সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১২:২০ পূর্বাহ্ন

বিমানের তহবিলে ধস বেতনে উৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেড বরাবরই নিজেদের লাভজনক প্রমাণ করতে কৃত্রিম মুনাফার খতিয়ান দেখায়। কিন্তু আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে তাদের পর্বতসম দেনার হিসাব। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি বকেয়া দেনা ঝুলিয়ে রেখে ৯৩৭ কোটি টাকার ‘কাগুজে’ মুনাফা ঘোষণা করেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিমানের নিজস্ব আয় বা রাজস্ব বাড়ার কোনো লক্ষণ না থাকলেও, দেশব্যাপী নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার মাঝেই হঠাৎ গত মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রায় ১৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে এর পরিচালনা পর্ষদ। বিশেষ করে চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীসহ শীর্ষ কর্তাদের বেতন একলাফে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়ায় ধুঁকতে থাকা এই সংস্থার ভেতর ও বাইরে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

চার মাসে গায়েব ২৪শ কোটি টাকা

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার মূল শর্ত হলো আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা ও লোকসান কমানো। তবে বিমান হাঁটছে সম্পূর্ণ আত্মঘাতী পথে। অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার সময় বিমানকে লাভজনক করতে না পারলেও প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকার একটি বড় আর্থিক তহবিল (ক্যাশ রিজার্ভ) রেখে গিয়েছিল। কিন্তু গত চার মাসে নতুন বিএনপি সরকারের আমলে সেই তহবিল এক-তৃতীয়াংশে নেমে মাত্র ১ হাজার ২০০ কোটি টাকায় ঠেকেছে।

তহবিল কমার বিষয়ে বিমান সূত্র জানায়, হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি করায় বায়না বাবদ ৪শ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। এছাড়া পুরনো কর (ট্যাক্স) বাবদ ৪শ কোটি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় চার মাসে ফুয়েলের পেছনে অতিরিক্ত ৩শ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। বাকি টাকা শীর্ষ কর্তাদের আকাশচুম্বী বেতন ও আনুষঙ্গিক বিলাসী খাতে ব্যয় হয়েছে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা বা আইকাও (ICAO) এর কঠোর নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো সংকটে একটি এয়ারলাইনসের তহবিলে অন্তত ৬ মাসের পরিচালন ব্যয় জমা থাকতে হয়। বর্তমান ফান্ডের যে রুগ্‌ণ অবস্থা, তাতে আগামীতে কোনো বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক সংকট এলে বিমানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

পে-স্কেলের ওপর বাড়তি বেতনের ডবল উৎসব

দেশজুড়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আগামী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই প্রক্রিয়ার মাঝেই গত ২০ মে বিমানের বলাকা ভবনের বোর্ডরুমে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা এক ধাক্কায় ১৮৫ শতাংশ বাড়ানোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। গত ২ জুন বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেন এই অফিস আদেশে স্বাক্ষর করেন। এর ফলে বিমানের কর্মীরা আগামী জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেলের সুবিধার পাশাপাশি গত মাসে বর্ধিত হওয়া ভাতাও একযোগে পাবেন, যা দ্বিগুণ উৎসবের শামিল।

বিমানের বর্তমান সাধারণ বেতন খাতেই প্রতি মাসে খরচ হয় ৪২ কোটি টাকা। নতুন করে ভাতা বাড়ানোর ফলে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়বে আরও ৮ কোটি টাকা, যা বছরে গিয়ে ১০০ কোটি টাকা ছাড়াবে। এর সঙ্গে যখন জুলাইয়ের নবম পে-স্কেলের আর্থিক দায় যুক্ত হবে, তখন বিমানের অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে চিন্তিত খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়।

