নয়। অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী ও অধ্যাপক আবু আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড়, সরকারের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আয়ের নিম্নগতি এবং গ্যাস সংকটে কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত ও সাশ্রয়ী বাজেট প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
তথ্যসূত্র: মানবজমিন