পবিত্র ঈদুল আজহার দিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে এক চরম নৈরাজ্য ও হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে। পোস্তা, টাউন হল, সায়েন্স ল্যাব, ধানমন্ডি বা কলাবাগান—সর্বত্রই চামড়ার দাম নিয়ে বিক্রেতাদের মাঝে এক ধরনের হাহাকার বিরাজ করছে। সরকার চলতি বছর গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম কিছুটা বাড়ালেও বাস্তব বাজারে তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। উল্টো গত বছরের তুলনায় প্রতিটি কাঁচা চামড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী ও সাধারণ কোরবানিদাতারা। এর পাশাপাশি ছাগলের চামড়ার বাজার পুরোপুরি ধসে পড়েছে, যেখানে প্রতিটি চামড়া মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে কিংবা অনেক ক্ষেত্রে বিক্রেতারা তা বিনামূল্যে দিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত এবং মাদ্রাসা বা এতিমখানাগুলোর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়া সত্ত্বেও চামড়া খাতটি বছরের পর বছর ধরে চরম অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের শিকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করেছে, যা গতবারের চেয়ে ২ টাকা বেশি। সেই সরকারি হিসাব অনুযায়ী, একটি ছোট আকারের গরুর কাঁচা চামড়া (লবণ ও শ্রমিকের খরচ বাদ দিয়ে) ৬৫০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। একইভাবে মাঝারি চামড়া ৯৫০ থেকে দেড় হাজার টাকা এবং বড় চামড়া ১৫৫০ থেকে ২৩০০ টাকা পর্যন্ত দাম পাওয়ার কথা। কিন্তু রাজধানীর বাজারগুলোতে ছোট চামড়া ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা, মাঝারি চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা এবং বড় চামড়া মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় কেনাবেচা হতে দেখা গেছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের আক্ষেপ, সরকারি দর কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
রাজধানীর লালবাগের পোস্তা এলাকায় সকাল থেকেই চামড়া বেচাকেনার ব্যস্ততা দেখা গেলেও বিক্রেতাদের চোখেমুখে ছিল সুস্পষ্ট হতাশা। কলাবাগান এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন জানান, গত বছর তিনি যে আকারের চামড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছেন, এবার ব্যাপারীরা তার দাম ৬৫০ টাকার বেশি বলতে রাজি হননি। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্যানারির মালিকেরা সিন্ডিকেট করে আগেভাগেই দাম কমিয়ে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ফলে আড়তদার ও ফড়িয়ারাও সেই অনুযায়ী কম দামে চামড়া কিনছেন। ফড়িয়াদের দাবি, ট্যানারিগুলো রাসায়নিক, লবণ ও শ্রমিক খরচ বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে চামড়ার রেট কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে আড়তদাররাও পরিবহন ও গুদাম ভাড়াসহ সংরক্ষণের বাড়তি খরচের কথা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন।
তবে ট্যানারি মালিকদের পক্ষ থেকে দরপতনের এই বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ দাবি করেন, কাঁচা চামড়ার দাম কমেনি বরং তিনি নিজেই ৬৫০ থেকে ৯৫০ টাকা দরে চামড়া কিনেছেন। তার মতে, অনেক বিক্রেতা হয়তো তাড়াহুড়ো করে কম দামে চামড়া ছেড়ে দিচ্ছেন। এদিকে গরুর চামড়ার পাশাপাশি ছাগলের চামড়ার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমার অজুহাতে ব্যবসায়ীরা ছাগলের চামড়া কিনতেই চাইছেন না। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী এবার কোরবানি কিছুটা কম হওয়ায় চামড়ার সরবরাহও গত বছরের তুলনায় কম দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র কাগজে-কলমে দাম নির্ধারণ না করে মাঠপর্যায়ে তার কঠোর বাস্তবায়ন এবং সাভারের ট্যানারি শিল্পের আধুনিকায়ন ছাড়া এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিরসন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।