বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ০১:৫২ অপরাহ্ন

আজ মাঠে গড়াচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ থেকে উত্তর আমেরিকার মাটিতে শুরু হচ্ছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় মহোৎসব—ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ এখন মেক্সিকো, কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক মেক্সিকো এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার উদ্বোধনী ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠছে এই ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এর। ম্যাচটি বাংলাদেশ সময় রাত ঠিক ১টায় মাঠে গড়াবে। ফুটবল যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে আজতেকা স্টেডিয়ামের গ্যালারি ও টিভি পর্দার সামনে থাকা বিশ্ববাসীকে উন্মাদনায় ভাসাতে প্রস্তুত করা হয়েছে এক বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। যেখানে এবারের আসরের অফিশিয়াল থিম সং ‘দাই দাই’ বা ‘চলো এগিয়ে’-এর সুরে মেতে উঠবে গোটা বিশ্ব।

মেক্সিকো সিটির এই ঐতিহাসিক মাঠে পারফর্ম করবেন বিশ্বখ্যাত পপ তারকা শակիরা। তাঁর সঙ্গে মঞ্চ মাতাবেন এই থিম সংয়ের সহশিল্পী নাইজেরিয়ান তারকা বার্না বয়। উদ্বোধনী মঞ্চে মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতি, আধুনিক লোকশিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী ‘পাপেল পিকাডো’ শিল্পের এক অপূর্ব প্রদর্শনী দেখা যাবে। এছাড়াও এই জমকালো আয়োজনে সুরের জাদু ছড়াবেন জে বালভিন, মানা এবং লিলা ডাউনসের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংগীতশিল্পীরা।

তিন দেশে ভিন্ন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও প্রথম সপ্তাহের সূচি

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ মিলে যৌথভাবে এই বিশ্বকাপ আয়োজন করায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও হবে তিনটি ভিন্ন ভেন্যুতে পৃথকভাবে। মেক্সিকোর উদ্বোধনী পর্বের পাশাপাশি কানাডার টরন্টো স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মঞ্চ কাঁপাবেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী নোরা ফাতেহি। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী আসর বসবে লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে, যেখানে দর্শকদের জন্য থাকবে চোখধাঁধানো এক বিশাল ভিজ্যুয়াল শো। এই মার্কিন মঞ্চে পারফর্ম করবেন কেটি পেরি, ফিউচার, আনিতা, এলএলএ এবং রেমার মতো বিশ্বখ্যাত সব পপ ও হিপহপ তারকারা।

উদ্বোধনী দিনের ফুটবল সূচিতে আরও একটি ম্যাচ রয়েছে, যেখানে আগামীকাল সকাল ৮টায় মুখোমুখি হবে দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র। সহ-স্বাগতিক দেশ কানাডা তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে আগামী শুক্রবার টরন্টোর মাঠে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিরুদ্ধে। আর প্রধান আয়োজক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগামী পরদিন সকাল ৭টায় লস অ্যাঞ্জেলেসের মাঠে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তাদের যাত্রা শুরু করবে। এরপর আগামী দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ৩টি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৬টি পর্যন্ত ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতে দেখা যাবে।

মহাদেশীয় পরিধি ও নতুন ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

সর্বশেষ কাতার বিশ্বকাপটি হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট একটি ভৌগোলিক বলয়ের মধ্যে। কিন্তু ঠিক তার পরের সংস্করণটিই আয়োজন করা হচ্ছে গোটা একটি মহাদেশ জুড়ে। আর এই বিশালত্বই নিয়ে এসেছে এক নতুন চ্যালেঞ্জ। এবারের বিশ্বকাপের একটি ভেন্যু কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়াম থেকে মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামের দূরত্ব প্রায় ৪৪০ কিলোমিটার। এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দলগুলোর নিয়মিত ভ্রমণ এবং উত্তর আমেরিকার প্রচণ্ড গরম আবহাওয়া খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতার জন্য বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি মাঠ ও মাঠের বাইরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বিদ্যমান যুদ্ধাবস্থার প্রভাব নিয়েও ফুটবল মহলে নানামুখী প্রশ্ন ও গভীর আলোচনা তৈরি হয়েছে।

