সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ১১:৪৯ অপরাহ্ন

বিনা মূল্যের বই ছাপানোয় এনসিটিবির ১৮৩ কোটির অনিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

২০১০ সাল থেকে বছরের প্রথম দিন উৎসবমুখর পরিবেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে বিনা মূল্যে নতুন পাঠ্যবই তুলে দিয়ে আসছে সরকার। কিন্তু এই মহৎ ও জনকল্যাণমুখী উদ্যোগের আড়ালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজিরবিহীন দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং আর্থিক হরিলুটের এক চাঞ্চল্যকর খতিয়ান উন্মোচিত হয়েছে। ২০২৪ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ তদারকি ও বিতরণের নামে সরকারের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) অধীন শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের সর্বশেষ বিশেষ নিরীক্ষায় (অডিট) এক বিরাট অনিয়ম ধরা পড়েছে।

অডিট অধিদপ্তরের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনসিটিবির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিধিবহির্ভূত অতিরিক্ত ভাতা গ্রহণ, নিয়মিত কাজের জন্য অন্যায্য সম্মানী পকেটস্থ করা, বড় অঙ্কের ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া এবং বোর্ডের উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দেওয়ার মাধ্যমে সরকারের মোট ১৮৩ কোটি ২০ লাখ ১৬ হাজার ৬২৩ টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতি ও রাজস্ব লোপাট হয়েছে। এই জঘন্য অনিয়মের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়ে সম্প্রতি শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর থেকে এনসিটিবির চেয়ারম্যানকে এক কড়া ‘আধা সরকারি পত্র’ (ডিও লেটার) পাঠিয়ে এর জরুরি জবাব তলব করা হয়েছে।

হরেক নামে ৩ কোটি টাকা লোপাট: ‘উদ্দীপনা’ ও ‘তদারকি’ ভাতার তেলেসমাতি

২০২৪ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের ২১ কোটি ৩৩ লাখ বই ছাপানোর জন্য বরাদ্দকৃত মোট ৮৬৩ কোটি ১১ লাখ টাকার খরচের ওপর এই বিশেষ অডিটটি পরিচালনা করা হয়। এনসিটিবির ভেতরের সূত্র এবং মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, বই ছাপানোকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা লুটের ঘটনা এখানে একটি ‘ওপেন সিক্রেট’ বা সবার জানা বিষয়। কিন্তু কখনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় এই দুর্নীতি এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্রেফ হরেক রকম ভুয়া ও অবাস্তব নাম দিয়ে সরকারের ৩ কোটি টাকারও বেশি অর্থ সম্মানী হিসেবে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন। এই অবৈধ অর্থ লোপাটের মূল খাতগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • ভুয়া উদ্দীপনা ভাতা (৯২ লাখ ৪৩ হাজার ২৩১ টাকা): সিভিল সার্ভিসের নিয়ম লঙ্ঘন করে কোনো ধরনের প্রাপ্যতা ছাড়াই এনসিটিবির ২১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সেসিপ (SESIP) প্রকল্পের কর্মকর্তারা ‘উদ্দীপনা ভাতা’ নামে এই বিপুল অর্থ লুটে নিয়েছেন। অডিটে বলা হয়েছে, বই উৎপাদন ও বিতরণের জন্য তারা এমনিতেই এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ হারে মোট ৪টি মূল সম্মানী পেয়ে থাকেন; ফলে এই অতিরিক্ত ভাতার কোনো আইনি ভিত্তি নেই এবং এই অর্থ অনতিবিলম্বে এনসিটিবি তহবিল থেকে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

  • ছাপাখানা তদারকি জালিয়াতি (৬৪ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকা): বইয়ের ছাপা ঠিক আছে কি না তা নিখুঁতভাবে তদারকি করার জন্য ‘ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডি’ নামের একটি স্বতন্ত্র ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানকে মোটা অঙ্কের বিল দিয়ে নিয়োগ করেছিল সরকার। কাজ শেষে সেই সংস্থাকে পূর্ণ বিলও পরিশোধ করা হয়। অথচ, একই কাজের নাম ভাঙিয়ে এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে আরও প্রায় সাড়ে ৬৪ লাখ টাকা ‘তদারকি ভাতা’ হিসেবে নিজেদের পকেটে পুরেছেন।

  • নিয়মিত কাজের অতিরিক্ত সম্মানী (৭৬ লাখ ২৯ হাজার ২০ টাকা): বোর্ডের বিধিমালা অনুযায়ী, নিয়মিত অফিশিয়াল কাজের জন্য কিংবা অতিরিক্ত সময় অফিসে অবস্থান করার অজুহাতে আলাদা কোনো সম্মানী নেওয়ার বিধান নেই। অথচ এনসিটিবির চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্রেফ দাপ্তরিক কাজের নাম দিয়ে এই বড় অঙ্কের টাকা ক্যাশ করেছেন।

  • প্রশিক্ষণ ও কমিটির নামে অতিরিক্ত লুট (১ কোটি ৯ লাখ ৭৪ হাজার ৫০০ টাকা): বোর্ডের বিভিন্ন সেমিনার ও কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক, সঞ্চালক ও গবেষকদের জন্য সরকার নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট ফির হার (১ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা) তোয়াক্কা না করে, অনেককে বেআইনিভাবে ২ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত সম্মানী দেওয়া হয়েছে, যাতে সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৭৮ লাখ টাকা। এছাড়া বই ছাপানোসংক্রান্ত বিভিন্ন উপ-কমিটির সদস্যরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে অতিরিক্ত হারে আরও ৩১ লাখ ৭৮ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

১৬৭ কোটি টাকার কোষাগার ফাঁকি ও ১২ কোটির ভ্যাট-ট্যাক্স চুরি

এনসিটিবির এই অনিয়ম কেবল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেট ভরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং রাষ্ট্রের মূল রাজকোষকে বড় ধরনের লোকসানের মুখে ফেলেছে প্রতিষ্ঠানটি। আর্থিক আইন অনুযায়ী, প্রতি অর্থবছর শেষে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট অংশ বোর্ড তহবিলে বা জরুরি রিজার্ভে রেখে, বাকি সমস্ত উদ্বৃত্ত অতিরিক্ত অর্থ সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ আইন অমান্য করে সরকারের প্রাপ্য ১৬৭ কোটি ৫৫ লাখ ৮৫ হাজার ২৭৬ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজেদের তহবিলে আটকে রেখেছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির নিয়মে এক বড় আর্থিক অপরাধ।

এর পাশাপাশি, অডিট প্রতিবেদন ও এনসিটিবির হিসাবসংক্রান্ত গোপন নথির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বই ছাপানোর বিশাল কর্মযজ্ঞে সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে ১২ কোটি টাকারও বেশি ভ্যাট (মূসক) ও আয়কর (ট্যাক্স) সরাসরি চুরি করা হয়েছে। এর খতিয়ান নিম্নরূপ:

১. মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্ভিস চার্জের বিল থেকে নির্ধারিত হারে ভ্যাট আদায় না করায় সরকারের নিট রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ৬ কোটি ৬৫ লাখ ৫০ হাজার ২৩৪ টাকা।

২. সার্ভিস চার্জের বিল থেকে উৎসে আয়কর বা অগ্রিম ট্যাক্স না কাটায় রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে ৫ কোটি ৩২ লাখ ৪০ হাজার ১৮৭ টাকা।

৩. কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে যে কোটি কোটি টাকার সম্মানী বিল বিতরণ করা হয়েছে, সেই বিল থেকেও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আয়কর বা ট্যাক্স কর্তন করা হয়নি, যার ফলে রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে আরও ২৩ লাখ ৪২ হাজার ১০৫ টাকা।

ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ ও টিআইবির কঠোর হুঁশিয়ারি

শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের এই বিস্ফোরক প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর এনসিটিবির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছে। এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এনসিটিবির নবনিযুক্ত সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু দায়সারা গোছের মন্তব্য করে বলেন, “আমি মাত্র কিছুদিন আগে এই পদে যোগদান করেছি। বিষয়টি এখনো আমার পুরোপুরি নখদর্পণে নেই, তবে দ্রুতই এর ফাইলপত্র দেখে খোঁজ নেওয়া হবে ও ব্যবস্থা হবে।” তবে এই মারাত্মক জালিয়াতির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের জন্য বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দেশের এই স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমন নজিরবিহীন দুর্নীতির বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন:

“বিনা মূল্যে দেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে পাঠ্যবই বিতরণ করা সরকারের অন্যতম সফল, গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল একটি কাজ, যা সরাসরি প্রান্তিক জনপদের শিক্ষার হার ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সাথে জড়িত। সেই পবিত্র কর্মযজ্ঞের ভেতরে ঢুকে এনসিটিবির কর্মকর্তাদের এমন পদ্ধতিগত দুর্নীতি ও শত কোটি টাকার অনিয়ম অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও উদ্বেগজনক। কেবল অডিট আপত্তি দিয়েই এই অপরাধের দায় শেষ হতে পারে না। সরকারের উচিত একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে এই লুণ্ঠনের সাথে জড়িত প্রতিটি কর্মকর্তাকে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের মুখোমুখি করা। একই সাথে, এই অনিয়মের গভীরে গিয়ে ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি ও অর্থ আত্মসাতের আসল অপরাধীদের চিহ্নিত করতে সরকারের অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) পূর্ণ স্বাধীনতায় কাজে লাগানো উচিত।”

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


এ জাতীয় আরো খবর...