বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজার হাজার ভ্রমণপিপাসু মানুষ। কিন্তু চরম অব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থার অভাব এবং অসচেতনতার কারণে এই আনন্দ ভ্রমণ মুহূর্তের মধ্যেই রূপ নিচ্ছে চিরস্থায়ী বিষাদে। বছরের পর বছর ধরে সাগরের উত্তাল ঢেউ আর তীব্র স্রোতের টানে ভেসে গিয়ে পর্যটকদের প্রাণহানি ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। পরিসংখ্যান বলছে, বিগত এক যুগে কক্সবাজারের উপকূলে গোসল করতে নেমে অন্তত ৭৪ জন পর্যটক অকালে প্রাণ হারিয়েছেন এবং নিখোঁজ হয়েছেন ২ জন। এর মধ্যে শুধুমাত্র গত এক বছরেই সাগরে ডুবে মারা গেছেন ২৫ জন পর্যটক। যদিও লাইফগার্ড কর্মীদের তৎপরতায় ১ হাজার ২৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তবুও এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর মিছিল কক্সবাজারের পর্যটন খাতের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক মস্ত বড় কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের এত বড় একটি পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের জীবন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আসলে কতটা প্রস্তুত বা দায়িত্বশীল, তা নিয়ে এখন তীব্র বিতর্ক ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজার সৈকতের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ সি-গাল পয়েন্ট। সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, এই পয়েন্টের বালুচরে বিপদের সঙ্কেত হিসেবে লাল পতাকা ওড়ানো থাকলেও সেখানে পর্যটকদের সতর্ক করার মতো কোনো দৃশ্যমান বা সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, দীর্ঘ প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই পয়েন্টটিতে পর্যটকদের নজরদারির জন্য কোনো ওয়াচ টাওয়ার বা পর্যবেক্ষণ চৌকি নেই, এমনকি কোনো লাইফগার্ড কর্মীর উপস্থিতিও চোখে পড়ে না। এই চরম নিরাপত্তা ঘাটতির মাঝেই প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই সাগরের উত্তাল পানিতে নামছেন। বেসরকারি লাইফগার্ড সংস্থা ‘সি-সেইফ’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে শুধুমাত্র এই অরক্ষিত সি-গাল পয়েন্টেই সাগরের টানে ভেসে গিয়ে ১২ জন পর্যটক অকালে মারা গেছেন। সমুদ্রের গোপন গতিপথ ও গুপ্ত গর্তের কারণে এই এলাকাটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কিন্তু সৈকতে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী না থাকায় এবং পর্যটকদের সচেতন করার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকায়, সাধারণ মানুষ ও অবুঝ শিশুরা লাল পতাকাকে উপেক্ষা করেই উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে মেতে উঠছে, যা প্রতিনিয়ত ডেকে আনছে বিপর্যয়।
সৈকতে আসা পর্যটকদের প্রধান অভিযোগ হলো, সাগরের কোন অংশটি গোসলের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ আর ঠিক কোন স্থানটি মৃত্যুঝুঁকিতে ভরা, সে সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার মতো কোনো দিকনির্দেশনামূলক ব্যবস্থা বা গাইডলাইন নেই। পর্যাপ্ত লাইফগার্ডের অভাব এবং সতর্কবার্তার ঘাটতি নতুন পর্যটকদের প্রতিনিয়ত এক চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ পর্যটকদের অনেকেই সাগরের জোয়ার-ভাটার তীব্র স্রোত সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। যেমন শরীয়তপুর থেকে আসা এক পর্যটক জীবন মোল্লা জানান, তারা মূলত দূরপাল্লার বাসে করে বান্দরবান ভ্রমণ শেষে সরাসরি কক্সবাজারে এসে পৌঁছান। দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তি সত্ত্বেও তারা কোনো বিশ্রাম না নিয়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সরাসরি সাগরের পানিতে নেমে পড়েন। সাগরের কোন পয়েন্টে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে বা লাল পতাকার প্রকৃত তাৎপর্য কী, সে সম্পর্কে তাদের কোনো পূর্বধারণাই ছিল না।
