শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ন

নতুন বাজেটে যেসব পণ্যের দাম কমছে

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে পেশ করা হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বহুল প্রতীক্ষিত প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট। এবারের বিশাল আকারের এই বাজেটের মোট আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন উৎস থেকে রাজস্ব আদায় করতে হবে প্রায়

৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়াতে যেমন নতুন নতুন খাতকে করজালের আওতায় আনতে হয়, ঠিক তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও জনকল্যাণের স্বার্থে অনেক ক্ষেত্রে শুল্ক ও করে বড় ধরনের ছাড় দিতে হয়। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঘটাতে এবারের বাজেটে এক শতেরও বেশি পণ্য ও সেবায় কর এবং শুল্ক কমানো বা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব এনেছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি খুচরা বাজারে অনেক পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য, কৃষিজাত উপকরণ এবং পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যানবাহনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ এই কর ছাড়ের সরাসরি সুফল ভোগ করতে পারবেন।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও কৃষি খাত

সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং লাগামহীন বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবারের বাজেটে খাদ্য ও কৃষি খাতে অত্যন্ত জনমুখী ও দূরদর্শী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের ডাল-ভাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় এবং মৌলিক কৃষিজাত প্রায় ৬০টি পণ্যের ওপর বিদ্যমান উৎসে কর উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগে পণ্যভেদে এই উৎসে করের হার ছিল ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ কিংবা ১ শতাংশ, যা নতুন বাজেটে এক ধাক্কায় কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ নির্ধারণ করার ঐতিহাসিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পবিত্র রমজান মাসসহ সারা বছর সাধারণ মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এবং আমদানিকারকদের খরচ কমাতে খেজুর আমদানির ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সাথে রান্নার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ ও গোলমরিচসহ সব ধরনের আমদানিনির্ভর মসলার ওপর থেকেও ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শিশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানির শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে, যা এই পণ্যের বাজারমূল্য সাধারণের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসবে। কৃষকদের স্বস্তি দিতে সারের ব্যবসায়ী পর্যায়ের ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের পাশাপাশি দস্তা বা জিংক সালফেট সার তৈরির মূল কাঁচামাল জিংক অ্যাশ আমদানির শুল্ক শূন্য শতাংশ করার বৈপ্লবিক প্রস্তাব আনা হয়েছে। কীটনাশক উৎপাদনের কাঁচামালে ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং আমদানিকৃত কীটনাশকের ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর মওকুফ করার ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ অনেক কমে যাবে। এছাড়া পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাদ্যের তিনটি প্রধান কাঁচামালকে শূন্য শতাংশ রেয়াতি সুবিধার আওতায় আনা এবং খামারিদের সুবিধার্থে এই খাতের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির শুল্ক সম্পূর্ণ শূন্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা

দেশের স্বাস্থ্য খাতকে সাধারণ মানুষের জন্য আরও বেশি সাশ্রয়ী এবং সেবামূলক করতে জীবনরক্ষাকারী বিভিন্ন সামগ্রী ও ওষুধের ওপর বড় ধরনের কর মওকুফের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দেশের বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র কিডনি রোগীর জীবন বাঁচাতে এবং নিয়মিত চিকিৎসাসেবা সচল রাখতে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অপরিহার্য চিকিৎসাসামগ্রী কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিবার ডায়ালাইসিস প্রক্রিয়ায় একজন রোগীর প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। এর পাশাপাশি হেমোডায়ালিসিসে ব্যবহৃত ব্লাড টিউবিং সেট আমদানির ওপর থেকে ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। হৃদরোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হার্টের রিং বা স্টেন্ট সরবরাহের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ ভ্যাট তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার ফলে বাজারে প্রতিটি হার্টের রিংয়ের দাম এক লাফে প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমে যেতে পারে। চোখের ছানি চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ওপর থেকেও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে, যা প্রতিটি লেন্সের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হ্রাস করবে। ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সাথে সাধারণ ওষুধের মূল উপাদান বা এপিআই তৈরির নতুন ৫১টি উপকরণের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ওষুধের রপ্তানি সক্ষমতা ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামালকে শুল্কমুক্ত আমদানির আওতায় আনা হয়েছে এবং মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত মর্চুয়ারি আমদানির উচ্চ শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করার সংবেদনশীল প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতি

একটি উন্নত, আধুনিক এবং স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে এবং দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ডিজিটাল অর্থনীতিতে অভাবনীয় শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। নতুন বাজেটের প্রস্তাব অনুযায়ী, ফ্রিল্যান্সার, শিক্ষার্থী ও প্রযুক্তিবিদদের সুবিধার্থে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার এবং কম্পিউটার মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সমুদয় আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কম্পিউটারের গতি বাড়ানোর অন্যতম প্রধান উপাদান এসএসডি আমদানির ক্ষেত্রেও মাত্র ৫ শতাংশ নামমাত্র আমদানি শুল্ক ব্যতিরেকে বাকি সব ধরনের রেগুলেটরি ও সম্পূরক শুল্ক এবং ভ্যাট তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে ডিজিটাল ডিভাইসগুলোর দাম বাজারে ব্যাপকভাবে কমে যাবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে। এছাড়াও ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও জনপ্রিয় ও সহজলভ্য করতে পয়েন্ট অব সেলস বা পস মেশিনের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার এবং এর অগ্রিম কর সম্পূর্ণ শূন্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের ডিজিটালাইজেশনে এক ইতিবাচক জোয়ার নিয়ে আসবে।

পরিবেশবান্ধব পরিবহন ও অন্যান্য খাত

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব পরিবহন খাতের আধুনিকায়নে নতুন বাজেটে বিশেষ চমক দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববাজারের সাথে তাল মিলিয়ে দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইলেকট্রিক গাড়ির মোট করভার ৯৩ শতাংশের বিশাল স্তর থেকে এক ধাক্কায় কমিয়ে মাত্র ৬৪ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের উচ্চ প্রযুক্তির ইলেকট্রিক গাড়ির করভার কমিয়ে ৮০ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা পরিবেশবান্ধব এসব গাড়ির বাজারমূল্য অনেক কমিয়ে দেবে। এছাড়া মাঝারি সিসির বা ১৮০০ সিসি পর্যন্ত প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির মোট করভার ৯৩.১৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭৩.৪৩ শতাংশে নামানোর কথা বলা হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির এই বৈপ্লবিক রূপান্তরকে টেকসই করতে ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের ওপর বিদ্যমান ৩৯.৭৫ শতাংশের বিশাল করভার সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশে পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থাকে অত্যন্ত সস্তা ও আকর্ষণীয় করে তুলবে। এর পাশাপাশি দেশের বিনোদন ও সংস্কৃতি খাতের বিকাশে গিটার, পিয়ানো এবং ভায়োলিনের মতো মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট ও যন্ত্রাংশ আমদানির ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে এবং উচ্চপ্রযুক্তির সিনেমাটোগ্রাফিক বা সিনেমা ক্যামেরার আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সবশেষে সমাজের অবহেলিত ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের স্বাধীন চলাফেরা নিশ্চিত করতে ২১ ধরনের বিশেষ সহায়ক যন্ত্র আমদানির ক্ষেত্রে সব ধরনের শুল্ক, কর ও ভ্যাট থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার মানবিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেট একদিকে যেমন রাজস্ব আদায়ের বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, অন্যদিকে তেমনি সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং প্রযুক্তির উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও জনমুখী সমাজ গঠনের path সুগম করেছে।


এ জাতীয় আরো খবর...