শিরোনামঃ
চ্যাটজিপিটিতে লেখার বানান চেক করার বিপদ শহরে কয়টা খাল উদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে? — প্রশ্ন হান্নান মাসউদের জিলহজ মাসের প্রথম ১৩ দিনের বিশেষ আমল ও ফজিলত ঈদের ছুটিতে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৮ দফা নির্দেশনা ‘বিচার চাই না, কারণ আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই’: রামিসার বাবার বুকফাটা আর্তনাদ টানা তিন দফা কমল সোনার দাম: ভরিতে কমল ২১৫৮ টাকা রামিসার খণ্ডিত দেহ যে প্রশ্ন রেখে গেল: ঘরের পাশে ওত পেতে থাকা দানব থেকে শিশুদের বাঁচাবে কে? আনসার বাহিনীকে দক্ষ ও গতিশীল করতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার তাগিদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ৬ দিনের নিখোঁজ পর মিলল পাঞ্জাবি গায়িকার দেহ নির্মাতা দেবালয়ের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগে আইনি পথে অভিনেত্রী অঙ্কিতা
বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ০৫:৩৯ পূর্বাহ্ন

কোরবানির হাটে চাহিদার চেয়ে ২২ লাখ পশু বেশি: তবু কেন দাম কমার আশা নেই?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬

দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার প্রেক্ষাপটে এবার পবিত্র ঈদুল আজহাকে ঘিরে কোরবানির পশুর বাজারে এক নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। আগামী ২৮ মে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পশুর হাটে চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যাপক প্রস্তুতি। খামারগুলোতে দিনরাত এক করে পশু পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারিরা। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, বিগত কয়েক বছরের মন্দা কাটিয়ে এবার আবারও দেশে কোরবানি হওয়া পশুর সংখ্যা কোটির ঘর ছুঁতে পারে। তবে এই আশাবাদের পাশাপাশি বাজারজুড়ে বিরাজ করছে এক বড় ধরনের শঙ্কা। পশুখাদ্য, শ্রমিক, বিদ্যুৎ, পরিবহন, ওষুধসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় পশুর উৎপাদন খরচ এখন খামারিদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। খামারিদের সবচেয়ে বড় শঙ্কা হলো—বাজারে পশুর ন্যায্যমূল্য না পেলে এবারও তাদের বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়তে হবে। অন্যদিকে, সাধারণ ক্রেতারাও চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন যে, শেষ পর্যন্ত কোরবানির পশুর দাম কোথায় গিয়ে ঠেকে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি গরুর দাম এবার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ছাড়িয়ে আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টরা।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে কোরবানির পশুর সম্ভাব্য মোট চাহিদা ধরা হয়েছে এক কোটি এক লাখ ছয় হাজার ৩৩৪টি। আর এই চাহিদার বিপরীতে দেশব্যাপী প্রস্তুত রাখা হয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু। অর্থাৎ, হিসাব অনুযায়ী চাহিদার তুলনায় দেশে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত রয়েছে। এই প্রস্তুতকৃত পশুর মধ্যে গরু ও মহিষের সংখ্যা হলো ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি এবং ছাগল ও ভেড়ার সংখ্যা রয়েছে ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি। এছাড়া অন্যান্য প্রজাতির পশু রয়েছে আরও প্রায় পাঁচ হাজার ৬৫৫টি। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর পর্যাপ্ত ও উদ্বৃত্ত সরবরাহ রয়েছে। দেশের খামারিদের স্বার্থ রক্ষার্থে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি চরমভাবে বাড়ানো হয়েছে এবং সীমান্তবর্তী সব পশুর হাট বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে করে কোনোভাবেই অবৈধভাবে বিদেশি গরু দেশের বাজারে প্রবেশ করে স্থানীয় বাজারকে অস্থিতিশীল করতে না পারে। তিনি জানান, উৎপাদন ব্যয় যে বেড়েছে, তা সরকার অবগত আছে। তবে খামারিদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি ক্রেতাদের দিকটিও বিবেচনায় নিয়ে অযৌক্তিকভাবে যেন দাম না বাড়ে, সেদিকেও কঠোর নজরদারি রাখা হবে। তবে সরকারি এই হিসাব ও পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেক বাজার বিশ্লেষক। তাদের মতে, মাঠপর্যায়ে পশুর প্রকৃত বিক্রি, অবিক্রীত পশুর সংখ্যা এবং হাটভিত্তিক বাস্তব তথ্যের ব্যাপক ঘাটতি থাকায় সরকারি পরিসংখ্যান অনেক সময় বাজার বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি খাপ খায় না।