বড় কর্তাদের বেতন কোটি টাকার অংকে

বিমানের সাধারণ কর্মীদের বেতন যেখানে দ্বিগুণ হয়েছে, সেখানে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা ও বেতন বাড়ানো হয়েছে কয়েকগুণ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক এমডি গৃহকর্মী নির্যাতনের দায়ে চাকরিচ্যুত হওয়ার আগে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা বেতন পেতেন। অথচ বর্তমান নতুন এমডি (সিইও) সবমিলিয়ে প্রতি মাসে ১৪ লাখ টাকা বেতন পাচ্ছেন (ট্যাক্স বাদে নিট ১০ লাখ টাকা)। একইভাবে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (ডিএমডি) মাসিক বেতন ধরা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। আগের চেয়ারম্যান যেখানে সম্মানী বাবদ মাত্র ১ লাখ টাকা পেতেন, সেখানে বর্তমান নতুন চেয়ারম্যানের মাসিক সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। ধুঁকতে থাকা একটি সংস্থায় বড় কর্তাদের পেছনে এমন রাজকীয় ব্যয় নিয়ে খোদ বিমানের ভেতরেই তৈরি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ।

হাতছাড়া হচ্ছে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও কার্গো রুট

বিমানের আয়ের প্রধান দুটি উৎসই এখন হাতছাড়া হওয়ার মুখে। প্রথমত, বিমানের সবচেয়ে লাভজনক খাত ছিল হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ‘গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং’। এই খাত থেকে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা নিশ্চিত রাজস্ব আয় হতো বিমানের। তবে দীর্ঘ অব্যবস্থাপনার কারণে এই কাজ এখন জাপানের একটি পেশাদার সংস্থার হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, ঢাকা-লন্ডন রুটের কার্গো বা পণ্য পরিবহন ছিল বিমানের অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশিরা এই রুটে বিপুল কার্গো পাঠাতেন। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মহলের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বিমানের কার্গো ব্যবসা পুরোপুরি ধস নেমেছে এবং এই ৬০০ কোটি টাকার বিশাল বাজার এখন বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর দখলে চলে গেছে। যদিও নতুন পরিচালনা বোর্ড এই কার্গো কেলেঙ্কারির তদন্ত শুরু করেছে, তবে হারিয়ে যাওয়া বাজার পুনরুদ্ধার করা বেশ কঠিন।

বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ

১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিমান মূলত একটি লোকসানি ও রাজনৈতিক প্রভাবপুষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। মাঝে ২০০৭ সালে একে সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানাধীন পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা হলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। ২০০৮ সালে বোয়িংয়ের সাথে ২১০ কোটি ডলারে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছিল, যা দেশে আসতে দীর্ঘ ১১ বছর লেগেছিল। বর্তমানে বিমানের বহরে ২৪টি আন্তর্জাতিক ও ৮টি অভ্যন্তরীণ রুট থাকলেও, জাতিসংঘের আইকাও শর্ত পূরণ করতে না পারায় ঐতিহ্যবাহী নিউ ইয়র্ক রুটটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এমনকি লোকসানের কারণে জাপানের নারিতা রুটটিও সম্প্রতি বন্ধ হয়ে গেছে।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমানের পরিচালনা বোর্ডের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম এই সংকট প্রসঙ্গে বলেন, “বিমানে পেশাদারিত্বের চরম অভাব রয়েছে। প্রতিটি নতুন সরকারই ক্ষমতায় এসে বিমানের বড় বড় চেয়ারগুলোতে নিজেদের রাজনৈতিক লোকদের বসায়। বড় পদগুলোতে যদি অ্যাভিয়েশন বা বিমান চলাচল খাতের অভিজ্ঞ পেশাদারদের না বসানো হয়, তবে রাজনৈতিক তদ্বিরে আসা লোকদের দিয়ে কখনোই বিমানের উন্নতি সম্ভব নয়। বিমানকে অবিলম্বে সম্পূর্ণ রাজনীতির বাইরে রাখতে হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ুক তাতে আপত্তি নেই, কিন্তু সংস্থার আয় না বাড়িয়ে এভাবে তহবিল খালি করে বেতন বাড়ানো কোনোভাবেই সমীচীন নয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সরকার নতুন আরও ৫০টি উড়োজাহাজ আনলেও বিমানের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।”

এই চরম আর্থিক বিশৃঙ্খলা ও তহবিল সংকটের বিষয়ে জানতে বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা এবং প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সাথে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। এমনকি বিমানের সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ ও মুখপাত্র বুসরা ইসলামও এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।


এ জাতীয় আরো খবর...