দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ায় উন্নত জীবনের আশায় গিয়ে ভয়াবহ আধুনিক দাসত্বের শিকার হচ্ছেন শত শত বাংলাদেশি তরুণ। সেখানে একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে তারা বাধ্য হচ্ছেন বিভিন্ন অনলাইন জালিয়াতি বা সাইবার স্ক্যামের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে। অপরাধ জগতে “অপু” নামে পরিচিত আবদুল্লাহ আল মামুন নামের এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিক এই আন্তঃদেশীয় মানব পাচার নেটওয়ার্কের মূল হোতা হিসেবে কাজ করছেন। তিনি একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন যা মূলত ভুয়ো প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভাগ্য অন্বেষণকারী অসহায় বাংলাদেশিদের প্রলুব্ধ করে, পরবর্তীতে তাদের অনলাইন জালিয়াতির ফাঁদে বন্দি করে এবং পদ্ধতিগত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে।
মূলত ময়মনসিংহের বাসিন্দা এই অপু ২০১৫ সালের দিকে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান। এরপর তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ ঘুরে অবশেষে কম্বোডিয়ার রাজধানী পনম পেনে স্থায়ীভাবে আস্তানা গাড়েন। সেখানে তিনি জালিয়াতির মাধ্যমে একটি কম্বোডিয়ান পাসপোর্টও সংগ্রহ করেন। আইনি জটিলতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তিনি নিজেকে কম্বোডিয়া শাখা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিতেন। তবে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পরবর্তীতে নিশ্চিত করেছে যে, কম্বোডিয়ায় এই ধরনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কমিটির অস্তিত্বই নেই। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট বাংলাদেশে সংঘটিত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সরকারের পতনের ঘটনাটি অপুর জন্য এক বিরাট আর্থিক সুযোগ এনে দেয়। দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া অনেক রাজনীতিবিদ ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা নিজেদের সুরক্ষা ও অবৈধ সম্পদ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য এইfixer বা দালালের শরণাপন্ন হন। কিন্তু অপু তাদের সেই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে নিজের শিকার বানাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার প্রবণতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিএমইটি) এর সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যেই ২,৪০৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক কম্বোডিয়ায় ভ্রমণ করেছেন। এই বিশাল সংখ্যার আড়ালে যে মানব পাচারের এক বিশাল নেটওয়ার্ক কাজ করছে, তা বুঝতে পেরে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) হিউম্যান ট্রাফিকিং ইউনিট এই সিন্ডিকেটের দেশীয় এজেন্টদের ধরতে সক্রিয় অনুসন্ধান শুরু করেছে। এই আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের হাত থেকে কোনোমতে বেঁচে ফেরা ১৫ জন ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হলে তারা জানান, কম্বোডিয়ায় পা রাখার পর তারা নিজেদের জীবনের সমস্ত সঞ্চয় হারিয়ে এখন সম্পূর্ণ নিঃস্ব।
