সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১২:২০ পূর্বাহ্ন

দেশের ৮১ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানই আর্থিক ঝুঁকিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার অন্যতম চালিকাশক্তি রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন গভীর কাঠামোগত ও আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন, নির্মাণ, টেলিযোগাযোগ, পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষির মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিচালিত দেশের ৮১ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে মাঝারি থেকে অতি উচ্চ মাত্রার আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থ বিভাগের এক সাম্প্রতিক মূল্যায়নে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান অনিয়ম, অদক্ষতা, তীব্র আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে বাণিজ্যিক ভিত্তির চেয়ে গোষ্ঠীগত স্বার্থে পরিচালিত হওয়ায় বছরের পর বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠান লোকসানের বোঝা টানছে।

৮.৩৩ লাখ কোটি টাকার পাহাড়সম দায়

অর্থ বিভাগের তৈরি করা ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছর পর্যন্ত মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে দেশের ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে। মুনাফা সক্ষমতা, তারল্য ও ঋণ পরিশোধের যোগ্যতাসহ সাতটি আর্থিক মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে ১ থেকে ৫ স্কোরের মানদণ্ডে এই ঝুঁকি পরিমাপ করা হয়।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১২২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫০টি মাঝারি ঝুঁকি, ৩০টি উচ্চ ঝুঁকি এবং ১৯টি প্রতিষ্ঠান অতি উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সব মিলিয়ে এই ১২২টি প্রতিষ্ঠানের মোট দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৩ thousand ২১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, মোট দায়ের প্রায় ৬২ শতাংশই হচ্ছে উচ্চ ও অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের।

অতি উচ্চ ঝুঁকিতে বিপিডিবি ও সুগার মিলগুলো

দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের বৃত্তে আটকে থাকা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ অতি উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সর্বোচ্চ ৫ স্কোরের মধ্যে সংস্থাটির ঝুঁকি স্কোর ৪ দশমিক ৮৩। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম মূল্যে বিক্রি করার ভুল নীতিগত মডেলের কারণে প্রতিষ্ঠানটি বিপুল আর্থিক ঘাটতিতে পড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বিপিডিবির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে ওই এক বছরেই নিট লোকসান ছিল ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা।

বিপিডিবিকে টিকিয়ে রাখতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬২ হাজার কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে সরকারকে। ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে এ পর্যন্ত সংস্থাটি মোট ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি নিয়েছে, যার বড় অংশই চলে যাচ্ছে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ পরিশোধে।

বিপিডিবি ছাড়াও অতি উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে—বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি), মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং, ঢাকা লেদার কোম্পানি, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর এবং শ্যামপুর, জয়পুরহাট, রাজশাহী, নাটোর, কুষ্টিয়াসহ দেশের ১০টি রাষ্ট্রায়ত্ত সুগার মিল।

উচ্চ ঝুঁকিতে ডেসকো, তিতাস ও বিমান বাংলাদেশ

দেশের বিদ্যুৎ খাতের ডিপিডিসি, ডেসকো, আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন, ওজোপাডিকো ও নেসকো উচ্চ মাত্রার আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে। ডেসকো ও ডিপিডিসির মতো একসময়ের লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো পাইকারি বিদ্যুতের দামের সাথে খুচরা দামের সমন্বয় না হওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের কারণে লোকসানি সংস্থায় পরিণত হচ্ছে।

জ্বালানি খাতের সাতটি প্রতিষ্ঠান উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে, যার মধ্যে গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান ‘বাপেক্স’ অতি উচ্চ ঝুঁকিতে এবং তিতাস গ্যাস, যমুনা অয়েল, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস, বাখরাবাদ গ্যাস ও জিটিসিএল উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। কূপ খননের জন্য বিদেশী ঋণ ও গ্যাস উন্নয়ন তহবিল (জিডিএফ) থেকে নেওয়া ঋণের চাপে রয়েছে বাপেক্স।

জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠার ৫৪ বছরেও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের একচেটিয়া সুবিধাসহ সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেয়েও মানসম্মত হতে পারেনি। বর্তমানে বিমানের ঋণের পরিমাণ ৭ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা। এর বাইরে বিপিসি ও বেবিচকের কাছে বিমানের বকেয়া আরও প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যেই বোয়িংয়ের কাছ থেকে নতুন ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি চুক্তি করেছে সংস্থাটি, যা আর্থিক ঝুঁকি আরও বাড়াবে।

অন্যদিকে, সড়ক পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৮ কোটি টাকা এবং নৌ-পরিবহন সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ ৫৩২ কোটি টাকা লোকসান করেছে। বিআরটিসির দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ১ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা এবং বিআইডব্লিউটিএর দায়ের পরিমাণ ১ লাখ ১৩ কোটি টাকা। এছাড়া কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প মন্ত্রণালয়ের শাহজালাল ও চিটাগং ইউরিয়া সার কারখানাও শত কোটি টাকার ওপর লোকসান গুনে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। একই তালিকায় রয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং খুলনা ওয়াসা।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অদৃশ্য ফাঁদ ‘সার্বভৌম গ্যারান্টি’

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর এই বিশাল লোকসান দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষত তৈরি করছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রতি বছর জাতীয় বাজেট থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি ও ঋণ দিতে হচ্ছে, যা সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় চরম চাপ সৃষ্টি করছে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে ‘সার্বভৌম গ্যারান্টি’ বা সোভারেন গ্যারান্টির কারণে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো দেশী-বিদেশী ব্যাংক থেকে যে বিপুল ঋণ নেয়, তার বিপরীতে সরকার গ্যারান্টি প্রদান করে। প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেই দায় সরাসরি সরকারের ওপর চাপে, যা রাজস্বের জন্য একটি বড় অদৃশ্য ঝুঁকি। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া ঋণ সময়মতো পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট তীব্র হচ্ছে। মেগা প্রজেক্টের জন্য নেওয়া বৈদেশিক ঋণ ও তার সুদ পরিশোধের সক্ষমতাও বর্তমান রিজার্ভ সংকটের কারণে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মত ও সমাধানের পথ

অর্থ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ এই সংকট প্রসঙ্গে বলেন, ‘লোকসানি চিনিকল বা পাটকল রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালনার কোনো অর্থনৈতিক যুক্তি নেই। এগুলো বন্ধ করে এদের মূল্যবান জমি অন্য লাভজনক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা উচিত। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানি (ওয়াসা), বিআরটিসি বা টিসিবির মতো জরুরি সেবা খাত সম্পূর্ণ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া আত্মঘাতী হবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের মূল কারণ ম্যানেজমেন্টের অদক্ষতা, আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।’ তিনি ডেসকোর উদাহরণ দিয়ে বলেন, কয়েক বছর আগেও ডেসকো পুঁজিবাজারের শীর্ষ কোম্পানি ছিল, কিন্তু পেশাদারদের সরিয়ে আমলা ও দলীয় লোকদের চেয়ারম্যান-এমডি নিয়োগ দেওয়ায় আজ প্রতিষ্ঠানটি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তাঁর মতে, সংকট সমাধানের পথ দুটি—বাণিজ্যিকভাবে অচল মিলগুলো বন্ধ করা এবং সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীন পেশাদারদের মাধ্যমে শতভাগ বাণিজ্যিক মডেলে পরিচালনা করা।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতি ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ক্রমাগত পতনের দিকে গেছে। একটি গতিশীল নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাইলে এই বিশাল আর্থিক বোঝা টেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। বিশ্বজুড়ে এমনকি পাকিস্তানেও রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার লোকসান ঠেকাতে বেসরকারীকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি খাত পারলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কেন লোকসান দেবে? গলদটা স্পষ্টতই ব্যবস্থাপনায়।’

অর্থ বিভাগ এই ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রথাগত অর্থনৈতিক মডেল পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছে। করের টাকার অপচয় বন্ধ করতে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেন ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় পূর্ণ স্বচ্ছতা আনা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিক নিয়মে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ৩৯২টি সরকারি সংস্থার মধ্যে ২৮৪টি সংস্থাই ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলে (এফআরসি) তাদের আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় স্বচ্ছতা ও নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...