বেগম রুনু সিদ্দিকী ছিলেন আমার আম্মার ছোট খালা। আমরা ডাকতাম রুনু নানু। খুব বিদুষী ও অভিজাত মহিলা ছিলেন। খ্যাতি এবং শ্রদ্ধাও অর্জন করেছিলেন বিস্তর। তাঁকে চট্টগ্রামবাসীরা ‘আলোকিত নারী’ উপাধি দিয়েছিলেন। সারাজীবন মানবসেবায় নিয়োজিত নানুকে জাতিধর্মনির্বিশেষে অনেকেই ‘মা’ ডাকতেন। তিনি খুব পরহেজগার ছিলেন।
আমার মেয়ে জন্ম নেওয়ার কিছুদিন পর রুনু নানু তাকে দেখতে এলেন।
বাসায় ঢুকে ওজু করে তিনি আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ দোয়া-দরুদ পড়লেন।
আম্মা তাঁকে বললেন- ‘বাদলের মাথা খুব গরম। ওর রাগ কমার জন্য একটু দোয়া করে দিন।’
দোয়া পড়া শেষ করে নানু আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন- তাতে একধরনের পবিত্র আভা।
তিনি বললেন- ‘ভাই, বাচ্চা হওয়ার পর মানুষকে বদলে যেতে হয়। নয়ত ভালো বাবা হতে পারে না। হুমায়ূন আহমেদ যতোই বলুন, পৃথিবীতে কোনো খারাপ বাবা নেই- আসলে আছে। প্রচুর আছে।’
তারপর তিনি যা বললে তার সারমর্ম হচ্ছে-
১ ) যাই করো না কেন তার আগে ভাববে সেটি তোমার মেয়ের উপর কী প্রভাব ফেলবে।
২) যতবার তাকে দেখবে ততবার ভাববে এখন আর ভুল করার সুযোগ নাই- কারণ তোমার ভুলের কারণে যে ক্ষতি হবে তার ভার মেয়েকেও বইতে হবে।
৩) বিশেষ করে মেয়ের বাবারা দুঃশ্চিন্তায় ভোগে। খুব স্বাভাবিক। আমাদের দেশে মেয়েদের নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় ভোগার অনেক কারণ আছে। তবে, মেয়ের বাবাদের চিন্তিত নয়, সাহসী হওয়া উচিত। কারণ তাকে মেয়েকে আগলে রাখতে হবে। ভীতু বাবাদের মেয়েদের সমস্যা বেশি হয়।
৪) কেউ যখন মেয়ের বাবা হয় তখন সে একটি মেয়ের বাবা হয় না। এক অর্থে দুনিয়ার সব মেয়ের বাবা হয়ে যায়। এখন তোমার দায়িত্ব শুধু নিজের মেয়ে নয়- সব মেয়ের সম্মান রক্ষা করা। নইলে নিজ মেয়ের কাছেই ছোট হয়ে যাবে।
৫) তোমার মেয়ে শুধু তোমাকে বাবা বানায়নি- তোমাকে নতুন মানুষ হওয়ার এক লম্বা ভ্রমণে নামিয়েছে। এ যাত্রাপথে তোমাকে প্রতিদিন একটু একটু বদলাতে হবে। কন্যা যত বড় হবে তোমাকে তত শুদ্ধ হতে হবে। অশুদ্ধ বাপের মেয়েদের ভুগতে হয়।
৬) তোমার মা বলল, তোমার রাগ বেশি। এরপর রাগ করলে মেয়ের দিকে তাকাবে। দেখবে সে ভয়ে কেঁপে উঠছে, কান্না করছে। তাহলে আর রাগ করতে ইচ্ছে করবে না।
৭) এখন তোমাকে শত শত বার ‘ না’ বলতে হবে। অনেক প্রলোভনকে না বলতে হবে, অনেক মানুষকে না বলতে হবে, অনেক প্রস্তাবকে না বলতে হবে। বাবা হওয়ার আগে যা করা যায় বাবা হওয়ার পর তা করা যায় না।
কথা শেষে তিনি আমার দিকে তাকালেন- তারপর বললেন, তোমাকে চারটি দেয়াল তৈরি করতে হবে।
চরিত্র
আত্মমর্যাদা
আত্মনিয়ন্ত্রণ
এবং
ন্যায়পরায়ণতা।
এ চার দেয়াল যারা তৈরি করতে পারেন তাঁরা আল্লাহপাকের কাছে সম্মানিত হন এবং সম্মানিত মানুষের সন্তানকেও মহান আল্লাহতায়ালা অসম্মানিত হতে দেন না।
কথা শেষ করে তিনি আমার মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে সুরা পড়তে লাগলেন।
তাঁর গা থেকে অপূর্ব এক সুগন্ধ ভেসে আসছে।
নানু নেই অনেক বছর। তাঁর জন্য দোয়া করবেন।
পাদটীকা: রুনু নানু আমার মেয়েকে কেন্দ্র করে কথাগুলো বললেও সেগুলো ছেলের বাবাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ছবি: পত্রিকা থেকে নেওয়া। তাঁর মৃত্যু সংবাদের সাথে এটি ছাপা হয়েছিল। অনেকগুলো পত্রিকা একই ছবি ব্যবহার করেছিল বলে কোনটি থেকে নিয়েছিলাম তা মনে করতে পারছি না।
• আসুন মায়া ছড়াই