প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের বিস্তার রোধে বহুল প্রতীক্ষিত টিকা বাজারে আসতে আরও প্রায় ৯ মাস সময় লাগতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। বুধবার (২০ মে) জেনেভায় সংস্থাটির সদরদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডব্লিউএইচওর বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. ভাসি মূর্তি এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
ড. ভাসি মূর্তি জানান, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ইবোলা ভাইরাসের ‘বুন্ডিবুগিও’ প্রজাতির বিরুদ্ধে কাজ করবে, এমন দুটি সম্ভাব্য ‘ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন’ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। তবে এই টিকা দুটি এখনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা মানবদেহে পরীক্ষার পর্যায়ে পৌঁছায়নি। টিকা সম্পূর্ণভাবে তৈরি করে তার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ হতে ৯ মাসের মতো দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হতে পারে।
কঙ্গো ও উগান্ডায় ইবোলার বর্তমান চিত্র
মধ্য আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডি আর কঙ্গো) ইবোলার এই প্রাদুর্ভাব প্রায় মহামারির আকার ধারণ করেছে। এর আগে মঙ্গলবার ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন যে, কঙ্গোতে ইবোলার উপসর্গে ইতোমধ্যে ১৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও ৬০০ জনের মধ্যে সন্দেহভাজন সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ড. মূর্তি জানান, কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় দুই প্রদেশ ইতুরি এবং উত্তর কিভুর ৫১ জন নিশ্চিতভাবে ইবোলায় আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় ২ জনের শরীরে এই ভাইরাস পাওয়া গেছে।
কঙ্গোতে এই বিধ্বংসী প্রাদুর্ভাবের জেরে গত ১৭ মে ডব্লিউএইচও বিশ্বজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। তবে তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস স্পষ্ট করেছেন যে, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে এটি উচ্চমাত্রার মহামারি হলেও, এটি এখনও বৈশ্বিক মহামারির পর্যায়ে উন্নীত হয়নি।
প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সহায়তা
কঙ্গোতে ইবোলা প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ২ কোটি পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩২৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা) অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ সামনের সারির স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাতা প্রদান, রোগের নজরদারি বৃদ্ধি এবং প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের নানামুখী কাজে ব্যয় করা হবে।
এদিকে, কঙ্গোতে বর্তমানে ২৪৬ জন সন্দেহভাজন বা আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬ জন মার্কিন নাগরিক। সিএনবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এদের মধ্যে ৩ জনের অবস্থা গুরুতর এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইবোলা ভাইরাস: ধরন, লক্ষণ ও ভয়াবহতা
ইবোলা ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম ‘অর্থোইবোলাভাইরাস জাইরেন্স’। এর মোট ছয়টি প্রজাতির মধ্যে বর্তমানে কঙ্গো ও উগান্ডায় ‘বুন্ডিবুগিও’ প্রজাতিটি ছড়াচ্ছে। ফলখেকো বাদুড়কে এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক হিসেবে ধরা হয়। ইবোলার প্রধান শিকার মানুষ এবং শিম্পাঞ্জি বা গরিলা গোত্রীয় প্রাণী।
এটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণীর রক্ত, লালা, ঘাম, বমি বা অন্যান্য শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমনকি মৃতদেহের সৎকার বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় সরাসরি সংস্পর্শ থেকেও এটি দ্রুত ছড়ায়।
ভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় দিন থেকে সাধারণত তীব্র জ্বর, প্রচণ্ড ক্লান্তি, মাংসপেশি ও মাথাব্যথা এবং বমি বা ডায়রিয়ার মতো প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দেয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে লিভার ও কিডনি অকেজো হয়ে যায় এবং রোগীর নাক, মুখ ও মলদ্বার দিয়ে তীব্র রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এজন্য একে ‘হেমারোজিক ফিভার’ বলা হয়।
বাতাসের মাধ্যমে না ছড়ানোর কারণে ইবোলা অন্যান্য ভাইরাসের তুলনায় কম সংক্রামক হলেও এর মৃত্যুহার ভয়াবহ রকমের বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গোর সাম্প্রতিক এই প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের মৃত্যুহার ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত দেখা গেছে।
টিকা আসতে দীর্ঘ বিলম্ব এবং উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে ইবোলার এই নতুন প্রাদুর্ভাব বর্তমানে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য এক চরম উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র : বিবিসি