শিরোনামঃ
মহাখালীতে রুবেল বাহিনীর ত্রাসে জিম্মি পুরো হাসপাতাল পাড়া কতটুকু মাংস খাওয়া নিরাপদ? মাসিক ব্যবস্থাপনায় শৌচাগার সংকট ও সামাজিক সচেতনতার অভাব কলকাতায় কোরবানির ঈদ: রাজনৈতিক পালাবদলে চেনা উৎসবের নতুন রূপ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনী ঘিরে হুমকি: উদ্বিগ্ন নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মীরা আপনার হাতে থাকা টাকার মূল্য কতটা কমে গেছে জানেন? এটিএম বুথে নগদ টাকার সংকট, চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ চামড়ার বাজারে চরম ধস হতাশায় ভুগছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ঢুকলো ৪০ হাজার কাঁচা চামড়া যৌন সহিংসতার অভিযোগে জাতিসংঘ কর্তৃক ইসরাইল কালো তালিকাভুক্ত
শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ০৯:২৫ অপরাহ্ন

কলকাতায় কোরবানির ঈদ: রাজনৈতিক পালাবদলে চেনা উৎসবের নতুন রূপ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এবারের কোরবানির ঈদ কলকাতা এবং এর আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন মাত্রা নিয়ে হাজির হয়েছিল। দীর্ঘদিনের চেনা উৎসব, চিরাচরিত আচার-অনুষ্ঠান এবং উৎসবমুখর পরিবেশে এবার বেশ কিছু বড় ধরনের পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক কড়াকড়ি লক্ষ্য করা গেছে। রাজ্যের নতুন সরকারের নেওয়া বেশ কিছু আইনি ও কাঠামোগত সিদ্ধান্তের কারণে এবারের ঈদে শহর কলকাতার চিরায়ত দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গিয়েছিল। একদিকে যেমন যানজট নিরসন এবং নিয়মানুবর্তিতার কঠোর প্রয়োগ দেখা গেছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল দীর্ঘদিনের পুরনো অভ্যাস হারানোর এক ধরনের আক্ষেপ ও নস্টালজিয়া। ধর্ম ও রাজনীতির যে চিরচেনা মেলবন্ধন কলকাতার উৎসবগুলোতে দেখা যেত, এবারের ঈদে সেটিও বেশ সযত্নে এড়িয়ে চলা হয়েছে। সব মিলিয়ে এবারের কোরবানির ঈদ কলকাতাবাসীর জন্য ছিল এক সম্পূর্ণ নতুন, মিশ্র এবং অচেনা অভিজ্ঞতার।