গত কয়েক বছরের অবিক্রীত পশুর তিক্ত অভিজ্ঞতা এবারও খামারিদের উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা বহুগুণ বাড়িয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, করোনাভাইরাস মহামারির আগে দেশে প্রতি বছর গড়ে এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হতো। কিন্তু করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং চরম মূল্যস্ফীতির কারণে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালে দেশে প্রায় এক কোটি ১৯ লাখ পশু প্রস্তুত করা হলেও শেষ পর্যন্ত কোরবানি হয়েছিল মাত্র ৯০ লাখ ৯৩ হাজার ২৪২টি পশু। অর্থাৎ, সে বছর প্রায় ২৮ লাখ পশু খামারিদের ঘরে অবিক্রীত থেকে যায়, যা তাদের বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। একইভাবে, গত বছরও প্রায় ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৬০৩টি পশু অবিক্রীত ছিল। অতীতের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই এবারও খামারিদের মনে চরম শঙ্কা বিরাজ করছে যে, মানুষের চাহিদা যদি প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়, তবে আবারও তাদের লোকসানের মুখে পড়তে হবে। তবে এই শঙ্কার মাঝেও বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ক্যাটল ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি এবং মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যান এস এম আমীর হামজা শাতিল কিছুটা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, এবার সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারি থাকায় এবং পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে ভারতীয় গরু প্রবেশের সুযোগ একেবারেই কম থাকবে। ফলে খামারিরা দেশীয় পশুর ভালো দাম পাবেন বলে আশা করা যায়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসা এবং নতুন সরকারের অধীনে প্রথম কোরবানির ঈদ হওয়ায় মানুষের মধ্যে মানসিক স্বস্তি রয়েছে, যার ফলে এবার কোরবানিদাতার সংখ্যা গত বছরের তুলনায় তিন থেকে চার শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যায় এক উল্লেখযোগ্য ও উদ্বেগজনক হ্রাস দেখা গেছে। প্রাণিসম্পদ খাতের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে কোরবানির জন্য মোট প্রস্তুত পশুর সংখ্যা ছিল এক কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি। কিন্তু চলতি বছর সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টিতে। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশে প্রায় ছয় লাখ ৪৬ হাজার পশু কম প্রস্তুত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পতন শুধু একটি সাধারণ পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়; এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে খামারিদের ওপর চেপে বসা বিশাল অর্থনৈতিক চাপ। পশুখাদ্য, প্রয়োজনীয় ওষুধ, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুতের বিল এবং পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক ছোট ও মাঝারি খামারি তাদের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ লোকসান সামলাতে না পেরে পুরোপুরি খামার ব্যবসা থেকেই নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। খামারিদের মতে, গত কয়েক বছরে বিপুল সংখ্যক পশু অবিক্রীত থাকায় লোকসানের ভয় তাদের নতুন করে বিনিয়োগে অনীহা তৈরি করেছে। ফলে অনেকেই এবার বড় পরিসরে গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পে যাননি। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন হ্রাসের এই নেতিবাচক প্রবণতা যদি দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকে, তবে তা দেশীয় পশু উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নষ্ট করবে এবং আগামী দিনগুলোতে বাজার স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ভৌগোলিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের প্রধান ভোক্তা অঞ্চল অর্থাৎ ঢাকা ও চট্টগ্রামে এবার কোরবানির পশুর বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। শুধু রাজধানী ঢাকায় সম্ভাব্য পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৯টি। কিন্তু স্থানীয়ভাবে খামারগুলোতে প্রাপ্যতা রয়েছে মাত্র ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৯৪২টি পশুর। অর্থাৎ, শুধু ঢাকাতেই প্রায় সাড়ে সাত লাখ পশুর বিশাল ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। একইভাবে বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও প্রায় ৫০ হাজার পশুর ঘাটতির তথ্য পাওয়া গেছে। এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভাগগুলোতে, যেখানে বড় ধরনের উদ্বৃত্ত রয়েছে। রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগে স্থানীয় চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। শুধুমাত্র রাজশাহী বিভাগেই উদ্বৃত্ত রয়েছে প্রায় ১৯ লাখ পশু। ফলে, এটা স্পষ্ট যে এসব উদ্বৃত্ত অঞ্চল থেকেই মূলত রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরগুলোর হাটে পশু সরবরাহ করা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার বাজার সম্পূর্ণভাবেই নির্ভর করবে উত্তরাঞ্চল থেকে আসা এই পশুগুলোর ওপর। কিন্তু দীর্ঘ দূরত্বের পরিবহন ব্যয়, পথে পথে রাস্তার চাঁদাবাজি, হাটের অতিরিক্ত হাসিল খরচ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের বিশাল কমিশনের কারণে শেষ পর্যন্ত রাজধানীর বাজারে পৌঁছানো পশুর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।

