তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা অনেক বেশি সহজ ও সাবলীল হয়ে উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে এবং বিল পরিশোধের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতে চালু করা হয়েছিল প্রিপেইড মিটার সিস্টেম। শুরুতে এই আধুনিক প্রযুক্তি গ্রাহকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করলেও, সম্প্রতি এটি অনেকের জন্যই এক নতুন ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুঠোফোনের স্ক্রিনে বিদ্যুৎ বিলের রিচার্জ মেসেজ আসার পর সেখানে ভেসে উঠছে এক অন্তহীন সংখ্যার পাহাড়। এটি কোনো লটারি জেতার আনন্দদায়ক খবর নয়, কিংবা জাদুকরী কোনো নম্বরও নয়; এটি নিছকই একটি বিদ্যুৎ বিল রিচার্জের টোকেন। কিন্তু এই বিশাল টোকেন নম্বরটিই এখন সাধারণ মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, তৈরি করেছে এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি।
আঙুলের ভুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকার
সাধারণত একটি প্রিপেইড মিটারে টাকা ভরার জন্য মোবাইল মেসেজে বা ব্যাংকিং অ্যাপে মাত্র ২০ ডিজিটের একটি টোকেন নম্বর দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে সেই চেনা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে গ্রাহকদের মোবাইলে আসছে ২০০ থেকে ২২০ ডিজিট পর্যন্ত লম্বা এক বিশাল সংখ্যার টোকেন। প্রিপেইড মিটারের কিপ্যাডটি এমনিতেই আকারে বেশ ছোট হয়। সেই ছোট বোতামগুলো চেপে একটানা ২০০ বা তার বেশি সংখ্যা নির্ভুলভাবে টাইপ করা কোনো সাধারণ কাজ নয়। বিশেষ করে ষাটোর্ধ্ব বয়স্ক নাগরিক, যাদের দৃষ্টিশক্তি কিছুটা ক্ষীণ কিংবা আঙুল ততটা দ্রুত চলে না, তাদের জন্য এটি এক অসাধ্য সাধন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি সংসারের হাজারো কাজের ফাঁকে ক্লান্ত গৃহিণীরাও এই দীর্ঘ নম্বর মেলাতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন। এতগুলো নম্বর টাইপ করার সময় আঙুলের সামান্য একটি ভুল চাপলেই মিটারের ছোট্ট স্ক্রিনে ভেসে উঠছে হতাশাজনক ‘এরর’ (Error) বা ত্রুটির বার্তা। এর অর্থ হলো, এতক্ষণের সব পরিশ্রম বৃথা এবং পুরো প্রক্রিয়াটি আবারও প্রথম থেকে শুরু করতে হবে। অনেকেই বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র গরমে অন্ধকারে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
নেসকোর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ও ট্যারিফ পরিবর্তন
গ্রাহকদের এই ব্যাপক ভোগান্তি, অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া ক্ষোভের মুখে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছে দেশের অন্যতম বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা নেসকো (NESCO)। এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তারা পুরো বিষয়টির পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেছে। সংস্থাটি সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, এই দীর্ঘ টোকেন আসাটা কোনোভাবেই সিস্টেমের কারিগরি ত্রুটি বা বাগ নয়। এটি মূলত সরকারের একটি নতুন সিদ্ধান্তের প্রযুক্তিগত বাস্তবায়ন মাত্র। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুতের মূল্যহার বা ট্যারিফে নতুন করে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে মোট ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন ধাপ বা স্ল্যাবের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যেহেতু প্রিপেইড মিটারগুলো অফলাইনে কাজ করে, তাই এই নতুন ট্যারিফ কাঠামোটি প্রতিটি বাসাবাড়ির মিটারের অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যারে হালনাগাদ করা অত্যন্ত জরুরি। আর মিটারের সেই সিস্টেম আপডেটটি দূর থেকে সম্পন্ন করার জন্যই মূলত প্রথমবার রিচার্জের সময় এত দীর্ঘ ডিজিটের টোকেন গ্রাহকদের মোবাইলে পাঠানো হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ একটি স্বাভাবিক ও পরিকল্পিত প্রক্রিয়া।
সঠিকভাবে রিচার্জ করার নিয়মাবলি
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং গ্রাহকদের ভোগান্তি লাঘব করতে নেসকো কর্তৃপক্ষ এই দীর্ঘ টোকেন ইনপুট দেওয়ার একটি সহজ ও সঠিক পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে জানিয়ে দিয়েছে। তারা গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, পুরো ২২০ ডিজিট দেখে ঘাবড়ে যাওয়ার বা একসাথে টাইপ করার কোনো প্রয়োজন নেই। মোবাইল স্ক্রিনে আসা টোকেনটি ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সেটি প্রতি ২০টি ডিজিট পরপর কমা (,) চিহ্ন দিয়ে আলাদা আলাদা ব্লকে ভাগ করা রয়েছে।
গ্রাহকদের উচিত অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে ও সতর্কতার সাথে প্রথম ২০টি সংখ্যা মিটারে চেপে সবুজ রঙের বোতাম বা ‘এন্টার’ (Enter) বাটন চাপ দেওয়া। প্রথম ধাপটি সঠিকভাবে নেওয়ার পর, একই নিয়মে পরবর্তী ২০টি সংখ্যা টাইপ করে আবারও এন্টার চাপতে হবে। এভাবে ধাপে ধাপে পুরো টোকেনটি পর্যায়ক্রমে ইনপুট দিলে পুরো প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন হবে এবং কাঙ্ক্ষিত ব্যালেন্স মিটারে যুক্ত হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সফল হলে মিটারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন ট্যারিফ অনুযায়ী আপডেট হয়ে যাবে।
সমাধান না পেলে করণীয়
কর্তৃপক্ষ এও জানিয়েছে যে, এই আপডেট প্রক্রিয়াটি কেবল একবারই করতে হবে। মিটার আপডেট হয়ে গেলে পরবর্তী মাসগুলো থেকে গ্রাহকরা আগের মতোই সাধারণ ২০ ডিজিটের ছোট টোকেনের মাধ্যমে রিচার্জ করতে পারবেন। এরপরেও যদি কোনো গ্রাহক এই ধাপে ধাপে নম্বর প্রবেশের প্রক্রিয়ায় জটিলতার সম্মুখীন হন বা মিটার কোনোভাবেই রিচার্জ নিতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের হতাশ বা আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে গ্রাহকরা যেন কোনো ধরনের কারসাজির চেষ্টা না করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের নিকটস্থ বিদ্যুৎ অফিস বা সংশ্লিষ্ট অভিযোগ কেন্দ্রে সরাসরি যোগাযোগ করেন, সে বিষয়ে নেসকোর পক্ষ থেকে জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আধুনিকীকরণের এই সাময়িক পরিবর্তন কিছুটা কষ্টের কারণ হলেও, সঠিক নিয়মটি জানা থাকলে এই ভোগান্তি সহজেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।
তথ্যসূত্র: এটিএন বাংলা