শিরোনামঃ
২ বছর ধরে নিখোঁজ লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ২৩ বাংলাদেশি সোনার বাজারে অস্থিরতা এখন সোনা কিনবেন নাকি বেচবেন বঙ্গোপসাগরের বিশাল গ্যাস সম্পদ উত্তোলনে আটকে আছে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিবি প্রেসিডেন্টের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে ইরানের সম্মতি, চুক্তির সম্ভাবনা আতাউর রহমানের স্মরণসভায় আবুল হায়াতের আক্ষেপ সুস্থ ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা গরু চেনার উপায় চুক্তি না হলে ইরানের সঙ্গে ‘বড় সংঘাতের’ হুঁশিয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টাঙ্গাইলে রডবাহী ট্রাক খাদে উল্টে নিহত পনেরো যাত্রী টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজায় নেই কোরবানির ঈদ
বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ১২:৪০ পূর্বাহ্ন

বঙ্গোপসাগরের বিশাল গ্যাস সম্পদ উত্তোলনে আটকে আছে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬

বঙ্গোপসাগরের অথৈ নীল জলরাশির নিচে লুকিয়ে রয়েছে হাজার হাজার কোটি ঘনফুট গ্যাস ও মূল্যবান খনিজ সম্পদ। অথচ নিজেদের এই ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল সম্পদকে কাজে লাগাতে না পেরে, চরম জ্বালানি সংকট মেটাতে প্রতি বছর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (LNG) আমদানি করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। শুধুমাত্র চলতি বছরেই এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৫৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। বর্তমানে যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানিও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশাল সমুদ্রসীমা থাকার পরও নিজেদের গ্যাস উত্তোলনে এই ব্যর্থতার পেছনে কি শুধুই কারিগরি বা প্রযুক্তিগত অক্ষমতা দায়ী? নাকি এর গভীরে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির এক অত্যন্ত জটিল ও বহুমুখী সমীকরণ?

মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে সমুদ্র জয়ের পর দেশজুড়ে যে আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল, আজ তা কেবলই দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছে। মানুষ ভেবেছিল, এবার হয়তো দেশের চিরস্থায়ী জ্বালানি সংকটের একটি যৌক্তিক সমাধান হবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে।

সমুদ্র জয়ের এক যুগ: শুধুই ব্লু ইকোনমির গল্প

মিয়ানমারের কাছ থেকে সমুদ্রসীমা জয়ের ১৪ বছর এবং ভারতের ক্ষেত্রে ১২ বছর পেরিয়ে গেছে। আমাদের সমুদ্র এলাকা আগে যেমন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল, আজও ঠিক তেমনি আছে। স্বাধীনতাসূচক এই বিশাল অর্জনের পর প্রতিটি সরকারই ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সুনীল অর্থনীতির রঙিন গল্প শুনিয়েছে, কিন্তু সাগর থেকে সম্পদ উত্তোলনে বাস্তবে কেউ কোনো কার্যকর বা শক্তিশালী উদ্যোগ নেয়নি।

প্রতিবেশীরা যখন নিজেদের সীমানা থেকে সম্পদ তুলে নিচ্ছে, বাংলাদেশ তখন হাত গুটিয়ে বসে আছে। মিয়ানমার তাদের ‘শয়ে’ (Shwe) গ্যাস ফিল্ড থেকে প্রতি বছর প্রায় ২০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করছে। অন্যদিকে ভারত তাদের কৃষ্ণা-গোদাবরী বেসিন থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস তুলছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ২০১২ সালে সমুদ্রসীমা জয়ের পর বঙ্গোপসাগরের দুটি ব্লকের ইজারা পেয়েছিল ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন’ (ONGC) এবং ‘অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড’। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কাজ করার পরও তারা বাংলাদেশের অংশে কোনো গ্যাসের সন্ধান পায়নি, অথচ নিজেদের সমুদ্রসীমায় তারা ঠিকই প্রতিনিয়ত বিলিয়ন বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করছে। এটি বাংলাদেশের জন্য চরম হতাশা ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।

ভূরাজনীতির চাদরে ঢাকা বঙ্গোপসাগর

বঙ্গোপসাগর কেবল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ একটি জলাধার নয়; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি সামুদ্রিক রুট। এই রুট ব্যবহার করেই চীনের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকায় যাতায়াত করে। আর ঠিক এখানেই শুরু হয়েছে পরাশক্তিগুলোর স্নায়ুযুদ্ধ:

  • চীনের কৌশলগত অবস্থান: মিয়ানমারের কিয়াউকপিউ (Kyaukpyu) গভীর সমুদ্রবন্দরের ৭০ শতাংশ মালিকানা চীনের হাতে। এই বন্দর থেকে চীনের কুনমিং প্রদেশ পর্যন্ত সরাসরি তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন রয়েছে।

  • যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তার: বিশ্বরাজনীতিতে চীনকে পদে পদে পরাস্ত ও কোণঠাসা করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তাই বঙ্গোপসাগর হয়ে চীনের এই নতুন রুটটিতেও তারা বাধা সৃষ্টি করতে মরিয়া।

  • ভারতের আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ: অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত এই পুরো অঞ্চলে নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বজায় রাখতে চায়।

এই তিন পরাশক্তির দড়ি টানাটানিতে কার্যত আটকে আছে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ভবিষ্যৎ।

এক্সনমবিলের প্রস্তাব ও হাসিনা সরকারের কালক্ষেপণ

২০২৩ সালের মার্চ মাসে মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট ‘এক্সনমবিল’ (ExxonMobil) সরাসরি পেট্রোবাংলাকে চিঠি দিয়ে গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের প্রস্তাব দেয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ বাণিজ্যিক প্রস্তাব মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল গভীর ভূরাজনৈতিক হিসাবনিকাশ। ব্লকগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান মিয়ানমার সীমান্তের খুব কাছাকাছি, যেখানে চীনের শক্ত অবস্থান রয়েছে। মার্কিন কোনো কোম্পানি এই ব্লকগুলোতে কাজ করলে তা স্বাভাবিকভাবেই চীনের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াত।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বা বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সামরিক ও বাণিজ্যিক উপস্থিতি নিয়ে একধরনের তীব্র আন্তর্জাতিক চাপ ছিল। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, সে সময় শেখ হাসিনা মনে করতেন যে যুক্তরাষ্ট্রকে সুযোগ দিলে চীন ও ভারত তার সরকারকে ফেলে দেবে। মূলত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এই ভয় থেকেই তিনি একটি লোকদেখানো যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে রাখেন।

বাংলাদেশ যে কতটা ভূরাজনৈতিক চাপে পিষ্ট, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ফরাসি কোম্পানি ‘শ্লামবার্জার’ (Schlumberger)-এর একটি জরিপ কাজের সময়। সমুদ্রে জরিপ কাজ চালানোর সময় বিশাল জাহাজটি ঘোরানোর জন্য ভারতীয় সমুদ্রসীমার মাত্র দেড় কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশের অনুমতির প্রয়োজন ছিল। পেট্রোবাংলা এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বারবার চিঠি দেওয়া সত্ত্বেও ভারত সেই অনুমতি দেয়নি। কারণ, ভারত কোনোভাবেই তাদের সীমানার এত কাছে চীনা কোনো জাহাজ বা প্রযুক্তির উপস্থিতি সহ্য করতে রাজি ছিল না। একইভাবে চীনও চায় না এই অঞ্চলে মার্কিন বা ভারতীয় আধিপত্য তৈরি হোক।

সরকার পরিবর্তন এবং নতুন উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (PSC)

গত আগস্ট মাসে প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে হাসিনা সরকারের পতন হলেও, বঙ্গোপসাগরের এই জিও-পলিটিক্যাল সমীকরণ কিন্তু মোটেও বদলে যায়নি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এক্সনমবিল দরপত্র ছাড়াই ওই ১৫টি ব্লক ইজারা নেওয়ার জন্য নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু দরপত্র ছাড়া সরাসরি চুক্তি করার কোনো আইনি বিধান না থাকায় সেটি সম্ভব হয়নি। জানা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় এক্সনমবিল সে সময় ডেমোক্র্যাটদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিল।

তবে বর্তমানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সমুদ্রসম্পদ উত্তোলনে গতি আনতে নতুন ‘উৎপাদন বণ্টন চুক্তি’ বা পিএসসি (PSC) অনুমোদন করেছে। এর মাধ্যমে বিদেশী কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে।

তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ব্যর্থ ইতিহাস:

  • ১৯৯৩ সাল: প্রথমবারের মতো সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান করা হয়, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

  • ১৯৯৭ সাল: দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বানের পর কিছু ব্লকে কাজ শুরু হলেও তা পরে বন্ধ হয়ে যায়।

  • ২০০৮ সাল: মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপস (ConocoPhillips) কাজ শুরু করে। কিন্তু গ্যাসের দাম নিয়ে সরকারের সাথে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় ২০১২ সালে তারা কাজ ফেলে চলে যায়।

  • সাম্প্রতিক সময়: হাসিনা সরকারের শেষ সময়ে এবং ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানো সত্ত্বেও বড় কোনো বিদেশি কোম্পানি দরপত্র জমা দেয়নি।

সমাধানের পথ ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, পরাশক্তিগুলোর এই অন্তহীন চক্র থেকে বের হতে হলে বাংলাদেশকে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। হাত গুটিয়ে বসে থাকলে প্রতিবেশীরাই লাভবান হবে। বর্তমানে চীন এবং মালয়েশিয়া গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দারুণ সাফল্য পেয়েছে। তাই বাংলাদেশ যদি কেবল পশ্চিমা বা ভারতীয় কোম্পানির ওপর নির্ভর না করে চীন ও মালয়েশিয়ার সাথে যৌথ উদ্যোগে কাজ করে, তবে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের (BAPEX) সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনাও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ড. ইউনূসের সরকার বারবার সময় বাড়িয়েও চীন বা রাশিয়ার কোনো কোম্পানিকে দরপত্রে অংশ নিতে রাজি করাতে পারেনি।

বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ন্যূনতম অধিকার ও সাহস বাংলাদেশের থাকতে হবে। পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্বে পড়ে বছরের পর বছর নিজেদের ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ ফেলে রাখা এবং এলএনজি আমদানি করে ৫৬ হাজার কোটি টাকা অপচয় করা কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি তাঁর এক বক্তব্যে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তাঁর সরকারের মূল নীতি হলো—”সবার আগে বাংলাদেশ”। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের এই ত্রিমুখী স্বার্থের দ্বন্দ্বে সরকার যদি সত্যিই মাথা নত না করে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি শক্তভাবে প্রয়োগ করতে পারে, কেবল তখনই বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি থেকে উঠবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির চূড়ান্ত চাবি।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪


এ জাতীয় আরো খবর...