খামারিদের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় অভিযোগ ও কষ্টের জায়গাটি হলো পশুখাদ্যের লাগামহীন বাজার। তাদের দাবি, গত মাত্র দুই বছরে দানাদার খাদ্যের দাম বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে শুরু করে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভুসি, খৈল, খুদ, খড় এবং ঘাস—সবকিছুর দামই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে, যার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার এক খামারি আব্দুর রাজ্জাক হতাশার সুরে বলেন, গত বছরের তুলনায় গমের ভুসির বস্তা ৩০০ টাকা, মসুরের ভুসি ২০০ টাকা এবং ধানের গুঁড়ার দাম ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। নওগাঁর আরেক খামারি রমজান আলী জানান, দানাদার খাবারের বাজারে কার্যত সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। এর পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের খামারিরা জানান, এবারের তীব্র গরম, দাবদাহ ও নিয়মিত লোডশেডিং খামারিদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। গরুকে সুস্থ ও রোগমুক্ত রাখতে সারাক্ষণ জেনারেটর চালিয়ে পাখা চালাতে হয়েছে, নিয়মিত পানি ছিটাতে হয়েছে এবং এসবের জন্য অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়েছে, যা উৎপাদন খরচকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির এই বিশাল প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়বে রাজধানীর কোরবানির হাটে। খামারিদের মতে, উৎপাদন খরচের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়, হাটের হাসিল এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশনের কারণে রাজধানীর বাজারে কোরবানির পশুর দাম এবার আরও বেড়ে যাবে। বিশেষ করে ঢাকার বাজারে পশু আনতে উত্তরাঞ্চল থেকে যে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়, তাতে পথে পথে খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকার একটি অ্যাগ্রো ফার্মের মালিক শফিকুল ইসলাম স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, গোখাদ্য, শ্রমিক, বিদ্যুৎ ও ওষুধের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার কারণে বাজারে পশুর সরবরাহ বেশি থাকলেও দাম কমার কোনো সুযোগ বা সম্ভাবনা নেই। বাজার বিশ্লেষক ও খামারিদের মতে, অর্থনৈতিক চাপে থাকা সাধারণ মানুষের মধ্যে এবার ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদাই সবচেয়ে বেশি থাকবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মানুষের কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতার কারণে তারা বড় গরুর পরিবর্তে তুলনামূলক কম দামের পশুর দিকেই বেশি ঝুঁকবেন। পাবনার খামারি আলতাফ হোসেন জানান, তিনি বাজার বুঝতে পেরে এবার বড় গরু কম রেখে ছোট ও মাঝারি গরুর দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। খামারিদের ধারণা, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর একটি বড় অংশ এবার এককভাবে পশু কেনার পরিবর্তে যৌথ কোরবানি বা ভাগে কোরবানি দেওয়ার দিকেই বেশি ঝুঁকবে।

বিশ্বের অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশে কোরবানির পরিমাণ অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, পাকিস্তানে বছরে ৭০ থেকে ৮০ লাখ, ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৮ লাখ ৫৬ হাজার, তুরস্কে প্রায় ৩৮ লাখ এবং মিসরে প্রায় ১৩ লাখ পশু কোরবানি হয়। সেখানে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় এক কোটির আশপাশে পশু কোরবানি হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের এই বিশাল কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর নিবিড় গ্রামীণ সংযোগ। দেশের প্রায় প্রতিটি গ্রাম কোনো না কোনোভাবে এই গবাদিপশু পালনের সাথে সরাসরি যুক্ত। ফলে উৎপাদন থেকে শুরু করে বিক্রি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি তৃণমূলের স্থানীয় অর্থনীতিকে চরমভাবে সচল রাখে। হাট পরিচালনা, পরিবহন খাত, পশুখাদ্য বিক্রেতা, চামড়া সংগ্রহকারী এবং কসাই শ্রমিক—সবখানেই এই সময়ে ব্যাপকভিত্তিক মৌসুমি কর্মসংস্থান তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত একটি চমৎকার ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা চক্রাকার অর্থনীতি, যেখানে ঈদের সময় শহরের মানুষের জমানো অর্থ গ্রামে যায় এবং পরবর্তীতে সেই গ্রামীণ আয় আবার নগরের বাজারেই ফিরে আসে।

গত এক দশকের পরিসংখ্যান ঘাটলে দেখা যায়, দেশে কোরবানির বাজার ধারাবাহিকভাবে বড় হয়েছে। ২০১৫ সালে দেশে যেখানে প্রায় ৮৫ থেকে ৮৮ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল, ২০১৭ সালে তা প্রথমবারের মতো এক কোটির মাইলফলক ছাড়িয়ে যায়। তবে করোনা মহামারির অপ্রত্যাশিত ধাক্কায় ২০২০ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে প্রায় ৯৪ লাখে। এরপর বাজার ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও সাম্প্রতিক সময়ের উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালে কোরবানির সংখ্যা আবারও কমে দাঁড়ায় প্রায় ৯১ লাখে। তবে এবার দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় এবং মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি থাকায় বাজারে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক খামারি মারাত্মকভাবে লোকসানে পড়েছেন এবং এ কারণেই বাজারে পশু ও গোশতের দাম বাড়ছে। তিনি সরকারকে পশুখাদ্য ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে অবিলম্বে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার যদি সঠিক নীতিসহায়তা প্রদান করে, খামারগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায়, আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলে এবং বিশেষ করে ছোট ও প্রান্তিক খামারিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণসুবিধা নিশ্চিত করতে পারে, তবে বাংলাদেশের এই কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতি আগামী দিনে আরও অনেক বড় পরিসরে বিকশিত হতে পারবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে একটি বিশাল অবদান রাখবে।

তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


এ জাতীয় আরো খবর...