একটি দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে আয়করের যে নতুন রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, তা দেশের মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এক বড় ধরনের দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে করমুক্ত আয়ের সীমা সামান্য বাড়ানো হলেও, সর্বনিম্ন করের ধাপটি বিলুপ্ত করে সরাসরি দ্বিগুণ করার মাধ্যমে মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সৎ করদাতাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগের বিপরীতে পাওয়া কর রেয়াতের সুবিধা কমিয়ে দেওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়া এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ আরও বহুমুখী হবে। অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত এই কর কাঠামো সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলবে।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে সামান্য বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকা (৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা) করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এই সামান্য স্বস্তির আনন্দ কর্পূরের মতো উড়ে গেছে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কারণে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত সর্বনিম্ন ৫ শতাংশের প্রাথমিক করের ধাপটি এই বাজেট প্রস্তাবে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে করের প্রাথমিক ধাপই নির্ধারণ করা হয়েছে সরাসরি ১০ শতাংশ।
নতুন এই প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রথম পৌনে চার লাখ টাকা আয়ের ওপর কোনো কর দিতে হবে না। তবে এর পরবর্তী ৩ লাখ টাকা আয়ের ওপর ১০ শতাংশ, পরের ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরের ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকা আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হবে। এর চেয়েও বেশি অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হবে। অর্থ বিভাগের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, করমুক্ত আয়ের এই সীমা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে সাড়ে চার লাখ টাকা করা হবে এবং একই সময়ে সর্বোচ্চ করের হার ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। বর্তমানের তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির বাজারে এই করমুক্ত সীমা অপর্যাপ্ত এবং তা মধ্যবিত্তের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মধ্যবিত্ত নাগরিকদের করের বোঝা কমানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ আর্থিক সুরক্ষার একটি বড় মাধ্যম ছিল নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগ করে কর রেয়াত বা ছাড় পাওয়া। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি করদাতাদের সেই বৈধ ও প্রকৃত বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে একঝটিকায় কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, একজন করদাতা সর্বোচ্চ যে পরিমাণ টাকা বিনিয়োগের ওপর রেয়াত পেতেন, সেই সর্বোচ্চ সীমাও ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে সাত লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে মধ্যস্থ ও সৎ করদাতারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মতে, বিদ্যমান বাজার পরিস্থিতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি যেখানে মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে, সেখানে কর রেয়াত কমিয়ে দেওয়ায় মানুষ বৈধ উপায়ে সঞ্চয় ও বিনিয়োগে একদম নিরুৎসাহিত হয়ে পড়বেন। দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, করের স্ল্যাব বা স্তর সাতটি থেকে কমিয়ে ছয়টিতে নামিয়ে আনা এবং সর্বনিম্ন ৫ শতাংশের স্ল্যাব তুলে দেওয়ার কারণে করদাতাদের একটি বিরাট অংশের ওপর তাৎক্ষণিক ও প্রচণ্ড করের চাপ তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির বাস্তবতার সাথে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয়।
নতুন কর প্রস্তাবের সবচেয়ে বৈষম্যমূলক ও চমকপ্রদ দিকটি উন্মোচন করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় কর বিশেষজ্ঞরা। তাদের গাণিতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন এই নিয়মের ফলে একজন নাগরিকের আয় যত কম বা মধ্যম সারির হবে, তার ওপর করের বোঝা তত বেশি শতাংশ হারে বাড়বে। অর্থাৎ, অতি উচ্চ আয়ের মানুষের তুলনায় মধ্যবিত্তরাই এই করের জালে সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হবেন।
উদাহরণস্বরূপ, যার মাসিক বেতন বা আয় ৭৪ হাজার টাকা, উৎসব বোনাসসহ তার বার্ষিক করযোগ্য আয় দাঁড়ায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। রেয়াত ও অন্যান্য হিসাব বাদ দিয়ে তার করযোগ্য নিট আয় দাঁড়াত ৬ লাখ ৪২ হাজার টাকা। বিদ্যমান বা আগের কর কাঠামোতে এই স্তরের একজন নাগরিককে বছরে কর দিতে হতো মাত্র ৫ হাজার টাকা। কিন্তু নতুন প্রস্তাবিত কর নীতি কার্যকর হলে তার বার্ষিক করের পরিমাণ সরাসরি বেড়ে দাঁড়াবে ৭ হাজার ৪৫৪ টাকায়। এর অর্থ হলো, সামান্য আয়ের এই নাগরিকের করভার এক ধাক্কায় প্রায় ৪৯ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক বেড়ে যাবে।
আরও ওপরের স্তরে, যার মাসিক আয় ৯৮ হাজার টাকা এবং বার্ষিক করযোগ্য আয় পৌনে ১৩ লাখ টাকা, কর রেয়াতের পর তার আগের করের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৫০৪ টাকা। নতুন নিয়মে সেটি একলাফে বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৩০ হাজার ৭৫৪ টাকা। এই ক্ষেত্রে করের বোঝা বাড়ার হার অবিশ্বাস্যভাবে ৫৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অথচ, যার মাসিক আয় আড়াই লাখ টাকা বা তার বেশি, অর্থাৎ যারা সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণী, তাদের ক্ষেত্রে বার্ষিক করের পরিমাণ ৩ লাখ ৬২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪ লাখ টাকা হবে, যা শতাংশের হিসাবে মাত্র সাড়ে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি। এই অদ্ভুত ও বিপরীতমুখী সমীকরণের কারণে মধ্যবিত্তের ওপরই করের প্রকৃত চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
উচ্চ আয়ের মানুষদের টাকার অঙ্কে করের পরিমাণ বেশি মনে হলেও, তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের পর বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ বা সঞ্চয় থাকে। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই কঠিন সময়ে একজন মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য মাস শেষে ডাল-ভাতের সংস্থান করে পরিবার চালানোই যেখানে এক দুঃসহ লড়াই, সেখানে সরকারের এমন অতিরিক্ত করের সিদ্ধান্ত মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো কাজ করবে। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, জোর করে বা অযৌক্তিকভাবে এভাবে করের হার বাড়ালে সাধারণ মানুষ কর দিতে আরও বেশি অনীহা প্রকাশ করবেন।
দেশে বর্তমানে বিপুল সংখ্যক করযোগ্য মানুষ থাকা সত্ত্বেও অর্ধেকের বেশি মানুষ যে কর জালের বাইরে থাকছেন, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই নিপীড়নমূলক কর নীতি। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর আদায়ের পরিধি ও সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য করের হার না বাড়িয়ে করদাতার সংখ্যা বাড়ানো উচিত ছিল। কিন্তু সরকার সহজ পথ বেছে নিয়ে যারা নিয়মিত ও সততার সাথে কর দেন, তাদের ওপরই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এই অন্যায্য ও অযৌক্তিক কর কাঠামো অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা না হলে, তা কেবল মধ্যবিত্ত সমাজকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে।
তথ্যসূত্র: সমকাল