মহামারি করোনা ভাইরাসের চরম সংকটের সময় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে এবং জরুরি স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তুলতে ছয় হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে একটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছিল সরকার। এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শিশুদের জন্য বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (পিআইসিইউ) এবং ভেন্টিলেশন সুবিধার প্রসার ঘটানো। কিন্তু চরম প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতার কারণে সেই প্রকল্পের শিশু আইসিইউ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়িত হয়েছে শূন্য শতাংশ। প্রকল্পের এই বিশাল ব্যর্থতার ভয়াবহ ও করুণ পরিণতি আজ চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রাদুর্ভাবে আইসিইউ ও ভেন্টিলেশন সাপোর্টের অভাবে গত দুই মাসেই অন্তত সাড়ে চার শ শিশুর অকাল মৃত্যু হয়েছে। রাষ্ট্রের বিশাল বাজেটের প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও, স্রেফ গাফিলতির কারণে আজ দেশের হাসপাতালগুলোর বারান্দায় শিশুদের জীবন-মৃত্যুর মর্মান্তিক লড়াই চলছে।
হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর ভয়াবহ পরিসংখ্যান
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্য বিশ্লেষণে দেশের বর্তমান শিশু স্বাস্থ্যসেবার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। গত দুই মাসে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হওয়া সাড়ে চার শতাধিক শিশুর বেশিরভাগই মারা গেছে নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং সময়মতো ভেন্টিলেশন সাপোর্ট না পাওয়ার কারণে। শিশুদের মুমূর্ষু অবস্থায় পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু দেশের হাসপাতালগুলোতে এই সুবিধার এতটাই আকাল যে, সাধারণ মানুষকে তাদের সন্তানদের বাঁচাতে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে পাগলের মতো ছুটতে হচ্ছে। ঢাকা শিশু হাসপাতালে মাত্র ১৪ শয্যার পিআইসিইউ রয়েছে, যা সারাক্ষণ রোগীতে পূর্ণ থাকে। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, বর্তমানে সেখানে একটি শয্যা খালি হওয়ার অপেক্ষায় অন্তত ৩০টির বেশি মুমূর্ষু শিশু প্রহর গুনছে। এই অপেক্ষার প্রহর শেষ হওয়ার আগেই অনেক শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
একই চিত্র ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড হাসপাতালেও। সেখানকার চিকিৎসক আসিফ হায়দারের মতে, হাসপাতালটিতে চার হাজারের বেশি শিশু হামের চিকিৎসা নিয়েছে, যার মধ্যে মারা গেছে ২২টি শিশু। এদের প্রায় সবাইকেই হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) রেখে ভেন্টিলেশন দিতে হয়েছিল। অক্সিজেনের অভাবে ভোগা মুমূর্ষু শিশুরা যখন হাসপাতালে পৌঁছায়, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। সাপোর্ট দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুর কাছে হার মানতে বাধ্য হয় তারা।
ছয় হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের করুণ পরিণতি
এই বিশাল শিশু মৃত্যুর পেছনে চিকিৎসকদের অবহেলার চেয়ে বেশি দায়ী রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের চরম গাফিলতি। ‘কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (২য় সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে ৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের ১৪টি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পিআইসিইউ এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে পৃথক পিআইসিইউ ইউনিট স্থাপন করার কথা ছিল। অর্থাৎ, সর্বমোট ১৬টি পিআইসিইউ ইউনিট স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু আইএমইডি-এর (বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ) মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই ১৬টি পিআইসিইউ স্থাপনের বিপরীতে বাস্তবায়নের হার পুরোপুরি শূন্য।
শুধু পিআইসিইউ নয়, দেশের ৫০টি জেলা সদর হাসপাতালে সাধারণ আইসিইউ স্থাপনের যে পরিকল্পনা ছিল, তার বেশিরভাগই আলোর মুখ দেখেনি। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক অদ্ভুত সমন্বয়হীনতার কথা। এই প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল প্রকল্প অফিসের হাতে, আর ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তর। গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাজে অস্বাভাবিক ধীরগতির কারণে পুরো প্রকল্পের আইসিইউ ও পিআইসিইউ স্থাপনের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে।
