রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন

ভারতে হয়রানি এড়াতে গরু কোরবানি বর্জনের কৌশলগত আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

আসন্ন ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ভারতে নতুন করে উসকে উঠেছে গরু ও মহিষ কোরবানি কেন্দ্রিক বিতর্ক। দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে গোরক্ষক বা ‘কাউ ভিজিল্যান্ট’ গোষ্ঠীগুলোর দৌরাত্ম্য এবং প্রশাসনের রহস্যময় নীরবতার কারণে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই ভারতের বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার এবং হায়দরাবাদের প্রভাবশালী আলেম মাওলানা মোহাম্মদ জাফর পাশা এক ব্যতিক্রমী ও কৌশলগত আহ্বান জানিয়েছেন, যা দেশটির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তিনি দেশের মুসলিমদের প্রতি অন্তত এক বছরের জন্য গরু ও মহিষ কোরবানি থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্য কেবল ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি নীরব প্রতিবাদের কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কৌশলগত বর্জনের ডাক ও নেপথ্যের কারণ

মাওলানা জাফর পাশা তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, গরু বা মহিষ কোরবানি থেকে এই সাময়িক বিরত থাকা কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি একটি ‘কৌশলগত বর্জন’ বা স্ট্র্যাটেজিক বয়কট।

তিনি মনে করেন, প্রতি বছর কোরবানির সময় পশু কেনা ও পরিবহনকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের টার্গেট করে যে পরিকল্পিত হয়রানি চালানো হয়, তা রুখে দেওয়ার এটি একটি মোক্ষম উপায়। এক বছর যদি মুসলিম সম্প্রদায় এই ধরনের বড় পশু কেনা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখে, তবে এর মাধ্যমে বিরোধীদের কাছে একটি অত্যন্ত কড়া ও সুনির্দিষ্ট বার্তা পৌঁছানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এই বর্জনের ফলে পশুর বাজারের অর্থনীতিতে যে বিশাল ধাক্কা লাগবে, তা প্রশাসন এবং উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে পরিস্থিতি নতুন করে মূল্যায়নে বাধ্য করতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

গোরক্ষকদের তাণ্ডব ও নিরাপত্তাহীনতা

হায়দরাবাদসহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে এই প্রখ্যাত আলেম জানান, কোরবানির উদ্দেশ্যে গরু ও মহিষ কিনতে গিয়ে সাধারণ ক্রেতারা চরম অমানবিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

  • পশু ছিনতাই ও শারীরিক হেনস্তা: রাস্তায় ট্রাক বা পিকআপ ভ্যান থামিয়ে তথাকথিত গোরক্ষক গোষ্ঠীর সদস্যরা আইন নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে। বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও পশু ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।

  • প্রশাসনের নীরবতা: মাওলানা জাফর পাশা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, এই ধরনের প্রকাশ্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কঠোর অবস্থান লক্ষ করা যাচ্ছে না। প্রশাসনের এই নির্লিপ্ততা উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে আরও বেপরোয়া করে তুলছে, যার ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গেও বিধিনিষেধের কড়াকড়ি

গরু ও মহিষ কোরবানি নিয়ে বিতর্কের আঁচ কেবল হায়দরাবাদ বা উত্তর ভারতেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গেও। রাজ্যটিতে সম্প্রতি গরু ও মহিষ জবাই সংক্রান্ত নানা পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ বিধিনিষেধ নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রশাসনের বিভিন্ন নির্দেশনার বেড়াজালে পড়ে ঈদের মৌসুমে পশু কেনাবেচা এবং কোরবানির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে। নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল ছাড়া বড় পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে নানা আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের উৎসবের আনন্দকে ম্লান করে দিচ্ছে।

ছাগলের দিকে ঝুঁকছেন ক্রেতারা, অর্থনীতিতে ধস

নিরাপত্তাহীনতা ও হয়রানির ভয়ে ভারতের অনেক মুসলিম পরিবার এবার গরু বা মহিষের পরিবর্তে ছাগল ও ভেড়া কোরবানির দিকে ঝুঁকছেন। এই আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে স্থানীয় পশুর বাজারে এক বিশাল প্রভাব পড়েছে।

  • খামারিদের বিপর্যয়: যেসব খামারি ও ব্যবসায়ী সারা বছর ধরে ঈদের মৌসুমে বিক্রির আশায় গরু ও মহিষ লালন-পালন করেছিলেন, তারা এখন চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা ও বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। ক্রেতা না থাকায় অনেক ব্যবসায়ী পুঁজি হারানোর আশঙ্কায় ভুগছেন।

  • ছাগলের দাম আকাশচুম্বী: অন্যদিকে, ছাগল ও ভেড়ার চাহিদা রাতারাতি বেড়ে যাওয়ায় বাজারে এসব পশুর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে, এবারের ঈদুল আজহা ভারতের মুসলিমদের জন্য কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি তাদের আইনি অধিকার, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন পরীক্ষার সময় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মাওলানা জাফর পাশার এই কৌশলগত বর্জনের আহ্বান শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা হয়তো ঈদের পরেই ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।


এ জাতীয় আরো খবর...