কলকাতায় ঈদের জামাত মানেই রেড রোডের এক বিশাল ও ঐতিহাসিক জমায়েত—এই ধারণাটি এবার পুরোপুরি বদলে গেছে। বছরের পর বছর ধরে রেড রোডে ঈদের নামাজ পড়ার যে রেওয়াজ তৈরি হয়েছিল, এবার তার বদলে নামাজের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে। রেড রোডে নামাজের কারণে শহরের প্রধান এই রাস্তায় তীব্র যানজট তৈরি হতো এবং গত বছর এই স্থানে নামাজ পড়ার বিষয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীও আপত্তি জানিয়েছিল, কারণ স্থানটি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন। মূলত যানজট এড়াতে এবং সেনাবাহিনীর আপত্তির কথা মাথায় রেখেই আয়োজক সংস্থা ‘ক্যালকাটা খিলাফত কমিটি’কে বিকল্প জায়গা খুঁজতে বলেছিল কলকাতা পুলিশ। শেষ পর্যন্ত বিশাল আয়তনের কারণে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডকেই বেছে নেওয়া হয়। তবে স্থান পরিবর্তনের এই যৌক্তিক সিদ্ধান্তটি অনেকের মনেই এক ধরনের আক্ষেপ তৈরি করেছে। শৈশব থেকে বাবার হাত ধরে রেড রোডে নামাজ পড়তে আসা মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের মতো অনেকেই জায়গা বদলের কারণে এক ধরনের মানসিক শূন্যতা অনুভব করেছেন। ঝাড়খণ্ড থেকে কলকাতায় এসে গত পঁচিশ বছর ধরে রেড রোডে নামাজ আদায় করা মোহাম্মদ সোহেলও আক্ষেপ করে জানান, যানজট এড়ানোর যুক্তিটি ঠিক হলেও রেড রোড থেকে ঈদের জামাত সরে যাওয়ার বিষয়টি তাকে মানসিকভাবে বেশ ব্যথিত করেছে। তিনি অনিশ্চয়তার কারণে এবার পাড়ার মসজিদেই নামাজ আদায় করেছেন। তবে নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারুকের মতো অনেকেই আবার এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। তিনি মনে করেন, ব্রিগেডে জায়গার কোনো অভাব নেই, ফলে আগে এসে জায়গা দখলের তাগিদ থাকে না এবং যান চলাচলেও কোনো বিঘ্ন ঘটে না। ক্যালকাটা খিলাফত কমিটির মোহাম্মদ খলিলের মতে, স্থান পরিবর্তন এবং অন্যান্য কড়াকড়ির কারণে এবার রেড রোডের তুলনায় ব্রিগেডে মানুষের উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল।

এবারের ঈদে আরেকটি বড় পরিবর্তন ছিল রাস্তায় নামাজ পড়ার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর করা। সরকারের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, রাস্তা আটকে কোনো ধরনের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা নামাজ আদায় করা থেকে এবার সাধারণ মানুষকে কড়াভাবে বিরত রাখা হয়েছে। এর ফলে কলকাতাসহ রাজ্যের অন্যান্য জেলাগুলোর কোথাও এবার রাস্তায় নামাজ পড়ার চিরচেনা দৃশ্যটি চোখে পড়েনি। এর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজিরবিহীন কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত টিপু সুলতান মসজিদ থেকে শুরু করে নরেন্দ্রপুরসহ বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় মসজিদগুলোর বাইরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ এবং সশস্ত্র সিআরপিএফ জওয়ান মোতায়েন ছিল। উৎসবের দিনে উপাসনালয়ের বাইরে ভারী অস্ত্রের এমন পাহারায় সাধারণ মানুষ বেশ অবাক ও অস্বস্তিবোধ করেছেন। নরেন্দ্রপুরের বাসিন্দা মহিউদ্দিন লস্কর জানান, এলাকায় সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও মসজিদের বাইরে সশস্ত্র বাহিনীর এমন উপস্থিতি তিনি এর আগে কখনো দেখেননি, যা অনেকের মনেই অকারণে এক ধরনের চাপা ভীতি তৈরি করেছে। সকালে মল্লিক বাজারে বের হওয়া মোহাম্মদ হুসেনও জানান, রাস্তায় যানজট না থাকলেও উৎসবের সেই পুরনো আমেজটি এবার যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। তার মতে, এবারের ঈদে সাধারণ মানুষের ওপর অনেক বেশি বিধিনিষেধ বা ‘পাবন্ধি’ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কোরবানির ঈদের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ পশু কোরবানির ক্ষেত্রেও এবার প্রশাসনের তরফ থেকে অত্যন্ত কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন কঠোরভাবে বলবৎ করার কারণে এবার যত্রতত্র পশু জবাইয়ের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। নতুন আইনি নির্দেশিকা অনুযায়ী, গরু বা মহিষ জবাইয়ের ক্ষেত্রে পশুটির বয়স ১৪ বছরের বেশি হতে হবে এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত চিকিৎসকের শংসাপত্র বা সার্টিফিকেট থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়। এছাড়া প্রকাশ্যে জবাই না করে কেবলমাত্র পৌরসভা বা প্রশাসন নির্ধারিত কসাইখানায় পশু জবাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আইন অমান্যকারীদের জন্য জেল ও জরিমানার বিধানও রাখা হয়। প্রশাসনের এই কঠোর আইনি নির্দেশনার কারণে এবার কোরবানির পশুর হাটে বড় ধরনের ধস নামে। আইনি জটিলতা এবং শাস্তির ভয়ে অনেকেই এবার গরু কেনাবেচা বা কোরবানি দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থেকেছেন, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পশু ব্যবসায়ী ও গ্রামীণ খামারিদের ওপর।

তবে এবারের ঈদের অন্যতম বড় এবং ইতিবাচক দিক হিসেবে অনেকেই দেখছেন ঈদের জামাতকে পুরোপুরি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার বিষয়টিকে। বিগত বছরগুলোতে, বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামলে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীকে নিয়মিত ঈদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দেখা যেত। তিনি সেই মঞ্চ থেকে সম্প্রীতির বার্তার পাশাপাশি বিরোধীদের উদ্দেশ্যে কড়া রাজনৈতিক মন্তব্যও করতেন। তার পাশে তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদেরও দেখা যেত। কিন্তু এবারের ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের ঈদের জামাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রীর উপস্থিতি ছিল না। রাজ্যের বর্তমান ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা জানিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছেন। আয়োজকরা এই অনুষ্ঠানটিকে সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় গাম্ভীর্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছেন। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা খলিল আহমেদ এই পরিবর্তনটিকে অত্যন্ত ইতিবাচক আখ্যা দিয়ে বলেন, এই প্রথম ঈদের নামাজের মতো একটি পবিত্র অনুষ্ঠানকে কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থে বা প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। এটি সাধারণ মুসল্লিদের জন্য একটি বড় স্বস্তির বিষয়।

কলকাতার অন্যান্য স্থানে যখন নতুন নিয়মের বেড়াজালে ঈদ উদযাপিত হচ্ছে, তখন তপসিয়া এলাকার টালিখোলা মসজিদ সংলগ্ন অঞ্চলের চিত্রটি ছিল গভীর বিষাদের। কিছুদিন আগেই এই এলাকার একটি ভবনে বেআইনি চামড়ার ব্যাগ তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুজনের মৃত্যু হয় এবং বেশ কয়েকজন মারাত্মক আহত হন। এই ঘটনার পর প্রশাসনের নির্দেশে নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মিত ওই ভবনটির একাংশ ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং সেখানে বসবাসকারী সাধারণ আবাসিকদের উৎসবের আগেই ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানো এই মানুষগুলোর জন্য এবারের ঈদ কোনো আনন্দ বয়ে আনেনি। স্থানীয় বাসিন্দা এবং আতরের দোকানদার মোহাম্মদ জুনেইদ আক্ষেপ করে জানান, প্রতি বছর এই এলাকার রাস্তাঘাট উৎসবের আনন্দে মুখরিত থাকলেও, এবার ঘরছাড়া মানুষগুলোর নিদারুণ কষ্টের কারণে পুরো এলাকায় এক নীরব শোক বিরাজ করছে। স্থানীয় এক রিকশাচালকও এই অসহায় মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সব মিলিয়ে এবারের ঈদ কলকাতাবাসীর জন্য কেবল একটি উৎসবের দিন ছিল না, বরং এটি ছিল বদলাতে থাকা এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার এক নতুন পরীক্ষা। নাইজেরিয়া থেকে আসা পিএইচডি গবেষক উসমান শেখু অবশ্য এই রাজনীতির হিসাব-নিকাশের বাইরে ছিলেন। তিনি এই বিশাল জমায়েতে অংশ নিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। তবে কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য এবারের কোরবানির ঈদ ছিল শৃঙ্খলা, কড়াকড়ি, নস্টালজিয়া এবং বদলে যাওয়া এক সমাজচিত্রের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


এ জাতীয় আরো খবর...