রাজধানী ঢাকাকে একটি আধুনিক, দৃষ্টিনন্দন ও বাসযোগ্য বৈশ্বিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে একগুচ্ছ যুগান্তকারী মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে বর্তমান সরকার। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বস্তি সমস্যা এবং প্রশাসনিক ভবনগুলোর বিক্ষিপ্ত অবস্থাকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর আওতায় আনতে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পরিকল্পনা করা হয়েছে। গত ১ জুন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা সভায় এই প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি ও বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বস্তি উন্নয়ন থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার আধুনিকায়ন, সচিবালয়ের মাস্টারপ্ল্যান এবং প্রধানমন্ত্রীর নতুন বাসভবন নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে।
জাপানি মডেলে বস্তিবাসীর জন্য স্যাটেলাইট সিটি
ঢাকা শহরের অন্যতম প্রধান একটি সংকট হলো বিশাল জনগোষ্ঠীর বস্তিতে মানবেতর জীবনযাপন। এই সংকট নিরসনে সরকার এবার উন্নত বিশ্বের, বিশেষ করে জাপানের বিখ্যাত ‘স্লাম ডেভেলপমেন্ট’ বা বস্তি উন্নয়ন মডেল অনুসরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, রাজধানীর সবচেয়ে বড় ও জনবহুল তিনটি বস্তি—কড়াইল, সাত তলা এবং ভাষানটেক বস্তি এলাকাকে সম্পূর্ণ নতুন রূপে সাজানো হবে। এখানে শুধু বহুতল ভবনই নয়, বরং আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ‘স্যাটেলাইট টাইপের সিটি’ গড়ে তোলা হবে। ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নিজস্ব মালিকানাধীন কড়াইল বস্তির বিশাল জমিতে এই প্রকল্পের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হয়েছে, যা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য খুব শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের সার্বিক দায়িত্বে থাকবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সচিবের সামনে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এই স্যাটেলাইট সিটির একটি বিস্তারিত প্রেজেন্টেশন বা উপস্থাপনা জমা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাংহাইয়ের আদলে পুরান ঢাকার পুনরুজ্জীবন
ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার যানজট, ঘিঞ্জি পরিবেশ এবং জরাজীর্ণ ভবনগুলোর সমস্যা সমাধানে সরকার চীনের আধুনিক শহর সাংহাইয়ের মডেল অনুসরণের চিন্তাভাবনা করছে। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় পুরান ঢাকাকে উন্নত বিশ্বের ‘রি-জেনারেশন কনসেপ্ট’ বা পুনরুজ্জীবন ধারণার আলোকে নতুন করে সাজানোর বিশাল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী সাত দিনের মধ্যে একটি নতুন প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (পিডিপিপি) প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে, ‘ঢাকা রি-জেনারেশন প্রজেক্ট’-এর একটি কারিগরি প্রস্তাবনা বা টিএপিপি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য গত ১ ফেব্রুয়ারি রাজউকের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে পাঠানো হয়েছিল। এছাড়া, এই বিশাল কর্মযজ্ঞে বৈদেশিক অর্থায়নের জন্য ‘ইন্টিগ্রেটেড প্রজেক্ট ফর রিভাইটালাইজেশন অব ওল্ড ঢাকা’ শীর্ষক আরেকটি যুগান্তকারী প্রস্তাবনা নিয়ে গত ১১ মে সচিবের সভাপতিত্বে এক বিশেষ পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রস্তাবনাটি বর্তমানে রাজউকের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
জিয়া উদ্যানের সংস্কারে ছয় মাসের আল্টিমেটাম
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থল ও জিয়া উদ্যানের যাবতীয় উন্নয়ন এবং সংস্কার কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে এই সভায়। সভার কার্যবিবরণী থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে, মূল সমাধিস্থলের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ ইতোমধ্যে অত্যন্ত সফলতার সাথে সম্পন্ন হয়েছে। এখন সমাধিস্থলের বাইরের পার্ক বা উদ্যানের সার্বিক সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য একটি আকর্ষণীয় মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা প্রস্তুত করে তা প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিচালন বাজেটের আওতায় এই সৌন্দর্যবর্ধনের কাজটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের প্রাক্কলন বা এস্টিমেট তৈরির কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে জিয়া উদ্যানের এই যাবতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কার্যক্রম শতভাগ সম্পন্ন করার জন্য একটি কঠোর আল্টিমেটাম বা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সচিবালয়ের মাস্টারপ্ল্যান ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ
দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ের কার্যক্রমে আরও গতিশীলতা ও আধুনিকতা আনতে একটি যুগান্তকারী মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান জিপিও (জেনারেল পোস্ট অফিস) ভবনসহ বাংলাদেশ সচিবালয়কে একীভূত করে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এবং তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। এই বিশাল রূপান্তরের বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি প্রাথমিক প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেক সভার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত সংসদ সচিবালয়ের সাইটে সম্ভাব্যতা যাচাইমূলক একটি প্রাথমিক ধারণাগত নকশা প্রণয়নের কার্যক্রমও বর্তমানে চলমান রয়েছে। প্রশাসনিক এই মাস্টারপ্ল্যানের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে আগামী ১৫ জুনের মধ্যে স্থাপত্য অধিদপ্তরকে চূড়ান্ত মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে দাখিল করার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মিন্টো রোডে প্রধানমন্ত্রীর আধুনিক বাসভবন নির্মাণ
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, রাজধানীর অভিজাত এলাকা মিন্টো রোড ও এর তৎসংলগ্ন এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন, সুপরিসর ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বাসভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের স্থাপত্য অধিদপ্তর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই নতুন বাসভবনের একটি পূর্ণাঙ্গ নকশা ইতোমধ্যে প্রণয়ন করেছে। গত পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী, সচিব এবং সরকারের প্রধান স্থপতির উপস্থিতিতে আয়োজিত এক বিশেষ পর্যালোচনা সভায় এই আকর্ষণীয় নকশাটি উপস্থাপন করা হয়েছিল। বর্তমানে নকশাটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নকশা প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মন্ত্রণালয় থেকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কঠোর জবাবদিহির হুঁশিয়ারি
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এই মেগা প্রকল্পগুলো নিছক কোনো সাধারণ উদ্যোগ নয়। সভায় উপস্থিত গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এবং প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজু অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার এবং রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশ হিসেবে এই মেগা প্রকল্পগুলোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাই এগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে। কাজের গতিশীলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তারা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কোনো ধরনের অবহেলা বা ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরই সরাসরি এর জন্য দায়ী থাকতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নগরীর পরিকল্পিত উন্নয়নের স্বার্থে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও সভায় দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট