আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে পশুবাহী ট্রাক যাতায়াত শুরু করেছে। তবে মহাসড়কগুলো এখন কোরবানির পশুবাহী ট্রাকের জন্য একরকম ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজশাহী, সাতক্ষীরা, রাঙামাটিসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছেড়ে আসা এসব পশুবাহী পরিবহন থেকে পথে পথে পুলিশ, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও শ্রমিক ইউনিয়নের নামে ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও আবার ছিনতাইয়ের মতো গুরুতর অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে।
রাজশাহী থেকে চট্টগ্রামে চাঁদার মহোৎসব
উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ পশুর হাট হিসেবে পরিচিত রাজশাহী সিটি হাট। প্রতিদিন এই হাট থেকে ২৫ থেকে ৩০ হাজার গরু, ছাগল ও মহিষ বিক্রি হয় এবং প্রতি রাতে প্রায় ৫০০ পশুবাহী ট্রাক দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের দিকে রওনা হয়। কিন্তু এই ট্রাকগুলোর যাত্রাপথ মোটেও মসৃণ নয়। রাজশাহী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রায় ৫০০ কিলোমিটার মহাসড়কের অন্তত ২০টি স্থানে চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন চালকরা। প্রতিটি ট্রাক থেকে সব মিলিয়ে ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ট্রাকচালক অভিযোগ করেন, রাজশাহী সিটি হাট থেকে বেরিয়ে বেলপুকুর পৌঁছাতেই কতিপয় পুলিশ সদস্য ট্রাক থামিয়ে ৫০০ টাকা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে আরও ৩০০ টাকা চাঁদা আদায় করে। এরপর পুঠিয়া, নাটোরের বনপাড়া, সিরাজগঞ্জের যমুনা সেতুর আগে, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা, সখিপুর, গোড়াই এবং গাজীপুর চৌরাস্তাতেও একইভাবে চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে চালকদের শারীরিক লাঞ্ছনা করা হয় এবং কাগজপত্র পরীক্ষার নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে হয়রানি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সামান্য ত্রুটি দেখিয়ে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে হাইওয়ে পুলিশ।
রাজশাহী অঞ্চলের হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসপি আবু তোরাব মোহাম্মদ শামসুল আলম জানান, তারা এ বিষয়ে নজরদারি বাড়িয়েছেন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকায় প্রবেশের পর বাড়ে হয়রানি
পশুবাহী ট্রাকগুলো ঢাকায় প্রবেশের পর গাবতলী, শনির আখড়া, মদনপুর এবং গাউছিয়া এলাকায় হাইওয়ে পুলিশ এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের দ্বারা পুনরায় চাঁদাবাজির শিকার হয়। হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি আব্দুল্লাহ হিল বাকি জানিয়েছেন, মহাসড়কে চাঁদাবাজি রোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
তবে চালকদের অভিযোগ, গভীর রাতে দ্রুতগামী ট্রাককে হঠাৎ সিগন্যাল দিয়ে থামানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এছাড়া ঢাকা-বাইপাস, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী ও গুলিস্তান ফ্লাইওভারে যানজটের সুযোগ নিয়ে ছিনতাইকারীরা ট্রাকে উঠে ধারালো অস্ত্রের মুখে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার ঘটনাও ঘটাচ্ছে। সম্প্রতি ঈশ্বরদী থেকে আসা একটি ট্রাক ঘোড়াশালে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছিল, যদিও পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ট্রাকসহ গরুগুলো উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
সাতক্ষীরা ও রাঙামাটির চিত্র অভিন্ন
শুধু উত্তরাঞ্চল নয়, সাতক্ষীরা ও রাঙামাটিতেও অভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সাতক্ষীরার বিভিন্ন প্রবেশপথ এবং মহাসড়কে ‘লাইন খরচ’, ‘শ্রমিক খরচ’ বা ‘ম্যানেজ’ করার নামে চাঁদাবাজি চলছে। কলারোয়া ও তালা সড়ক দিয়ে ঢাকা বা অন্যান্য জেলায় যাওয়ার পথে বিভিন্ন স্থানে ট্রাক থামিয়ে হাজার হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। ট্রাকচালক তরিকুল জানান, শ্রমিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে পুরো পথে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়।
সাতক্ষীরা জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক নেতা আজহারুল ইসলাম চাঁদাবাজির সঙ্গে সংগঠনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন। তবে সাতক্ষীরার ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক মসিউর রহমান জানিয়েছেন, পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজির প্রমাণ পেলে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে রাঙামাটির পাহাড়ি এলাকা থেকেও পশু পরিবহনের সময় টোল বা অন্যান্য খরচের নামে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। মানিকছড়ি থেকে হাটহাজারী পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে চাঁদা দিতে হয় বলে জানিয়েছেন এক ব্যবসায়ী। কোতোয়ালি থানার ওসি মো. জসীম উদ্দিন জানিয়েছেন, চাঁদাবাজি রোধে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জে পাঁচ পুলিশ সদস্য ক্লোজড
চাঁদাবাজির অভিযোগে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল এলাকায় হাইওয়ে থানার একজন এসআইসহ পাঁচ কনস্টেবলকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে। গরুবাহী ট্রাক থেকে চাঁদা নেওয়ার একটি ভিডিও সংবাদমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে পথে পথে এমন বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও হয়রানির কারণে পশুবাহী ট্রাকের ভাড়া ও পরিবহন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যার চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়ছে কোরবানির পশুর দামের ওপর এবং শেষ পর্যন্ত এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদেরকেই।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর