ভারতের রাজনীতিতে, বিশেষ করে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বিজেপির নিরঙ্কুশ বিজয় ঢাকার জন্য এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির পতনকে ঢাকার ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার একদিক থেকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে। বিএনপি প্রকাশ্যে নতুন বিজেপি সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে। এর মূল কারণ হলো দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা ‘তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি’। মমতা ব্যানার্জিকে এই চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ‘বাধা’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ঢাকার প্রত্যাশা, কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের শাসন থাকায় এবার হয়তো তিস্তা চুক্তির জট খুলবে।
তবে আশার পাশাপাশি একটি গভীর শঙ্কাও দানা বেঁধেছে। অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসী আখ্যা দিয়ে বাংলাভাষী মুসলিমদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ‘ঠেলে ঢোকানোর’ (পুশ-ইন) যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বিজেপি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নের আশঙ্কা এখন প্রবল। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী বিজয়ে এই উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রতিশ্রুতি বড় ভূমিকা রেখেছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় নতুন রাজ্য সরকার যদি এই নীতি বাস্তবায়নে নামে, তবে তা দুই দেশের সম্পর্কে মারাত্মক অবনতি ঘটাবে। কারণ, এই তথাকথিত অবৈধ অভিবাসনের বিষয়ে নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে কোনো ঐকমত্য নেই। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘোষণা করেছেন যে, সীমান্তে এ ধরনের যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ভারত এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে ঢাকা তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পিছপা হবে না।
কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত সম্প্রতি একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে। পেশাদার ও অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের নিয়োগ দেওয়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভেঙে গত এপ্রিল মাসে পশ্চিমবঙ্গের বর্ষীয়ান বিজেপি রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নিয়োগের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না দিলেও বিশ্লেষকদের মতে এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দিয়েছে এবং তাকে প্রত্যর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। বাংলাদেশে অনুপস্থিতিতে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা বর্তমান বিএনপি সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় ঢাকায় যে তীব্র ভারতবিরোধী ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রশমিত করতে একজন প্রথাগত কূটনীতিকের চেয়ে একজন রাজনীতিক বেশি কার্যকর হতে পারেন—এমনটাই নয়াদিল্লির হিসাব। কিন্তু বাস্তবে দীনেশ ত্রিবেদীর কাজ মোটেও সহজ হবে না। কারণ, বিজেপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখনো বাংলাদেশকে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নকারী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা হয়। শীর্ষ বিজেপি নেতারা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে কথিত বাংলাদেশী অভিবাসীদের ‘উইপোকা’ বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যা দেন। যতদিন ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই ধরনের বাংলাদেশ-বিদ্বেষী বিষবাষ্প ছড়ানো অব্যাহত থাকবে, ততদিন ঢাকায় ত্রিবেদীর কূটনৈতিক তৎপরতা অত্যন্ত সীমিত থাকতে বাধ্য।
ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে জ্বালানি, পানি, কাঁচামাল, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশ ভারতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ভারত এই নির্ভরতাকে বন্ধুত্বের বদলে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
গত এপ্রিলের শুরুতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে নয়াদিল্লি সফর করেন। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুর বাইরে এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য ছিল অধিক পরিমাণে ডিজেল ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ভারতীয় হাইকমিশনগুলোতে ভিসা প্রদানে দীর্ঘসূত্রিতার সমাধান করা। হরমুজ প্রণালীতে চলমান উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা মোকাবিলায় বাংলাদেশ তার নিকটতম প্রতিবেশীর কাছে উষ্ণ সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছিল।
আসামে ভারতের নিজস্ব শোধনাগার রয়েছে এবং সেখান থেকে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহের একটি চুক্তিও কার্যকর আছে। কিন্তু ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী অত্যন্ত শীতল ও শর্তযুক্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে খলিলুর রহমানকে স্পষ্ট করে দেন যে, ভারতের নিজস্ব চাহিদা পূরণ হওয়ার পরেই কেবল বাংলাদেশে বাড়তি জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। বর্তমানে চুক্তির তুলনায় বেশ কম পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করছে ভারত। নয়াদিল্লির এমন আচরণের অন্তর্নিহিত বার্তা হলো—ভারত একটি অপরিহার্য প্রতিবেশী এবং তাদের শর্ত মেনেই ঢাকাকে চলতে হবে।
ভারতের ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতি ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ বা ‘প্রতিবেশী প্রথম’ হলেও বাস্তবে তারা প্রতিবেশীদের সাথে ‘বিগ ব্রাদার’ বা বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করে চলেছে। সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপনের বদলে তারা প্রতিবেশীদের ওপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায়। নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপের ক্ষেত্রে ভারতের এই একগুঁয়ে পররাষ্ট্রনীতি চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ভারত যতদিন এই দেশগুলোর প্রয়োজনের প্রতি উদাসীন থেকেছে, ঠিক তখনই সুযোগ বুঝে চীন সেখানে প্রবেশ করেছে এবং বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বলয় তৈরি করেছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে নয়াদিল্লি এখন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ভুল করছে।
ভারতের ক্রমাগত অবহেলা ও অনমনীয় নীতির কারণে ঢাকা বাধ্য হয়েই বিকল্প পথ খুঁজছে এবং সেই পথটি সরাসরি বেইজিংয়ের দিকে চলে গেছে। বিএনপি সরকার স্পষ্টতই নেপাল বা মালদ্বীপের মতো চীনের সাথে সম্পর্ক জোরদারের পথে হাঁটছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর বিশেষ আমন্ত্রণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত ৫ মে তিন দিনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সফরে বেইজিংয়ে যান। দেশ ছাড়ার আগে তিনি ভারতের উদ্দেশে অত্যন্ত কড়া ও স্পষ্ট বার্তা দিয়ে যান। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারতের টালবাহানা ও বিলম্বের কারণে চরম হতাশা প্রকাশ করে তিনি ঘোষণা দেন যে, বাংলাদেশ আর চুক্তির জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করবে না। এর বদলে তারা সরাসরি চীনের সাথে তিস্তা নদীর মহাপরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করবে।
বেইজিং সফরে চীনা কর্তৃপক্ষের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিপুল অঙ্কের স্বল্পসুদের ঋণ (সফট লোন), পূর্ববর্তী ঋণের পরিশোধের সময়সীমা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো খাতে নতুন ও বৃহৎ চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত দুই বছর ধরে বেইজিং ঢাকায় তাদের কার্যক্রমে কিছুটা নিষ্ক্রিয় ছিল। কিন্তু ভারতের একগুঁয়ে নীতির কারণে সৃষ্ট শূন্যস্থান পূরণে চীন এখন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাদের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতির নিয়মই হলো—একটি প্রতিযোগী যখন দৌড় শুরু করে দেয়, তখন অন্য প্রতিযোগীকে তার চেয়ে দ্রুত দৌড়াতে হয়। নয়াদিল্লি হয়তো একসময় তাদের ভুল বুঝতে পেরে ঘুম থেকে জেগে উঠবে, কিন্তু ততক্ষণে ঢাকার কূটনীতিতে বেইজিংয়ের আলিঙ্গন এতটাই সুদৃঢ় হয়ে যেতে পারে যে, ভারতের জন্য সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
তথ্যসূত্র: নয়াদিগন্ত