ভুক্তভোগীদের বিবরণ অনুযায়ী, এই প্রতারণার জালটি মূলত বোনা হয় রাজধানী ঢাকায় বসে। অপুর স্থানীয় রিক্রুটার বা দালালরা উচ্চ বেতনের কর্পোরেট চাকরি, দ্রুত ভিসা প্রসেসিং এবং নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থার লোভ দেখিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করে। এই কাজের জন্য তারা জনপ্রতি ৪,৪০০ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার থেকে ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করে। টাকা হাতে পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় মূল চক্রান্ত। কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগীরা যাতে কোনো ধরনের আইনি বা কর্মসংস্থান সংক্রান্ত অধিকার দাবি করতে না পারেন, সেজন্য সিন্ডিকেটটি ওয়ার্ক ভিসার পরিবর্তে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ট্যুরিস্ট বা পর্যটন ভিসা প্রদান করে।
ফ্লাইট থেকে পনম পেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় আসল নরকযন্ত্রণা। সেখানে পৌঁছানো মাত্রই ভিসা নবায়ন বা অন্য কোনো দাপ্তরিক অজুহাতে তাদের পাসপোর্টগুলো জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর তাদের কোনো অফিস বা নির্মাণাধীন সাইটে নেওয়ার বদলে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হয় পনম পেনের এরিয়া ২৩১-এ অবস্থিত অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং দুর্গসম ‘মেকং রিভার’ ভবনে। সেখানে পর্যটন ভিসার মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের একপ্রকার বন্দি করে রাখা হয়। যখনই ভিসার আইনি মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তখনই ওই তরুণেরা কম্বোডিয়ার আইনে অবৈধ ও পলাতক আসামিতে পরিণত হন এবং বেঁচে থাকার জন্য সম্পূর্ণরূপে অপুর সিন্ডিকেটের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হন।
সেখান থেকে ভুক্তভোগীদের পনম পেনের ‘স্ট্রিট ৬৮’ এলাকায় অবস্থিত বিভিন্ন সুরক্ষিত আধুনিক দাসখানায় বা ডিজিটাল স্লেভ পেনে বন্টন করে দেওয়া হয়, যা বাইরে থেকে দেখতে কোনো আধুনিক টেকনোলজি পার্কের মতো মনে হয়। এই কেন্দ্রগুলোর ভেতরে প্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ বন্দিদের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বা অস্ত্রের মুখে ‘ব্ল্যাক ওয়েবসাইট’ পরিচালনা করতে বাধ্য করা হয়। তারা মূলত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফিশিং ক্যাম্পেইন, পরিচয় চুরি, ই-কমার্স জালিয়াতি, ভুয়া স্পোর্টস বেটিং এবং ডেটিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উন্নত দেশের নাগরিকদের ফাঁদে ফেলার কাজ করে। যারা এই সাইবার স্ক্যামের কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায় কিংবা দৈনিক বা সাপ্তাহিক চুরির কোটা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় সিহানুকভিলের কুখ্যাত বন্দিশালাগুলোতে। সেখানে তাদের অন্ধকার ঘরে আটকে রেখে লোহার রড দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হয় এবং ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়। সিন্ডিকেটের সদস্যরা এই নির্যাতনের দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করে দেশে থাকা তাদের আতঙ্কিত পরিবারের কাছে পাঠায় এবং বিপুল পরিমাণ মুক্তিপণ দাবি করে।
ভিসার মেয়াদ না থাকা এবং স্থানীয় কম্বোডিয়ান পুলিশ এই চক্রের সাথে জড়িত থাকার আশঙ্কায় ভুক্তভোগীরা মুখ বুজে এই চরম নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য হন। অনেক সময় আইনি জটিলতা আরও বাড়াতে তাদের থাইল্যান্ড সীমান্তে বিপজ্জনক ‘ভিসা রান’ বা সীমান্ত পারাপারের ফাঁদে ফেলা হয়। কম্বোডিয়ায় আত্মগোপনে থাকা তারিকুল ইসলাম নামের এক ভুক্তভোগী জানান, তিনি সাইবার জালিয়াতির কাজ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছিল। কোনোমতে পালিয়ে এখন তিনি দেশে ফেরার আকুতি জানাচ্ছেন। একইভাবে রাজশাহীর বাসিন্দা আসাদ জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাকে মাসে ৬০০ ডলার বেতনের লোভ দেখিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তিনি