পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে দেশজুড়ে দীর্ঘ ছুটি চলাকালীন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটের ওপর স্বাভাবিক থাকলেও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত মারামারি ও পারস্পরিক সংঘর্ষের ঘটনাগুলো। উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠার কথা থাকলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মারামারির অসংখ্য অভিযোগ পুলিশ প্রশাসনকে ভাবিয়ে তুলেছে। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ছুটির সাত দিনে আসা অভিযোগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই সময়ে সেবা প্রত্যাশীদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি কল এসেছে মারামারি ও সংঘাত সংক্রান্ত বিষয়ে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, একই সময়ে অন্যান্য গুরুতর অপরাধ যেমন চুরি, ছিনতাই এবং অন্যান্য অপরাধ তুলনামূলকভাবে অনেকটাই পুলিশের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ মে থেকে শুরু করে ৩১ মে পর্যন্ত টানা সাত দিনের এই ছুটির সময়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জরুরি সহায়তা চেয়ে মোট ১০ হাজার ৭৮টি কল গ্রহণ করা হয়। বিপুল সংখ্যক এই কলগুলোর ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর মধ্যে সর্বাধিক ১ হাজার ৯৭৪টি কলই ছিল বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত মারামারি ও পারস্পরিক সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে। মারামারির ঘটনার পরপরই জিম্মি করে রাখার ঘটনা প্রসঙ্গে কল এসেছে ৮৭১টি। উৎসবের এই সময়ে আকস্মিক অসুস্থ বা দুর্ঘটনার শিকার রোগীদের হাসপাতালে স্থানান্তরের জন্য অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে কল করেছেন ৮০২ জন। নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর অপরাধের ক্ষেত্রেও সহায়তা চেয়ে সর্বমোট ৬৬৩টি কল এসেছে। এছাড়া মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে অনাকাঙ্ক্ষিত সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে উদ্ধার সহায়তা চেয়ে কল এসেছে ৫৮৩টি।
পারিবারিক কলহ বা বিরোধের জেরে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে পুলিশের সাহায্য চেয়ে কল করা হয়েছে ৫৩০ বার। অন্যদিকে, বিভিন্ন স্থানে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের জরুরি সহায়তা চেয়ে ৯৯৯-এ কল এসেছে ৫১২টি। পাশাপাশি শব্দদূষণের মতো পরিবেশগত উপদ্রবের কারণে নাগরিকরা ৩৬৬ বার কল করে পুলিশের সহায়তা কামনা করেছেন। ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের কাছ থেকে বাসের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ পরিবহন খাতে বিভিন্ন অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কল এসেছে ৩০৫টি। কোরবানির পশুর হাটে চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক এক বাজারের গরু অন্য বাজারে নিয়ে যাওয়াসহ হাটের সার্বিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগে সহায়তা চাওয়া হয়েছে ৩০২ বার। এর বাইরেও অন্যান্য বিবিধ সামাজিক ও আইনি বিষয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আরও ৩ হাজার ১৭০টি কল এসেছে বলে জানিয়েছে জরুরি সেবা কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৯৯৯ নম্বরে আসা অভিযোগগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগকারীর নিকটবর্তী সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ সরাসরি থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করার ক্ষেত্রে অনেক সময় গড়িমসির শিকার হন বলে অভিযোগ থাকলেও, ৯৯৯-এর ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা দ্রুত সাড়া পেয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণী জানান, ঈদের পরদিন পারিবারিক বিরোধের জেরে তার ভাইয়ের ওপর অতর্কিত হামলা হলে তিনি ৯৯৯-এ কল করেন। তার কলের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে কিছু ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বারোঘরিয়া লক্ষীপুর খোনাপাড়ার বাসিন্দা শামীমা আক্তার জানান, গত ২৭ মে আসবাবপত্র ফেরত নেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশীদের অতর্কিত হামলার শিকার হয়ে তিনি ৯৯৯-এ কল করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও কাউকে আটক বা কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ফলে তারা চরম আতঙ্কের মধ্যে সময় পার করেছেন। এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার ওসি একরাম হুসাইন জানান, নির্দিষ্ট অভিযোগটি তার মনে নেই, তবে থানায় যোগাযোগ করলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
ঈদের ছুটিতে মারামারি বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রতি বছরই ঈদের সময় প্রচুর মারামারির অভিযোগ আসে, তবে এবার সংখ্যাটি তুলনামূলক বেশি ছিল। এর মূল কারণ জমিজমা সংক্রান্ত পুরনো বিরোধ, পারিবারিক অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কোন্দল। পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হলে চাপা পড়ে থাকা পুরোনো বিরোধগুলো নতুন করে সামনে চলে আসে। ৯৯৯-এর পরিদর্শক আনোয়ার সাত্তার জানিয়েছেন, ঈদের ছুটিতেও তাদের কর্মীরা ২৪ ঘণ্টা ভুক্তভোগীদের কল গ্রহণ করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করেছেন। সার্বিকভাবে ঈদ উপলক্ষ্যে ঢাকাসহ সারা দেশেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। ঢাকা মহানগর পুলিশ মেগা চেকপোস্ট স্থাপন ও টহল কার্যক্রম বৃদ্ধি করে। এর মাঝেও কিছু অপরাধের ঘটনা ঘটে। ২৯ মে পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়েতে পালানোর সময় একটি জিপ আটক করে জরিমানা করা হয়। ৩০ মে মহাখালীতে বাস-কাভার্ডভ্যান সংঘর্ষে আহতদের উদ্ধার করা হয়। ২৭ মে মৌচাকে মোবাইল ছিনতাইকারীকে ধরে পুলিশে দেয় জনতা এবং ছিনতাই হওয়া গরু-ছাগল বোঝাই পিকআপ উদ্ধার করে তিনজনকে আটক করা হয়। ২৬ মে তেজগাঁওয়ে ছাগল চুরির সময় এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়।
তথ্যসূত্র: বাংলানিউজ২৪