৪৮ দলের নতুন ফরম্যাট ও নকআউটের সমীকরণ

১৯৩০ সালে মাত্র ১৩টি দল নিয়ে যাত্রা শুরু করা ফুটবল টুর্নামেন্টটি এবারই প্রথম সম্পূর্ণ নতুন এক ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় এবার দলের সংখ্যা এক লাফে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮টিতে। এই বিশাল সংখ্যক দলকে মোট ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে, যেখানে প্রতি গ্রুপে থাকবে ৪টি করে দল। ঐতিহ্যগতভাবে প্রতি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দল সরাসরি নকআউট পর্বে জায়গা করে নেবে। তবে এবার ৪৮ দলের ফরম্যাটকে আরও রোমাঞ্চকর করতে নতুন নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে। ১২টি গ্রুপের মধ্যে যে ৮টি দল সেরা তৃতীয় স্থান অধিকারী হবে, তারাও নকআউটের টিকিট পাবে। এর ফলে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় পর্ব বা নকআউট রাউন্ডের আকার ১৬ দল থেকে দ্বিগুণ হয়ে ৩২ দলের একটি বিশাল মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।

টুর্নামেন্টের মোট ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে সিংহভাগ অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ ম্যাচ একাই আয়োজন করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যার সংখ্যা ৭৮টি। বাকি ২৬টি ম্যাচের মধ্যে কানাডা এবং মেক্সিকো ১৩টি করে ম্যাচ আয়োজন করবে। টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে শুরু করে সেমিফাইনাল ও ফাইনালসহ সবকটি হাইভোল্টেজ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। আগামী ১৯শে জুলাই নিউইয়র্কের বিখ্যাত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণী ফাইনাল ম্যাচের মধ্য দিয়ে এই মহাযজ্ঞের সমাপ্তি ঘটবে।

ঠাসা সূচি, টাইব্রেকার ও হাইড্রেশন ব্রেকের নতুন নিয়ম

গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই সপ্তাহজুড়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে চলবে ফুটবলের নন-স্টপ উন্মাদনা। প্রথম দুই দিনে দুটি করে ম্যাচ থাকলেও ১৩ই জুন থেকে ২৭শে জুন পর্যন্ত প্রতিদিন অন্তত চারটি করে ম্যাচ মাঠে গড়াবে, যা স্থানীয় সময় দুপুর থেকে শুরু হয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত দর্শকদের বুঁদ করে রাখবে। এর মধ্যে বড় চমক হিসেবে থাকছে ২৪শে জুন বুধবার থেকে ২৭শে জুন সাধারণ শনিবারে প্রতিদিন রেকর্ডসংখ্যক ৬টি করে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো একই সময়ে আয়োজন করার বাধ্যবাধকতার কারণে প্রতি সময়স্লটে দুটি করে ম্যাচ একসঙ্গে শুরু হবে। জুন মাসজুড়ে এই ৭২টি ম্যাচের বিশাল সূচি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে আসছে।

টাইব্রেকারের নিয়মেও এবার বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে গ্রুপ পর্বে পয়েন্ট সমান হলে গোল ব্যবধানকে প্রথম সূচক ধরা হতো। কিন্তু এবার প্রথম টাইব্রেকার হবে হেড-টু-হেড বা মুখোমুখি ম্যাচের ফলাফল। এরপর ক্রমান্বয়ে দেখা হবে মুখোমুখি ম্যাচের গোল ব্যবধান ও গোল সংখ্যা। যদি তাতেও মীমাংসা না হয়, তবেই কেবল সামগ্রিক গোল ব্যবধান এবং ফেয়ার প্লে পয়েন্ট বা কার্ডের সংখ্যা হিসাব করা হবে। এছাড়া উত্তর আমেরিকার কড়া গরমের কথা মাথায় রেখে এবার যুক্ত করা হয়েছে বিশেষ ‘হাইড্রেশন ব্রেক’। ম্যাচের আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন, খেলোয়াড়দের শারীরিক সুস্থতা ধরে রাখতে এবং একই সঙ্গে বিজ্ঞাপনদাতাদের বাণিজ্যিক সুযোগ বাড়াতে প্রতি অর্ধেকের মাঝামাঝি সময়ে ৩ মিনিটের একটি করে বাধ্যতামূলক বিরতি দেওয়া হবে।

শিরোপার লড়াইয়ে ফেভারিট ও পরাশক্তিদের শক্তি পরীক্ষা

এবারের আসরে বেটিং বাজারের দর অনুযায়ী কোনো একক ফেভারিট দল বেছে নেওয়া কঠিন হলেও শিরোপার দৌড়ে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী দল এগিয়ে রয়েছে:

  • স্পেন ও ফ্রান্স (১৭% শিরোপার সম্ভাবনা): যৌথভাবে ফেভারিটের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এই দুই ইউরোপীয় পরাশক্তি। বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনের মূল ভরসা আক্রমণভাগের ১৮ বছর বয়সী বার্সেলোনা বিস্ময় লামিন ইয়ামাল, যিনি সম্প্রতি ইনজুরি কাটিয়ে দলে ফিরেছেন। অন্যদিকে ফরাসিদের আক্রমণের নেতৃত্বে থাকছেন রিয়াল মাদ্রিদের বিশ্বসেরা ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে, যার ঝুলিতে গত দুই বিশ্বকাপে ১২টি গোল করার দুর্দান্ত রেকর্ড রয়েছে।

  • ইংল্যান্ড (১২% শিরোপার সম্ভাবনা): বায়ার্ন মিউনিখের গোলমেশিন হিসেবে খ্যাত হ্যারি কেইনের অনন্য ফর্মের ওপর ভর করে ১৯৬৬ সালের পর নিজেদের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি জয়ের মিশন নিয়ে মাঠে নামবে ইংলিশরা।

  • আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও পর্তুগাল (১০% শিরোপার সম্ভাবনা): বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা তাদের ২০২২ সালের বিজয়ী স্কোয়াডকে প্রায় অক্ষুণ্ন রাখলেও ৩৮ বছর বয়সী কিংবদন্তি লিওনেল মেসি হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে ভুগছেন, যা আলবিসেলেস্তেদের জন্য চিন্তার কারণ। অন্যদিকে ব্রাজিলের নেইমার এবং ৪১ বছর বয়সী পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নিজেদের চোট ও ফর্মের ঘাটতি কাটিয়ে ক্যারিয়ারের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপটিকে স্মরণীয় করে রাখার লড়াইয়ে নামবেন।

  • জার্মানি: চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে কোনোভাবেই শিরোপার লড়াইয়ের বাইরে রাখা যাবে না। ফ্লোরিয়ান ভির্টজ, জামাল মুসিয়ালা, জশুয়া কিমিক, কাই হাভার্টজ এবং অ্যান্টোনিও রুডিগারের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া জার্মান মেশিন যেকোনো মুহূর্তে তাদের চিরচেনা ক্যারিশমা দেখাতে প্রস্তুত।

ইতালির অনুপস্থিতি ও ডার্কহর্সদের রূপকথার আভাস

এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিষাদময় ঘটনা হলো চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালির অনুপস্থিতি। প্লে-অফ ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে হেরে আজ্জুরিরা টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে পরাশক্তিদের পাশাপাশি বেশ কিছু ‘ডার্কহর্স’ বা আন্ডারডগ দল এবার বড় দলগুলোর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। স্কটল্যান্ড তাদের প্রস্তুতি ম্যাচে কুরাসাও এবং বলিভিয়ার জালে ৮ গোল দিয়ে দারুণ ছন্দে রয়েছে। নরওয়েও পিছিয়ে নেই; তারা সুইডেনকে অনায়াসে হারিয়েছে এবং শক্তিশালী মরক্কোর সঙ্গে ড্র করেছে। মার্টিন ওডেগার্ড এবং গোলমেশিন আর্লিং হালান্দের মতো বিশ্বমানের তারকাদের নিয়ে নরওয়ে দলটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ।

আইভরি কোস্ট গত সপ্তাহে শক্তিশালী ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে, তাদের আক্রমণভাগ যেকোনো রক্ষণভাগ গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম। ইকুয়েডর ও সেনেগালের মতো আফ্রিকান ও লাতিন দলগুলোও বড় শক্তির রথ থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এছাড়া পর্তুগাল ও বেলজিয়াম প্রথাগত আন্ডারডগের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে একঝাঁক নতুন প্রতিভাবান খেলোয়াড় নিয়ে শিরোপার দাবিদার। নেদারল্যান্ডস দলটিতেও রয়েছে অভিজ্ঞ ও তরুণদের এক চমৎকার কম্বিনেশন, যার কারণে ডাচদেরও হিসাবের বাইরে রাখা যাবে না। অতীতে ১৯৯৪ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে যেভাবে সুইডেন ও булগেরিয়া সেমিফাইনালে উঠে সবাইকে স্তব্ধ করেছিল এবং রোমানিয়া ও নাইজেরিয়া রূপকথার জন্ম দিয়েছিল, এবারও উত্তর আমেরিকার এই গ্রীষ্মে তেমন নতুন কোনো রূপকথার গল্প দেখার অপেক্ষায় রয়েছে ফুটবল বিশ্ব।


এ জাতীয় আরো খবর...