ঢাকা বিমানবন্দর পার হওয়ার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে বলেন, বিমানবন্দরের পার্কিং এলাকায় দালালেরা তার কাছ থেকে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা নেয় এবং সোনালী ব্যাংকের সামনে দাঁড়াতে বলে। এরপর ৯ নম্বর কাউন্টারে গিয়ে ‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘বরিশাল’, ‘রাজশাহী’ কিংবা ‘আইপাখি’ এর মতো নির্দিষ্ট কোড নাম বলতে বলা হয়। এই কোড শোনার পর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাদের ট্যুরিস্ট ভিসায় অনায়াসে ক্লিয়ারেন্স দিয়ে দেন।
আরেকজন ভুক্তভোগী জামাল হোসেন জানান, তাকে কম্বোডিয়ায় নিয়ে ‘ড্রাগন টেক’ নামক এক চীনা নাগরিকের অবৈধ সংস্থায় কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল, যার কোনো আইনি অস্তিত্ব নেই। তারা মূলত ফেসবুক গ্রুপ ব্যবহার করে ভুয়া ডেটিং ও জুয়ার সাইট চালাত। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার কর্মীদের টার্গেট করে অন্তত ১০টি সচল ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ এই ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। পাকিস্তানের নাগরিক সাজিদ হোসেন সুমরো জানান, এই চক্রটি বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্য কম্বোডিয়া সরকারের ভুয়া সিলমোহর ব্যবহার করে চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেয়। কেউ এতে সাড়া দিলে হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামের মাধ্যমে যোগাযোগ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দালালদের দিয়ে পাসপোর্ট বানিয়ে পাচার করা হয়।
বাংলাদেশে এই অপুর সিন্ডিকেটের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে কাজ করছে উত্তরার ‘স্টার উইংস’ নামের একটি ট্রাভেল এজেন্সি। বাইরে টিকিট বিক্রির অফিস হলেও ভেতরে তারা মূলত কম্বোডিয়ার ভুয়া ভিসা প্রসেস করে। বিমানবন্দর কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ থাকায় যাত্রীরা ইমিগ্রেশনের নিয়ম এড়াতে পারেন। এই সিন্ডিকেটটি একটি কর্পোরেট কাঠামোর মতো কাজ করে, যেখানে আলম ও সৈকত কর্মী সংগ্রহ করে, আরশাদ ও রাইহান পাসপোর্ট কেড়ে নেয় এবং নাঈম ও আপেল মাঠপর্যায়ের অপারেশন চালায়। এছাড়া ফাতুক ও মুকুল নামের দুই আর্থিক হোতা হুন্ডির মাধ্যমে কম্বোডিয়ান নাগরিক ইম সোখিমের সহায়তায় কোটি কোটি টাকা পাচার করছে। সিআইডি ২০২৩ সাল থেকে কম্বোডিয়ায় মানব পাচারের সাথে জড়িত ৬টি এজেন্সির বিরুদ্ধে তদন্ত করছে এবং অপুর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। সিআইডির মানব পাচার দমন বিভাগের কর্মকর্তা বদরুল আলম মোল্লা বলেন, অপুর দেশীয় সহযোগীদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং দ্রুতই তাদের গ্রেফতার অভিযান শুরু হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএমইটি কোনো প্রকার মাঠপর্যায়ের সত্যতা যাচাই ছাড়াই কম্বোডিয়ার একাধিক ভুয়া কোম্পানির নামে এই মানব রপ্তানির ছাড়পত্র বা ক্লিয়ারেন্স ইস্যু করেছে। পাচারকারীরা ম্যাক্স মার্চেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, চিপ হং ইনকর্পোরেট লিমিটেড, এইচএলএইচ এগ্রিকালচার কোম্পানি লিমিটেড এবং সোক হাং গ্রুপের মতো বেশ কিছু ভুয়া ফ্রন্ট কোম্পানি তৈরি করে এই আধুনিক দাসত্বের লাইসেন্স হাসিল করেছে। এমনকি ব্যাংককে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর মোঃ ফাহাদ পারভেজ বাসুনিয়ার আসল সিলমোহর ও স্বাক্ষর সংবলিত নথিপত্র ব্যবহার করে এই পাচার সম্পন্ন করা হয়েছে, যা সরকারি নজরদারির এক চরম ব্যর্থতা ও দুর্নীতির চিত্রকে স্পষ্ট করে তোলে।
তথ্যসূত্র: টাইমস অফ বাংলাদেশ