ফিরে গেছে বিশ্বব্যাংকের অর্থ, নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারার কারণে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের একটি বড় অংশ বাধ্য হয়ে ফেরত পাঠাতে হয়েছে। প্রকল্পটির উপপরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম নিজেই স্বীকার করেছেন যে, শুরুতেই কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় কাজের গতি শ্লথ হয়ে যায়। এছাড়া গণপূর্তের ভেরিয়েশন অর্ডারে কাজ করা, বিল পাসে জটিলতা এবং ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তনের কারণে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, যেসব হাসপাতালে অবকাঠামো বা কক্ষ নির্মাণ শেষ হয়েছিল, সেখানে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়নি। আবার কোথাও যন্ত্রপাতি কেনা হলেও কক্ষ ও পাইপলাইন প্রস্তুত না থাকায় তা বসানো যায়নি। পঞ্চম জনস্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় এই অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করার কথা থাকলেও, সরকার নতুন প্রকল্পভিত্তিক ব্যবস্থায় চলে যাওয়ায় সেই আলোচনাও বাতিল হয়ে যায়। ফলে বছরের পর বছর ধরে পড়ে থেকে মহামূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো নষ্ট হচ্ছে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ রাজশাহী বিভাগ। এই বিভাগের ছয়টি জেলার হাসপাতালে কমপক্ষে ৬০টি আইসিইউ শয্যা শুধুমাত্র প্রশিক্ষিত নার্স ও জনবলের অভাবে অচল পড়ে আছে। আর মুমূর্ষু রোগীদের পাঠানো হচ্ছে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন রোগী আইসিইউর অপেক্ষায় থাকেন।
জনগণের আস্থার সংকট ও মর্মান্তিক পরিণতি
প্রশাসনিক এই ব্যর্থতার সরাসরি শিকার হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের বাসিন্দা রকিব মিয়ার সাড়ে চার মাস বয়সী শিশু সামির হোসেন হামের জটিলতা নিয়ে গত ১৬ এপ্রিল ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। টানা ১৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গত ৬ মে শিশুটি মারা যায়। সন্তানহারা এই পিতার আর্তনাদ—সময়মতো একটি আইসিইউ শয্যা পেলে হয়তো তার সন্তানকে বাঁচানো যেত। দেশের বড় সরকারি হাসপাতালেও যদি শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা না থাকে, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে—এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে নেই।
ঝিনাইদহের ছোট্ট শিশু জিসানের ঘটনা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার সংকটের কঙ্কালসার রূপটি উন্মোচিত করেছে। হামে আক্রান্ত জিসানকে বাঁচাতে তার মা-বাবা ঢাকায় এসে চারটি হাসপাতালে ঘুরেও একটি পিআইসিইউ শয্যা পাননি। হতাশ হয়ে তারা সন্তানকে নিয়ে পুনরায় ঝিনাইদহে ফিরে যান। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি ভাইরাল হলে চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্যোগে তাকে আবারও ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু তখন দেখা দেয় আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সের সংকট। ঝিনাইদহে না পেয়ে যশোর থেকে অ্যাম্বুলেন্স আনতে হয়। এমনকি, ঢাকায় এসেও শিশুটি চিকিৎসা পাবে কি না, সেই ভয়ে জিসানের পরিবারকে পুনরায় ঢাকায় আসতে রাজি করাতে ১০ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। জিসানের বাবার অসহায় প্রশ্ন ছিল—”রাষ্ট্রের প্রধান বা স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেন ফোন দিচ্ছেন না?” এই অনাস্থা শুধু জিসানের বাবার নয়, বরং এটি সমগ্র দেশের সাধারণ মানুষের মনের কথা।
দায় কার?
সরকারি হিসাবমতে, দেশে বর্তমানে সরকারি হাসপাতালে মোট ১ হাজার ৬২০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে শিশুদের জন্য আলাদা কতটি পিআইসিইউ রয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, দেশে হামের পরিস্থিতি চরম উদ্বেগজনক হলেও শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা সেবার সক্ষমতা একেবারে তলানিতে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পিআইসিইউ, এইচডিইউ ও শিশু ভেন্টিলেশন সুবিধা বাড়ানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসানও দক্ষ জনবল, যন্ত্রপাতি এবং পিআইসিইউর চরম স্বল্পতার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন।
ছয় হাজার কোটি টাকার স্বাস্থ্য প্রকল্পের এই নিদারুণ ব্যর্থতা কেবল একটি প্রশাসনিক অদক্ষতা নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রের চরম অবহেলা ও উদাসীনতার প্রমাণ। যদি সময়মতো সমন্বয়হীনতা ও দুর্নীতি এড়িয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হতো, তবে জেলা হাসপাতালগুলোতেই শিশুদের নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা থাকত। তাহলে হয়তো সামির বা জিসানের মতো নিষ্পাপ শিশুদের রাজধানীর হাসপাতালগুলোর দরজায় দরজায় ঘুরে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হতো না। শিশুদের এই অকাল মৃত্যুর দায় রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