অন্য এক পর্যটক মো. লিংকন বলেন, যদিও তারা জানেন লাল পতাকার অর্থ বিপদ এবং সেখানে নামা নিষেধ, কিন্তু সৈকতে যখন দেখা যায় শত শত মানুষ সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বুক সমান পানিতে লাফালাফি করছে, তখন অন্যরাও সাহসের বশে বা দেখা-দেখি সাগরে নেমে পড়ে। যদি সৈকতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোরভাবে কাউকে বাধা দেওয়ার মতো কোনো লোক থাকত, তবে কেউ এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিত না। ঢাকার মিরপুর থেকে আসা আরেক পর্যটক জ্যোতি রহমান প্রশাসনের উদাসীনতার সমালোচনা করে বলেন, শুধু সৈকতের দুই কোণায় দুটি লাল কাপড় বা পতাকা ঝুলিয়ে দিয়েই কর্তৃপক্ষ নিজেদের দায়িত্ব শেষ মনে করে। অথচ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা কোটি মানুষের সচেতনতার জন্য কোনো লিফলেট বা সহজ নির্দেশিকা বিতরণ করা হয় না।
সি-গাল পয়েন্টে ছাতা বা কিটকট ব্যবসার সাথে জড়িত সুমন মুখার্জী জানান, গত বছর তাঁর চোখের সামনেই ১০ জনের বেশি মানুষ সাগরের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছেন। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন যে, এই পুরো পয়েন্টটিতে পর্যটকদের বাঁচানোর মতো কোনো লাইফগার্ডের বুথ বা কর্মী নেই। অনেক সময় পর্যটকেরা আবেগের বশে সাগরের অনেক গভীরে চলে যান, দূর থেকে চিৎকার করে ডাকলেও তারা সাউন্ড বা ঢেউয়ের কারণে শুনতে পান না অথবা শুনতে চাইলেও পাত্তাই দেন না। এখানে যদি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক লাইফগার্ড থাকত, তবে এই অকাল মৃত্যুগুলো সহজেই এড়ানো যেত।
can বা অন্যদিকে, সুগন্ধা পয়েন্টের পরিস্থিতি আরও বিচিত্র ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এক সাথে লাখের কাছাকাছি পর্যটক গোসল করছেন, অথচ তাঁদের জীবন রক্ষার গুরুদায়িত্ব পালন করছেন মাত্র চারজন লাইফগার্ড কর্মী! এই চারজনের মধ্যে আবার একজন বসে আছেন উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে, আর বাকি তিনজন পুরো সৈকতে হেঁটে হেঁটে লাখো মানুষকে সামলানোর চেষ্টা করছেন। এই জীবনরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মীদের নিজেদের সুরক্ষাই যেখানে নড়বড়ে, সেখানে পর্যটকদের তারা কীভাবে বাঁচাবেন? তাঁদের কাছে কোনো আধুনিক গতিসম্পন্ন স্পিডবোট বা জেট স্কি নেই। আদিম আমলের সাধারণ রেসকিউ টিউব এবং মাত্র একটি কাঠের বোট নিয়ে তারা এই বিশাল সাগরে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছেন।
লাইফগার্ড কর্মী মো. সেলিম এবং জয়নাল আবেদীন ভূট্টো জানান, প্রতিদিন সুগন্ধা সৈকতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ সাগরে নামেন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য মাত্র ৭ জনের একটি দল শিফট অনুযায়ী কাজ করে, যা সাগরে বিন্দুর মতো। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ জনকে ডুবন্ত অবস্থা থেকে টেনে তুলতে হয়, আর বর্ষার মরসুমে সাগরের রূপ যখন ভয়ংকর হয়, তখন দৈনিক ১০ থেকে ১৫টি উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়। অপ্রতুল জনবল আর মধ্যযুগীয় বা পুরনো সরঞ্জাম নিয়ে এই বিশাল মানবস্রোতের নিরাপত্তা দেওয়া তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।
কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতটি প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা বিশ্বের বুকেই এক অনন্য গৌরবময় স্থান। কিন্তু অত্যন্ত লজ্জাজনক ও আশঙ্কাজনক বাস্তব চিত্র হলো, এই বিশাল সৈকতের মধ্যে পর্যটকদের গোসলের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ রয়েছে মাত্র লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী—এই তিনটি পয়েন্টের মাত্র ৫০০ মিটার করে সর্বমোট দেড় কিলোমিটার সমুদ্র উপকূলে। এই দেড় কিলোমিটারের বাইরে বাকি পুরো সমুদ্রসৈকতই সম্পূর্ণ অরক্ষিত ও অভিভাবকহীন, যেখানে কোনো লাইফগার্ড বা উদ্ধারকর্মী নেই। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশাল সমুদ্রের জীবনরক্ষার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজটি কোনো সরকারি স্থায়ী বাহিনী করছে না, বরং এটি পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ একটি বেসরকারি সংস্থার সীমিত অর্থায়নে ও উদ্যোগে।
‘সি-সেইফ’ লাইফগার্ড সংস্থার সুপারভাইজার মো. সাইফুল্ল্যাহ সিফাত জানান, বর্তমানে তাদের পুরো টিমে মাত্র ২৭ জন লাইফগার্ড কর্মী আছেন, যার মধ্যে প্রতি শিফটে মাত্র ১৮ জন কর্মী দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কক্সবাজারের এই তিনটি প্রধান সৈকতকে নিরাপদ করতে হলে কমপক্ষে ১০০ জনের বেশি profesণাল বা পেশাদার লাইফগার্ড এবং আধুনিক জেট স্কি বা উন্নত লাইফবোটের প্রয়োজন, যার মাধ্যমে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব। বর্তমানে সাঁতার কেটে বা ম্যানুয়াল ইকুইপমেন্ট নিয়ে ঢেউয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে লাইফগার্ড কর্মীদের নিজেদের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।
কক্সবাজার শহরের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে পাঁচ শতাধিক বিলাসবহুল হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং গেস্ট হাউস। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এসব হোটেলে অবস্থান করলেও, হাতে গোনা কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ছাড়া কোনো আবাসিক প্রতিষ্ঠানেই সমুদ্রস্নান বা সাগরের ঝুঁকি সংক্রান্ত কোনো সতর্কবার্তা বা গাইডলাইন দৃশ্যমান নয়। পর্যটকেরা যখন হোটেল রুমে চেক-ইন করেন, তখন তাদের কোনো ধরনের সেইফটি ব্রিফিং দেওয়া হয় না।
হোটেল ‘প্রাসাদ প্যারাডাইস’-এর মহাব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী স্বীকার করেন যে, এই অকাল মৃত্যুর দায় শুধু সরকারের ওপর চাপালে চলবে না, এর বড় অংশ হোটেল মালিকদেরও নিতে হবে। তিনি প্রস্তাব করেন, সরকারিভাবে একটি সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা গাইডলাইন তৈরি করে প্রতিটি হোটেলের রুমে তা রাখা নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে সৈকত এলাকায় সার্বক্ষণিক ডিজিটাল মাইকিং, সিসিটিভি মনিটরিং এবং হোটেলগুলো এই নিয়ম মানছে কিনা তা তদারকির জন্য একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স বা মনিটরিং সেল গঠন করা অত্যন্ত জরুরি।
এই বহুমুখী সংকট ও পর্যটকদের অমূল্য জীবনের নিরাপত্তার বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে একটি আন্তর্জাতিক বা বিদেশি সংস্থার অর্থায়নে এই সীমিত লাইফগার্ড টিমটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। তবে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম এবং ক্রমবর্ধমান দুর্ঘটনার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার এখন লাইফগার্ডের জনবল বৃদ্ধি, তাদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং আধুনিক উদ্ধার সামগ্রী ও স্পিডবোট সরবরাহের জন্য একটি স্থায়ী মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সাথে এ বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং মন্ত্রণালয় থেকে খুব দ্রুত বাজেট ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের দীর্ঘতম এই সৈকতকে যদি দ্রুত সরকারি স্থায়ী লাইফগার্ড ও আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই পর্যটন কেন্দ্রটি সাধারণ মানুষের কাছে বিনোদনের স্থলের চেয়ে একটি ভয়ংকর মৃত্যু উপত্যকা হিসেবেই বেশি পরিচিতি পাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র: সময় নিউজ