বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ন

মিয়ানমার সীমান্তের মাইন, নিরাপত্তা হুমকিতে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার দীর্ঘ সীমান্ত এলাকা জুড়ে রক্তক্ষয়ী ও ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অতি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সীমান্ত রেখায় পুনরায় এক ভয়াবহ স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, যাতে আরও এক যুবকের অকালমৃত্যু হয়েছে। এই দুঃখজনক ঘটনাটি কেবল দেশের ভূখণ্ডগত নিরাপত্তাঝুঁকিকেই তীব্রভাবে উন্মোচিত করেনি, বরং সেই সাথে আমাদের সীমান্তবর্তী অঞ্চল সুরক্ষায় দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম প্রস্তুতিহীনতা এবং উদাসীনতাকেও জনগণের সামনে স্পষ্ট করে তুলেছে। গত কয়েক দিনে এই সীমান্তে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে, যা কোনোভাবেই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য কাম্য হতে পারে না।

রক্তাক্ত সীমান্ত ও ধারাবাহিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে (২৪ মে থেকে ৯ জুন) বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অঞ্চলে মোট পাঁচজন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চারজনের জীবন কেড়ে নিয়েছে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা ঘাতক স্থলমাইন এবং অন্য একজন নিহত হয়েছেন উগ্র বিস্ফোরক বা মর্টার শেলের আঘাতে। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে গত মঙ্গলবার সকালে, যা সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর নিয়মিত নজরদারি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কক্সবাজারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক (রোহিঙ্গা) শিবিরের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী এক যুবক মাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই মারাত্মক বিস্ফোরণটি কিন্তু কোনো নো-ম্যানস ল্যান্ড বা শূন্য রেখায় ঘটেনি; এটি ঘটেছে দেশের মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু আমতলী সীমান্ত ফাঁড়ির কাছে।

এর ঠিক কয়েক দিন আগে, গত ২৪ মে একই ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকায় কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিন আদিবাসী চাকমা নাগরিক প্রাণ হারান। তাঁরা শূন্য রেখা অতিক্রম করার সময় মাটির নিচে পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণের শিকার হন। একের পর এক এই প্রাণহানির ঘটনা স্থানীয় মানুষের মনে চরম আতঙ্ক ও গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বিজিবির নিজস্ব পরিসংখ্যান ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে এই পাহাড়ি সীমান্তে অন্তত ৩৬টি মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাগুলোতে এখন পর্যন্ত ২১ জন বাংলাদেশি এবং ১৬ জন রোহিঙ্গা গুরুতরভাবে আহত বা পঙ্গু হয়েছেন। এমনকি কর্তব্যরত অবস্থায় এক বিজিবি সদস্যও মাইন বিস্ফোরণে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও ভীতি

এই ধারাবাহিক বিস্ফোরণগুলো মূলত কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্ত এলাকায় সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। এর ফলে ওই অঞ্চলের সাধারণ এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে থমকে গেছে। পাহাড়ি ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলের একটা বড় অংশের মানুষ কৃষিকাজ, জুমচাষ এবং বন থেকে লাকড়ি বা কাঠ সংগ্রহের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। জীবন ধারণের জন্য তাঁদের প্রতিদিন সীমান্ত সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় যেতেই হয়। কিন্তু বর্তমানের এই রক্তাক্ত পরিস্থিতির কারণে মানুষ এখন প্রাণভয়ে নিজেদের আবাদি জমিতে যেতে পারছেন না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রবীণ কারবারিরা জানিয়েছেন, পুরো এলাকা জুড়ে এখন এক অদৃশ্য যুদ্ধাবস্থার ভীতি বিরাজ করছে। পেটের তাগিদে এবং পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে যারা বাধ্য হয়ে ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন, তারা যেকোনো মুহূর্তে পঙ্গুত্ব বরণ বা মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকছেন।

প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং বিজিবির ভূমিকা

দেশের সীমানার দুই কিলোমিটার ভেতরে কীভাবে একের পর এক স্থলমাইন পুঁতে রাখা সম্ভব হলো এবং কেন বিজিবি তা আগে থেকে টের পেল না—তা নিয়ে দেশের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা চলছে। অনেক সামরিক বিশ্লেষক এই ঘটনাকে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর এক ধরনের শৈথিল্য ও নিয়মিত টহল ব্যবস্থার ত্রুটি হিসেবে দেখছেন। যদিও বিজিবির স্থানীয় ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের মধ্যে নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা করছেন এবং মাইনের ঝুঁকি এড়াতে লিফলেট বিতরণ করছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে বা তাদের চলাচলেই নিষেধাজ্ঞা জারি করে এই বিশাল জাতীয় নিরাপত্তাঝুঁকি এড়ানো সম্ভব নয়।

এই চরম সংকটময় মুহূর্তে সবচেয়ে বড় যে সত্যটি সামনে এসেছে, তা হলো বিজিবির নিজস্ব প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। সীমান্ত এলাকা থেকে মাইন অপসারণ বা ‘মাইনসুইপিং’ করার মতো প্রয়োজনীয় ও আধুনিক যন্ত্রপাতি বা সক্ষমতা এই আধা-সামরিক বাহিনীর নেই। বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, সীমান্ত অঞ্চলে এই ধরনের বিশেষ কোনো প্রযুক্তিগত অভিযান পরিচালনা করতে হলে তা এককভাবে বিজিবির পক্ষে সম্ভব নয়; এর জন্য জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত দলের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার দেশের সমতল অঞ্চলের নিরাপত্তাকে যেভাবে অগ্রাধিকার দেয়, পার্বত্য অঞ্চলের সীমান্ত সুরক্ষাকে এখনো সেই মাত্রায় গুরুত্ব দিচ্ছে না। আধুনিক যুগে ড্রোন প্রযুক্তি ও উন্নত সেন্সর ব্যবহার করে সহজেই এই লুকানো মাইনগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব, কিন্তু সেই আধুনিকায়নের ছোঁয়া আমাদের সীমান্ত সুরক্ষায় এখনো অনুপস্থিত।

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং কূটনৈতিক জটিলতা

বাংলাদেশের এই ভূরাজনৈতিক ও সীমান্ত সংকটের পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ। গত বছরের শেষের দিকে মিয়ানমারের শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’ দক্ষিণ রাখাইন রাজ্যের প্রধান প্রধান শহরগুলো এবং কৌশলগত সীমান্ত এলাকাগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। এর ফলে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) সেখানে আর কোনো অস্তিত্ব নেই। এই ক্ষমতার রদবদল বাংলাদেশকে এক চরম কূটনৈতিক জটিলতার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করা কঠিন।

এদিকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা দাবি করেছে যে, বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে ঘটে যাওয়া এই মাইন বিস্ফোরণগুলোর সাথে তাদের কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই। তাদের দাবি অনুযায়ী, আরসা (ARSA) বা আরএ (ARA)-এর মতো রোহিঙ্গা চরমপন্থী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের স্বার্থে এই মাইনগুলো স্থাপন করছে। তবে বাংলাদেশ নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা এই দাবিকে স্রেফ রাজনৈতিক কৌশল বা দায় এড়ানোর চেষ্টা বলে মনে করছেন। ২০১৭ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নাগরিক সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এই বিশাল জনসংখ্যার দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি এবং সীমান্তের ওপারে চলমান জাতিগত সংঘাতের কারণে উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চল চোরাচালান, অস্ত্র ব্যবসা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।

উপসংহার: দীর্ঘস্থায়ী সমাধান ও রাষ্ট্রের করণীয়

সীমান্তের এই মাইন আতঙ্ক কোনো সাময়িক সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের সার্বভৌমত্ব এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর এক বড় আঘাত। অনেক ভুক্তভোগী আছেন যারা ২০১৭ সালের সংঘাতের সময় মাইন বিস্ফোরণে নিজেদের হাত-পা হারিয়ে আজ চরম অর্থনৈতিক অনটনে পঙ্গু জীবন যাপন করছেন। তাই সরকারকে অবিলম্বে এই পাহাড়ি সীমান্ত অঞ্চলকে সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকিমুক্ত করতে একটি সুনির্দিষ্ট এবং কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শুধু সাধারণ মানুষের যাতায়াত সীমিত করে সমস্যার সমাধান হবে না; বরং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সেনাবাহিনীকে সাথে নিয়ে অনতিবিলম্বে সীমান্তে ব্যাপকভিত্তিক মাইন প্রতিরোধী অভিযান চালু করতে হবে। একই সাথে সীমান্ত অঞ্চলে ড্রোন নজরদারি বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ওপার থেকে আসা এই মরণফাঁদ চিরতরে বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুবা, দেশের এই সীমান্ত অঞ্চলের অবহেলিত মানুষগুলোকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েই বেঁচে থাকতে হবে।

 

তথ্যসূত্র: নিউ এজ


এ জাতীয় আরো খবর...