বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ০৩:০৮ অপরাহ্ন

কোটি ইঁদুরের রাজত্বে ঢাকা মেগাসিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১১ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

ঢাকা দুই কোটিরও বেশি মানুষের এক ব্যস্ত মেগাসিটি। এ শহরে টিকে থাকতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করে। কিন্তু এই শহরের মাটির নিচে, ড্রেনের অন্ধকারে আর অভিজাত বহুতল ভবনের দেয়ালে নিঃশব্দে রাজত্ব করছে অন্য এক গোপন শাসকদল—যাদের জনসংখ্যা এই দুই কোটি মানুষকেও অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল কিংবা শ্যামবাজারের মতো যেকোনো কাঁচাবাজারে দিনে-দুপুরে হাঁটলে মানুষের চেয়ে বড় সাইজের ইঁদুরই বেশি চোখে পড়ে। কোনো ভয়হীনভাবে মানুষের পায়ের পাশ দিয়েই তারা অনায়াসে হেঁটে চলে। কিন্তু এই ইঁদুরের দল কি কেবলই ঘরের চালের বস্তা বা কাপড় কাটছে, নাকি নিঃশব্দে আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে এক ভয়ানক মহামারী?

ইঁদুরের ‘ফাইভ স্টার হোটেল’ ও আমাদের বর্জ্য

প্রাণীবিদ্যার একটা সোজা সূত্র আছে—খাবারের প্রাপ্যতা যেখানে যত বেশি, সেই প্রাণীর প্রজনন ক্ষমতা সেখানে তত জ্যামিতিক হারে বাড়ে। ঢাকা শহরের ইঁদুরগুলো যেন এক আলাদিনের চেরাক পেয়েছে, আর এই চেরাকটা আমরাই তাদের হাতে তুলে দিয়েছি। আমাদের জঘন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই এর মূল কারণ। এখানে মাছের আঁশ, পচা সবজি, প্লাস্টিকের বোতল আর পুরোনো কাপড় সব একসঙ্গে মিশিয়ে রাস্তার মোড়ে ফেলে রাখা হয়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো যেখানে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করছে, সেখানে আমরা বর্জ্য দিয়ে ইঁদুরের জন্য ‘ফাইভ স্টার হোটেল’ বানিয়ে রেখেছি।

এক জোড়া প্রাপ্তবয়স্ক ইঁদুর বছরে ১,০০০ থেকে ১৫,০০০ বংশধর তৈরি করতে পারে। আর ঢাকা শহরের ড্রেনগুলো যেহেতু প্লাস্টিক আর পলিথিনে জ্যাম হয়ে থাকে, তাই মাটির নিচের এই অন্ধকার সুড়ঙ্গগুলো ইঁদুরের জন্য একেকটা সুরক্ষিত বাঙ্কার। খাবার ও বাসস্থান দুটোই যেখানে শতভাগ নিরাপদ, সেখানে তাদের বংশবিস্তার ঠেকানো অসম্ভব।

দরজায় কড়া নাড়ছে মারাত্মক মহামারী

অনেকে ভাবতে পারেন, ইঁদুর তো সামান্য জামাকাপড় কাটে, এর বেশি আর কী ক্ষতি করবে? কিন্তু বাস্তবতা অত্যন্ত ভয়ানক। এই ২০২৬ সালের মে মাসেই (গত মাসে) দক্ষিণ আমেরিকায় হান্টা ভাইরাসের আক্রমণে তিনজন মানুষ মারা গেছে। বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো এই হান্টা ভাইরাস ছড়ায় ইঁদুরের মাধ্যমে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—শুধু হান্টা ভাইরাসই নয়, ইঁদুরের শরীর, মলমূত্র আর লোম থেকে কমসে কম ৬০ ধরনের মারাত্মক রোগ মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে, যার মধ্যে টাইফয়েড থেকে শুরু করে লেপ্টোস্পাইরোসিসের মতো মরণঘাতী জীবাণু রয়েছে।

এর সাথে আছে ইঁদুরের খালাতো ভাই—আমাদের চিরচেনা ‘চিকা’। চিকার কামড়ে জলাতঙ্ক (র‍্যাবিস) হতে পারে, যার চিকিৎসা সময়মতো না হলে মৃত্যু প্রায় ১০০ ভাগ নিশ্চিত। সবচেয়ে বড় নির্মমতা দেখা যায় যখন ঢাকার অন্যতম বৃহৎ সরকারি হাসপাতাল—মিটফোর্ড হাসপাতালের ওয়ার্ডের করিডোরে ও খোলা ড্রেনের পাশে বর্জ্যের স্তূপ জমে থাকে। রোগীরা সেখানে চিকিৎসা নিতে এসে উল্টো এই রোগবাহক ইঁদুর আর মশার কামড়ে নতুন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।

পেছনে আসছে কালসাপ!

আজ যদি আমরা আমাদের চারপাশ পরিষ্কার না করি, তবে মনে রাখবেন—খাবারের খোঁজে ইঁদুর যেভাবে বাড়ছে, খুব শীঘ্রই এই মেগাসিটিতে সাপের উপদ্রবও জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাবে। কারণ ইঁদুর হলো সাপের প্রধান খাদ্য। অর্থাৎ, নোংরা আবর্জনা দিয়ে আমরা আসলে পরোক্ষভাবে কালসাপ পোষারই পায়তারা করছি।

সমাধান বিষে নয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়

সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা প্রতিবছরই ক্র্যাশ প্রোগ্রাম করেন, মাইকিং হয়, কোটি টাকার বাজেট তৈরি হয়—কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না। তবে এই প্রতিবেদন পড়ে এখনই ইঁদুর মারার বিষ নিয়ে নেমে পড়বেন না। ইঁদুর মারার বিষ এতটাই ক্ষতিকর যে এর কারণে অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণী, উপকারী ব্যাকটেরিয়া এমনকি মানবশিশুও আক্রান্ত হতে পারে। তাছাড়া বিষ দিয়ে কোটি কোটি ইঁদুর নিধন করা অসম্ভব।

প্রকৃত সমাধান হলো: যতদিন না আমরা উৎস থেকে বর্জ্য আলাদা করতে পারছি (অর্থাৎ পচনশীল ময়লা আর প্লাস্টিক আলাদা করা), ততদিন ঢাকার এই ইঁদুরের রাজত্ব থামানো যাবে না। ইঁদুরের খাবার সরবরাহ বন্ধ করতে পারলে তাদের প্রজনন ক্ষমতা আপনাআপনি কমে যাবে এবং সংখ্যাও নিয়ন্ত্রণে আসবে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


এ জাতীয় আরো খবর...