প্রতিবছরের বাজেট ঘোষণার পর দেশের সাধারণ মানুষ যখন বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে হিসাব-নিকাশ করতে বসেন, তখন ধূমপায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়াটা একপ্রকার অবধারিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত নতুন বাজেটেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রতিবারের মতো এবারও রাজস্বের ঘাটতি মেটাতে সরকারের সবচেয়ে সহজ ও বড় ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে তামাক খাত। নতুন বাজেটে সিগারেট ও তামাকজাত পণ্যের ওপর নতুন করে বিশাল করের বোঝা চাপানো হয়েছে, যার ফলে সাধারণ বাজারে সিগারেটের দাম প্রায় আকাশচুম্বী হতে চলেছে। সরকারের লক্ষ্য—তামাক খাত থেকে আসা বর্তমানের বার্ষিক ৪০ হাজার কোটি টাকার রাজস্বের পরিধি বাড়িয়ে এক ধাক্কায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা। অর্থাৎ, দিনশেষে দেশের রাস্তাঘাট, স্কুল, কলেজসহ সার্বিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বরাদ্দের এক বিশাল অংশের জোগান দিতে হবে ধূমপায়ীদের পকেটের টাকায়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লাইভ ডেটা বা সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের বাজারে চারটি মূল্যস্তরেই (নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম) দাম বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে বাজারে বেনসন বা মার্লবোরোর মতো প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের ১০ শলাকার এক প্যাকেটের অফিশিয়াল দাম ১৮৫ টাকা, যার অর্থ ২০ শলাকার পুরো এক প্যাকেটের দাম ৩৭০ টাকা। তবে দেশের খোলা বাজারে এটি এমনিতেই প্রায় ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়ে আসছিল।
নতুন বাজেটের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রিমিয়াম স্তরে প্রতি ১০ শলাকার দাম ২৫ টাকা বাড়িয়ে সরাসরি ২১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি খাতা-কলমে এই স্তরে ২০ শলাকার এক প্যাকেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বা এমআরপি (MRP) ৪২০ টাকা হওয়ার কথা। এই প্রিমিয়াম স্তরে সম্পূরক শুল্কের হার আগের মতোই ৬৭ শতাংশ রাখা হয়েছে, যার সাথে যুক্ত হবে মূল মূল্যের ওপর সরাসরি ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং জনস্বাস্থ্যের ক্ষতিপূরণ বাবদ অতিরিক্ত ১ শতাংশ সারচার্জ।
সরকারি রেটে ২০ শলাকার প্যাকেট ৪২০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও খোলা বাজারে ধূমপায়ীদের জন্য আসল ধাক্কাটা আসছে অন্য জায়গায়। বাজেটে এবার সিগারেটের মূল কাঁচামাল, বিশেষ করে ফিল্টার তৈরির পেপার এবং বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ইন্ডাস্ট্রিয়াল নিকোটিনের ওপর সরকার শুল্কের হার ৩০০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে একলাফে ৩৫০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে। কাঁচামাল আমদানির এই নজিরবিহীন ডিউটি বা শুল্কবৃদ্ধির ফলে কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। ফলস্বরূপ, বাজেটের পর খোলা বাজারে বেনসন বা মার্লবোরোর মতো প্রিমিয়াম এক প্যাকেট সিগারেটের দাম গিয়ে ঠেকবে প্রায় ৪৭০ থেকে ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ, বর্তমানে যে সিঙ্গেল স্টিক বা খুচরা সিগারেট ধূমপায়ীরা ২০ টাকায় কিনছেন, বাজেটের পর তা কিনতে পকেট থেকে খসাতে হবে ২৫ টাকা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশের সামগ্রিক তামাক খাত (সিগারেট, বিড়ি ও জর্দা) থেকে বছরে প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়, যার ৯৫ শতাংশেরও বেশি আসে কেবল সিগারেট খাত থেকে। তবে দেশের মোট উৎপাদিত ও বিক্রিত সিগারেটের প্রায় ৯০ শতাংশই হলো নিম্ন ও মধ্যম স্তরের। ফলে রাজস্বের সবচেয়ে বড় অংশটি এই স্তরগুলো থেকেই সংগৃহীত হয়ে থাকে।
অর্থনীতিবিদদের প্রাক-বাজেট হিসাব ও এনবিআরের প্রক্ষেপণ বলছে, নতুন অর্থবছরে মূল্যস্তর ও কর পুনর্নির্ধারণের সম্পূর্ণ সংস্কার কার্যকর করা গেলে সরকার এই খাত থেকে অতিরিক্ত আরও ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আদায়ের সুযোগ পাবে। এর ফলে নতুন অর্থবছরে তামাকজাত পণ্য থেকে সরকারের মোট সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকায়।
তবে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে প্রধান অন্তরায় হলো তামাক কোম্পানি ও খুচরা বিক্রেতাদের সুনির্দিষ্ট কর ফাঁকি ও তদারকির অভাব। তামাকবিরোধী গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সরকার প্যাকেটের গায়ে যে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) নির্ধারণ করে দেয়, বাজারে কোম্পানি ও খুচরা বিক্রেতারা সবসময়ই তার চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করে। কিন্তু আইনগত জটিলতার কারণে সরকার ট্যাক্স বা শুল্ক পায় শুধুমাত্র নির্ধারিত মূল্যের ওপর। বাজারে প্যাকেটের গায়ে লেখা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির এই অনিয়মের কারণে প্রতিবছর সরকার প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার সরাসরি রাজস্ব হারাচ্ছে। বাজারে কঠোর শুল্ক তদারকি ও তামাক কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর জরিমানা আরোপ করা গেলে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারি কোশাগারে যোগ হতে পারত।
এখানে একটি বড় ধরনের নীতিগত বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ সরকারের মূল দীর্ঘমেয়াদি ভিশন বা লক্ষ্য হলো দেশকে পুরোপুরি তামাকমুক্ত করা। কিন্তু প্রতিবছরের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, তামাকের ব্যবহার কমানোর চেয়ে এই খাত থেকে কীভাবে আরও বেশি ট্যাক্স বা রাজস্ব নিঙড়ে নেওয়া যায়, সরকারের মূল লক্ষ্য যেন থাকে সেটাই। একদিকে জনস্বাস্থ্যের দোহাই দিয়ে তামাকবিরোধী প্রচার চালানো হচ্ছে, অন্যদিকে আমলাদের বেতন-ভাতা থেকে শুরু করে দেশের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের বিশাল ব্যয়ের জোগান নিশ্চিত করতে এই তামাক খাতের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে। এই দ্বিমুখী নীতির কারণে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হলেও, বাস্তব চিত্র হলো—আগামী দিনে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে তামাকের এই ‘কালো টাকা’র ওপর সরকারের নির্ভরতা আরও বাড়ছে।
তথ্য: দ্যা ওয়েভ ২৪