সম্প্রতি এক আলোচনায় বাংলাদেশে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। গত বছরের (২০২৫) ১৫ অক্টোবর সেনাবাহিনীর একটি ফার্নিচার মেলা পরিদর্শনে গিয়ে সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা বশিরউদ্দীন যখন সেনাবাহিনীর ফার্নিচার তৈরির প্রশংসা করেছিলেন, ঠিক সেই প্রেক্ষাপটেই ড. দিলারা চৌধুরী প্রশ্ন তুলেছেন— “আমাদের শত্রু কে? আমাদের প্রতিরক্ষা নীতি কোথায়?” তার এই প্রশ্নগুলো এককথায় বাতিল করে দেওয়ার মতো নয়; বরং এই প্রশ্নগুলোকে সামনে রেখেই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
ব্যবসা বনাম পেশাদারিত্ব: সেনাবাহিনীর মূল কাজ কী?
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেছেন, “পৃথিবীতে কোনো দিন শুনি নাই যে আর্মি মিষ্টি বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে! আর্মির কাজ তো ড্রোন বা সমরাস্ত্র বানানো।” বাস্তবে সেনাকল্যাণ সংস্থার মাধ্যমে সেনাবাহিনী ফার্নিচার তৈরি, মিষ্টির দোকান, হোটেল ও গ্যাস স্টেশন পরিচালনার মতো বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সেনা সদস্যদের দিয়ে এসব করানো আদৌ যৌক্তিক কি না, তা নিয়ে এখন বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে সেনা সদস্যদের ব্যবসায় জড়িত হওয়া বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি সেনাকল্যাণ সংস্থার মালিকানাধীন ‘সেনা ইন্স্যুরেন্স’ প্রতিরক্ষা কেনাকাটার ঝুঁকি আন্ডাররাইট করার বিশেষ অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু বিমা সমিতির সভাপতি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিদ্যমান বিমা আইন সংশোধন না করে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এমন একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিয়ে সেনাবাহিনীর একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যখন বাজারে বিশেষ সুবিধা পেতে চায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তা সমালোচনার জন্ম দেয়।
প্রতিরক্ষা নীতি এবং ‘শত্রু’ নির্ধারণ
বাংলাদেশে একটি ডিফেন্স পলিসি আছে ঠিকই, তবে ড. দিলারা চৌধুরী যথার্থই বলেছেন যে, এই পলিসি অবিলম্বে হালনাগাদ (Up-to-date) করা প্রয়োজন। ২০০৯ সালে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ গ্রহণ করা হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা। কিন্তু যৌক্তিক প্রশ্ন হলো—অস্ত্র সংগ্রহ, যুদ্ধবিমান কেনা বা ড্রোন তৈরির মাধ্যমে আমরা মূলত কার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি? আমাদের শত্রু কি প্রতিবেশী মিয়ানমার, ভারত, নাকি হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আসা অন্য কোনো পরাশক্তি?
দিলারা চৌধুরী ইরানের উদাহরণ টেনে বলেছেন, ইরান গত পঁচিশ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে সামরিক প্রস্তুতি নিয়েছে বলেই আজ তারা আমেরিকার মতো পরাশক্তির সাথে চোখে চোখ রেখে লড়াই করতে পারছে। আমাদেরও সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন।
সামরিক আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
শুধু সমালোচনা নিয়ে বসে থাকার সুযোগ আমাদের নেই, কারণ সারা বিশ্বের সামরিক উন্নয়নের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদেরও এগোতে হবে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (SIPRI) ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব জিডিপির ২.৫ শতাংশ এখন সামরিক খাতে ব্যয় হচ্ছে। অন্যদিকে, ‘গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স ২০২৫’ অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম শক্তিশালী সামরিক শক্তি এবং জনবলের দিক থেকে বিশ্বের প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। ১৯৮৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২ লাখের বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বজুড়ে কাজ করেছেন এবং ১৬৮ জনের বেশি সদস্য প্রাণ দিয়েছেন। এই বিশাল অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে।
প্রতিরক্ষা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে
প্রতিরক্ষা খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে ইতোমধ্যে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি (BOF) কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদন করছে। এছাড়া সরকার একটি ‘প্রতিরক্ষা অর্থনৈতিক অঞ্চল’ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে ড্রোন, সাইবার প্রযুক্তি এবং আধুনিক সমরাস্ত্র তৈরি করা হবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যৌথ উদ্যোগে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ কর্পোরেশন’-এর সাথে ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের একটি জিটুজি (G2G) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিমানবাহিনী জানিয়েছে, এসব ড্রোন শুধু সামরিক কাজেই নয়, মানবিক সহায়তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়ও ব্যবহৃত হবে। এছাড়া, দেশের আকাশ সুরক্ষায় বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে ২০৩০ সালের মধ্যে তিনটি স্টেলথ স্কোয়াড্রন গঠন এবং দেশীয় আনম্যানড কমব্যাট এরিয়াল ভেহিক্যাল (UCAV) ইকোসিস্টেম তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। তবে মাথায় রাখতে হবে, প্রতিবেশী ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদনে বার্ষিক বিনিয়োগ ২.৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তাই ফার্নিচার বা মিষ্টি উৎপাদন থেকে একলাফে ড্রোন বা যুদ্ধবিমান উৎপাদনের স্তরে পৌঁছানো কঠিন হলেও, কাজটা আমাদের শুরু করতে হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আগামীর পথনকশা
ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, একটি ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নির্দ্বিধায় প্রশংসার দাবিদার—আর তা হলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। ভয়াবহ বন্যা থেকে শুরু করে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনের ‘ফ্রন্টলাইন ডিফেন্ডার’ হিসেবে কাজ করে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সশস্ত্র বাহিনীকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের মর্যাদা রক্ষায় সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন, ‘পিপলস ওয়ারফেয়ার ডকট্রিন’ (People’s Warfare Doctrine) চালু করা এবং সশস্ত্র বাহিনীকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘চতুর্মাত্রিক বাহিনী’ হিসেবে গড়ে তোলার জোরালো প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর ছুড়ে দেওয়া প্রশ্নগুলো—’শত্রু কে?’, ‘আমাদের ডিফেন্স পলিসি কোথায়?’, ‘সেনাবাহিনী কি ড্রোন বানাতে পারে?’—এগুলো নিছক কোনো সমালোচনা নয়; এগুলো একটি নির্মোহ বাস্তবতার স্বরূপ। গণতান্ত্রিক সমাজের উপযোগী করে সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক মজবুত করার পাশাপাশি বাণিজ্যিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে একটি পুরোপুরি যুদ্ধপ্রস্তুত ও কৌশলগত বাহিনী হিসেবে গড়ে ওঠাই এখন বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস