পবিত্র ঈদুল আজহার প্রথম দিনে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া ব্যাপকভাবে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) বিকেল ৬টা পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি কাঁচা চামড়া শিল্পনগরীতে পৌঁছেছে। চামড়া প্রবেশ ও ব্যবস্থাপনায় কোনো বিশৃঙ্খলা না থাকলেও, কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় তীব্র আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন বিক্রেতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
চামড়া শিল্প নগরীর বিসিক কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাইয়ানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঈদের দিন দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত ১৯২টি ট্রাকে করে মোট ৪৩ হাজার ৮৬৭ পিস কাঁচা চামড়া শিল্পনগরীতে এসেছে। এর মধ্যে গরু ও মহিষের চামড়া রয়েছে ৪৩ হাজার ৫১৪ পিস এবং ছাগল ও ভেড়ার চামড়া এসেছে ৩৫৩ পিস। দিনের প্রথম ধাপে মূলত রক্তমাখা কাঁচা চামড়াগুলোই বেশি প্রবেশ করেছে। আড়ত ও ট্যানারিতে পৌঁছানোর পরপরই শ্রমিকরা দ্রুত চামড়ায় লবণ মাখানোর কাজ শুরু করে দিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, শিল্পনগরীতে চামড়া প্রবেশ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এবার বেশ শৃঙ্খলা রয়েছে। ঈদের এই বাড়তি চাপ সামলাতে বিসিক, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় ও জেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে। সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও দ্রুত চামড়া সংরক্ষণের কাজ এগিয়ে নিতে অতিরিক্ত স্বেচ্ছাসেবকও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের প্রধান অভিযোগ হলো, সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় আড়তদাররা অনেক কম দাম হাঁকাচ্ছেন। তবে এর বিপরীতে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে সরাসরি ট্যানারিতে আসা মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে। যারা সরাসরি ট্যানারিতে চামড়া আনছেন, তারা আড়তের তুলনায় কিছুটা ভালো দাম পাচ্ছেন। অনেক বিক্রেতা পূর্বপরিচিত ট্যানারিগুলোতে দাম নির্ধারণ ছাড়াই চামড়া রেখে যাচ্ছেন লবণজাত করার জন্য। পরবর্তীতে ট্যানারি কর্তৃপক্ষের ডাকে সাড়া দিয়ে তারা দাম চূড়ান্ত করবেন, যেখানে সাধারণত দাম নিয়ে খুব একটা জটিলতা পোহাতে হয় না।
চামড়ার কম দামের পেছনে নিজেদের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরেছেন আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা। হেমায়েতপুর চামড়ার আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি আজিজুর রহমান জানান, তাদের মূল সমস্যা অর্থসংকট। ট্যানারিগুলোতে আড়তদারদের প্রচুর টাকা বকেয়া পড়ে আছে এবং তারা কোনো ঋণ সুবিধাও পান না। হাতে নগদ অর্থ না থাকায় অতিরিক্ত চামড়া কেনা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে তারা সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া কেনার চেষ্টা করেন, যা চামড়ার আকার ও মানের ওপরও নির্ভর করে।
ট্যানারি মালিকরা বলছেন, চামড়া ব্যবসায়ের আগের সেই উৎসবমুখর পরিবেশ আর নেই। ব্যবসায়িক মন্দা, ক্রমাগত দরপতন এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে এককভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে অনেক ব্যবসায়ী বড় অঙ্কের লোকসান গুনেছেন, এমনকি ঋণখেলাপিও হয়েছেন। আজমীর লেদারের মালিক মো. শহিদুল্লাহ জানান, তাদের কারখানায় আগে থেকেই ৫০ হাজার পিস চামড়া মজুত রয়েছে। এবার ২০ হাজার পিস কেনার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, মূলত পুরোনো পরিচিতদের কাছ থেকেই তারা চামড়া সংগ্রহ করছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান জানান, এ বছর প্রায় এক কোটি পিস কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। তবে রাতে বড় লটে বেচাকেনা হওয়ার কারণে চামড়া ঠিকমতো যাচাই করা যায় না, যার ফলে দর নির্ধারণে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী দুদিনে সাভার শিল্পনগরীতে চামড়া প্রবেশের পরিমাণ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।