পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কোরবানির ওপর জারি করা ১৪ বছরের নজিরবিহীন বিধিনিষেধ রাজ্য রাজনীতি ও সীমান্ত অর্থনীতিতে এক অভাবনীয় এবং জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ভাইরাল হওয়া তথ্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই কঠোর সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায় একপ্রকার নীরব বয়কটের পথে হেঁটেছে। আর এই মেরুকরণের রাজনীতির সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শিকার হচ্ছেন খোদ পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু খামারিরাই। মালদহ ও মুর্শিদাবাদের মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে হিন্দু খামারিরা চরম আর্থিক সংকটে পড়ে রাতের অন্ধকারে কার্যত জলের দামে হাজার হাজার গরু বাংলাদেশে পাচারকারীদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। একদিকে মুখ্যমন্ত্রীর কথিত গরুর মাংস খাওয়ার পুরোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়া এবং অন্যদিকে তৃণমূল নেতা হুমায়ুন কবীরের ‘লাখো মানুষ নিয়ে রাস্তায় নামার’ কড়া আল্টিমেটাম—সব মিলিয়ে নবান্নের এই রাজনৈতিক ব্লু-প্রিন্ট এখন শুভেন্দু অধিকারীর জন্যই বড় ধরনের বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু-মুসলিম ঐক্য এবং মেরুকরণ রাজনীতির চরম পতনের এক বাস্তব চিত্র উন্মোচন করেছে।
সীমান্তের অর্থনীতি ও অভাবনীয় লাভের অঙ্ক
আসন্ন ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বাংলাদেশের বাজারে পশুর চাহিদা এখন আকাশছোঁয়া। রাজ্য সরকারের ফতোয়ার কারণে পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় বাজারে যে গরুর দাম মেরেকেটে ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার রুপি, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সেই একই আকারের একটি গরু ওপারে পৌঁছাতে পারলেই তার দাম হাঁকা হচ্ছে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত। দামের এই বিশাল ফারাক পাচারকারীদের আরও মরিয়া করে তুলেছে। খামারিরা যখন নিজেদের পশু স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে ব্যর্থ হয়ে লোকসানের মুখে পড়ছেন, তখন পাচারকারীরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত কম দামে গরু কিনে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
ফসল বিক্রির নতুন সমীকরণ
শুধু গরুর বাজারই নয়, পাচারের এই বিশাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে স্থানীয় কৃষিনীতিও। রানিনগর ও সংলগ্ন এলাকার কলা এবং পাট চাষিরা এখন তাদের উৎপাদিত ফসল সরাসরি হাটে বিক্রি করার চেয়ে পাচারকারীদের কাছে গাছসহ বিক্রি করাতেই বেশি লাভ দেখছেন। একটি কলাগাছ যেখানে ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় অনায়াসে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, সেখানে কলার কাঁদি বিক্রি করে ১০০ টাকাও লাভ থাকে না চাষিদের। এছাড়া গাছ জমিতে থাকলে পরিচর্যা ও পাহারার বিশাল খরচ রয়েছে। একই অবস্থা পাট চাষিদের ক্ষেত্রেও। পাট কাটা, জাগ দেওয়া এবং শুকিয়ে ঘরে তোলার ঝক্কি এড়াতে বিঘা প্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় পুরো পাটের খেত পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন কৃষকরা। নগদ ও দ্রুত টাকার আশায় কৃষকরাও এই পাচার প্রক্রিয়ার নীরব অংশীদার হয়ে উঠছেন।
কলাগাছ ও পাটের ভেলার অভিনব কৌশল
সীমান্তে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) এবং স্থানীয় পুলিশের কড়া নজরদারি এড়াতে এবার সম্পূর্ণ এক অভিনব ও তাক লাগানো কৌশল বেছে নিয়েছে পাচারকারীরা। ভরা পদ্মার প্রবল স্রোতকে কাজে লাগিয়ে তারা তৈরি করছে কলাগাছ ও পাটের আঁটির বিশেষ ছদ্মবেশী ভেলা। এই ভেলার মাঝখানটা এমনভাবে কাটা থাকে, যেখানে একটি মাঝারি বা বড় আকারের গরুকে ঢুকিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া যায়। গরুর কেবল নাক ও মুখের অংশটুকু ভেলার ওপরে ভাসমান থাকে শ্বাস নেওয়ার জন্য, আর বাকি পুরো শরীর থাকে জলের নিচে। দূর থেকে দেখলে বা রাতের অন্ধকারে সার্চলাইট ফেললেও মনে হয়, নদীতে কেবল কলাগাছ বা পাটের স্তূপ ভেসে যাচ্ছে। স্রোতের টানে এই ভাসমান ভেলাগুলো নিঃশব্দে এবং খুব সহজেই পদ্মার এপাড় থেকে ওপাড়ের গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চরম বিভ্রান্তি
পাচারকারীদের এই অত্যাধুনিক ও প্রাকৃতিক ছদ্মবেশ ধরতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে বিএসএফ এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। প্রথমদিকে সদ্য বদলি হয়ে আসা বিএসএফ ব্যাটালিয়ন এই কৌশলের বিন্দুবিসর্গও আঁচ করতে পারেনি। রাত জেগে নদীর পাড়ে কড়া পাহারা দেওয়া জওয়ানরা টেরই পাননি কীভাবে ঈদের ভরা বাজারে পদ্মার স্রোতে ভেসে শত শত গরু ওপারে চলে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রথাগত পাচারের সব পথ বন্ধ থাকায় পদ্মাই হয়ে উঠেছে পাচারকারীদের শেষ ও নিরাপদ আশ্রয়।
ডোমকল ও রানিনগর এলাকার পুলিশ প্রশাসনও চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছে। এতদিন তারা সড়কপথে ট্রাকে বা পিকআপ ভ্যানে তল্লাশি চালিয়ে গরু পাচার ঠেকানোর চেষ্টা করতেন। কিন্তু এখন তাদের নজরদারির ধরন পুরোপুরি পাল্টাতে বাধ্য হতে হয়েছে। রাতের অন্ধকারে কোন রাস্তা দিয়ে কলাগাছ বোঝাই ট্রাক্টর নদীর দিকে ছুটছে বা কোন খেতের পাট কেটে রাতারাতি পদ্মায় ফেলা হচ্ছে—সেটি পাহারা দিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নাভিশ্বাস উঠছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে চোরাকারবারিদের এই অভিনব কৌশল সীমান্ত নিরাপত্তায় এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার