একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো সুষম ও দূরদর্শী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান অসংগতি এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দেশের রাজস্ব আদায়ের পরিধি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক উৎস—উভয় জায়গা থেকেই সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। অর্থ বিভাগের সাম্প্রতিক মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক নীতি বিবৃতির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ঋণের এই বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকার এক অবিশ্বাস্য পাহাড়সম চূড়ায় গিয়ে দাঁড়াবে। ঋণের এই নজিরবিহীন উল্লম্ফন দেশের সার্বিক অর্থনীতি, বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিকাশ, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
চলতি বছরের শুরুতে দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকারের সময় দেশের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি, যা মাত্র এক মাসের ব্যবধানে গত মার্চ শেষে প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন বলছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে এই ঋণের স্থিতি দাঁড়াবে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায়। এর পরবর্তী অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ২৯ লাখ ৫৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হবে এবং তিন বছর পর অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছর শেষে তা চূড়ান্তভাবে ৩৩ লাখ ৭৭ly ৬০০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকবে। এই বিশাল ঋণের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎসের অবদান থাকবে ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৪ লাখ ৯৭ হাজার Readiness ৬০০ কোটি টাকা। ঋণের এই বিশাল বোঝো স্বাভাবিকভাবেই বার্ষিক সুদ পরিশোধের ব্যয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারকে শুধু সুদ বাবদই পরিশোধ করতে হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ৬২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। ফলে জাতীয় বাজেটের একটি সিংহভাগ অংশই চলে যাবে বিগত বছরগুলোর ঋণের মাশুল গুনতে, যা দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বরাদ্দকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করে ফেলবে।
সরকারের এই লাগামহীন ঋণ বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে রাজস্ব আয়ের চরম শ্লথগতিকে দায়ী করা হচ্ছে। গত পাঁচ অর্থবছরে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় যেখানে বেড়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশ, সেখানে একই সময়ে সরকারের ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। পরিস্থিতি এখন এমন এক জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সাধারণ করের টাকায় সরকারের পুরো পরিচালন ব্যয় মেটানো তো দূরের কথা—সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন ও আগের ঋণের সুদের টাকা পরিশোধের পর কৃচ্ছ্রসাধন করেও বিশাল ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
অর্থনীতির পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’। সরকার যখন নিজের বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নেয়, তখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার তহবিল ও উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। এর প্রত্যক্ষ ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বেসরকারি বিনিয়োগ, নতুন শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে মন্থর ও স্থবির করে দেয়। সাবেক অর্থ সচিব ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকদের মতে, রাজস্ব আয়ে উল্লেখযোগ্য গতিশীলতা আনার মতো কোনো বড় প্রশাসনিক বা কাঠামোগত সংস্কার এখনো দৃশ্যমান হয়নি, যার ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে ঋণের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে এই ঋণের অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্প থেকে যদি দ্রুত অর্থনৈতিক রিটার্ন নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
কেবল অভ্যন্তরীণ উৎসই নয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এখন এক কঠিন এবং অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অতীতে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে নেওয়া অনেক বৈদেশিক ঋণের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ বা রেয়াতকাল শেষ হয়ে আসায় এখন মূল অর্থ এবং সুদ—দুটিই একসঙ্গে পরিশোধের সময় শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতির ঝুঁকি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রা টাকার ধারাবাহিক ও তীব্র অবমূল্যায়ন। যেহেতু বাংলাদেশে বাস্তবায়িত অধিকাংশ বড় অবকাঠামো প্রকল্প স্থানীয় মুদ্রায় (টাকায়) আয় করে, তাই ডলারের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণ পরিশোধের প্রকৃত বোঝা প্রাক্কলনের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে।
আগামী তিন অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের যে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে তা অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৪২৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৪২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের পরিশোধ করতে হবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে মেগা প্রকল্প, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশেষায়িত কারিগরি দক্ষতার জন্য বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন থাকলেও, আসল উদ্বেগের জায়গা হলো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবস্থান এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা। যেহেতু অধিকাংশ প্রকল্প সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে না, তাই রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের আউটলুক বা অর্থনৈতিক পূর্বাভাস নেতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছে, যা নতুন ঋণ পাওয়ার পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।
সামষ্টিক অর্থনীতির এই অভ্যন্তরীণ সংকটের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের চরম অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি দেশের অর্থনীতিকে অত্যন্ত ভঙ্গুর করে তুলেছে। অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে সতর্ক করা হয়েছে যে, আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে যদি জ্বালানির দাম ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে তার বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি তীব্রতর হবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর লোকসান ও ভর্তুকির চাপ বাজেট বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করবে, যা প্রকারান্তরে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে আরও বাড়িয়ে এক অন্তহীন দুষ্টচক্রে রূপ দেবে।
এই অর্থনৈতিক সংকটের কথা স্বীকার করে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, দেশের পাবলিক ফাইন্যান্স ও বাজেট কাঠামো এখন একটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতির ধরন ও বিনিয়োগের বৈশ্বিক মানদণ্ড দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় প্রচলিত দীর্ঘদিনের বাজেট পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন অর্থনৈতিক চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে। যদিও গত দেড় দশকে গড়ে ওঠা ঋণনির্ভর এই অর্থনৈতিক কাঠামো রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তবে বেসরকারি খাতকে সচল রাখতে সরকার আগামী অর্থবছর থেকে স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সুরক্ষায় নতুন যেকোনো ঋণ নেওয়ার আগে প্রকল্পের অগ্রাধিকার, প্রকিউরমেন্টের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগের বিপরীতে প্রকৃত অর্থনৈতিক রিটার্ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা