বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ১২:১১ পূর্বাহ্ন

মাদ্রাসা শিক্ষা প্রকল্পে ২ বছরের কাজ ৯ বছরেও অধরা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অহেতুক কালক্ষেপণ ও আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে সম্প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিলম্বিত সরকারি প্রকল্পগুলোর গতি বাড়াতে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি স্পষ্ট নির্দেশনা দিলেও প্রশাসনের একটি বড় অংশে তার তেমন কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি আইটি বা প্রযুক্তিভিত্তিক প্রকল্প। মাত্র দুই বছরের মূল সময়সীমা নিয়ে শুরু হওয়া একটি প্রকল্প গত ৯ বছর ধরে ঝুলে থাকার পর, এখন সেটির মেয়াদ ও বাজেট আরও এক দফা বাড়ানোর অদ্ভূত আবেদন করা হয়েছে। প্রকল্পটির সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য বর্তমান প্রস্তাবটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) টেবিলে উঠেছে।

মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর পরিচালিত এই বিশেষ উদ্যোগটির নাম ‘মাদ্রাসা এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (মেমিস) সাপোর্ট’। দেশের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও ডিজিটাল করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তৎকালীন পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাত্র দুই বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে সম্পূর্ণ কাজটি শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। গত ৯ বছরে এই প্রকল্পটিতে দুই দুইবার বড় ধরণের সংশোধন আনা হয়েছে এবং তিনবার এর সময়সীমা পিছিয়েছে। বর্তমানে একনেক সভায় এই প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে খোদ পরিকল্পনা কমিশনের ভেতরেই নানা প্রশ্ন উঠছে।

বাজেট বাড়ছে তিন গুণ, লক্ষ্য ডিজিটাল ডেটাবেজ

নতুন এই সংশোধনী প্রস্তাবের সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো এর লাগামহীন ব্যয় বৃদ্ধি। শুরুতে যখন প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়, তখন এর প্রাক্কলিত বাজেট ছিল মাত্র ১০ কোটি ১২ লাখ টাকা। কিন্তু ৯ বছরের দীর্ঘ সুত্রতার পর এখন সেই বাজেট তিন গুণেরও বেশি বাড়িয়ে ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা করার আবদার করা হয়েছে। একই সাথে প্রকল্পের সময়সীমা আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ দুই বছরের একটি সাধারণ তথ্যপ্রযুক্তি প্রজেক্ট শেষ হতে এখন সময় লাগছে প্রায় এক দশক।

অথচ এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যটি ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী ও জনকল্যাণমুখী। এর অধীনে দেশের প্রায় ১৫ হাজার মাদ্রাসার ৩৮ লাখ শিক্ষার্থী এবং প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর বিস্তারিত জীবনবৃত্তান্ত ও তথ্য নিয়ে একটি সেন্ট্রাল বা পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ডেটাবেজ গড়ে তোলার কথা। এর পাশাপাশি শিক্ষকদের মান্থলি পে অর্ডার (এমপিও) কার্যক্রম সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা এবং ‘গভর্নমেন্ট-টু-পার্সন’ (জিটুপি) বা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরকারি বেতনের টাকা পৌঁছে দেওয়া এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনের জন্য বর্তমানে ১৬টি ক্লাউড-ভিত্তিক আধুনিক সফটওয়্যার মডিউল তৈরির কাজ চলছে। কিন্তু ধীরগতির কারণে এই বিশাল জনগোষ্ঠী এখনও ডিজিটাল সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে।

অজুহাতের পাহাড় ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের জটিলতা

প্রকল্পের এই অন্তহীন বিলম্বের পেছনে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর বরাবরের মতোই একঝাঁক চেনা অজুহাত খাড়া করেছে। তাদের দাবি—করোনা মহামারির ধাক্কা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) সমন্বয়ের জটিলতা, নতুন পেমেন্ট গেটওয়ে ও পে-বিল মডিউল তৈরি, একটি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মডিউল চালুর সিদ্ধান্ত এবং সামগ্রিক মাঠপর্যায়ের প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণেই নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পও বর্তমানে একনেকের পর্যালোচনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। এই উদ্যোগটির উদ্দেশ্য ছিল দেশের ৬৫৩টি মাদ্রাসায় আধুনিক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ৩০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বাজেটে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি মূলত ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এটিও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে এ পর্যন্ত তিনবার সংশোধিত হয়েছে এবং চারবার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনের মধ্যেই এই প্রকল্পের বাস্তব বা ভৌত অগ্রগতি শতভাগ বা ১০০% সম্পন্ন হয়েছে। সরঞ্জাম দিয়ে ডিজিটাল পাঠদানও শুরু হয়েছে। তা সত্ত্বেও প্রকল্পটির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করার অদ্ভুত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর জানিয়েছে, ৬৫৩টি মাদ্রাসার মধ্যে ৫৪১টিতে ইতিমধ্যে মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম সফলভাবে সরবরাহ করা হয়েছে। তবে কাস্টমস ও রাজস্ব কর্মীদের আকস্মিক ধর্মঘটের কারণে বাকি ১১২টি প্রতিষ্ঠানের জন্য আমদানিকৃত স্মার্ট টিভি প্যানেল দীর্ঘ সময় ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে ছিল।

সবচেয়ে বড় বিপত্তি ঘটেছে অন্য জায়গায়। সরঞ্জাম সরবরাহ শেষ হলেও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো তাদের পাওনা বকেয়া টাকা বুঝে পায়নি। কারণ ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এই রানিং প্রজেক্টটিকে ভুলবশত বা অসচেতনতাবশত অন্তর্ভুক্তই করা হয়নি, অথচ এই অর্থ বছরেই এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (উন্নয়ন) মো. জহুরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, প্রকল্পটির কোনো কাজ বাকি নেই; কেবল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে ঠিকাদারদের বকেয়া বিল পরিশোধের প্রক্রিয়াটি সহজ করার জন্যই এই মেয়াদের নতুন এক্সটেনশন চাওয়া হয়েছে। তবে দুই বছরের ছোট প্রযুক্তি প্রকল্পগুলো যেভাবে বছরের পর বছর টেনে বড় করা হচ্ছে, তা দেশের সুশাসন ও আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য এক বড় অশনিসংকেত।

তথ্যসূত্র: টাইমস অফ বাংলাদেশ


এ জাতীয় আরো খবর...