সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ০৪:০৮ অপরাহ্ন

ইটিসিতে কাজ করছে না ৭০% গাড়ির ট্যাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

দেশের সড়ক ও বড় বড় সেতুগুলোতে দ্রুত এবং ঝামেলাহীনভাবে টোল আদায়ের উদ্দেশ্যে ‘ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন’ (ইটিসি) পদ্ধতি চালু করা হলেও তা এখন বড় ধরনের প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত সংকটে পড়েছে। ইটিসি ব্যবস্থায় টোল দিতে অপরিহার্য রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (আরএফআইডি) ট্যাগ প্রায় ৭০ শতাংশ যানবাহনের ক্ষেত্রেই কাজ করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ইটিসি কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এমন চাঞ্চল্যকর দাবি করা হলেও, আরএফআইডি ট্যাগযুক্ত আধুনিক নম্বরপ্লেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দাবি করছে যে, অধিকাংশ গাড়ির ট্যাগই সচল রয়েছে। এই দুই রাষ্ট্রীয় সংস্থার পরস্পরবিরোধী অবস্থানে ভেস্তে যেতে বসেছে সরকারের ডিজিটাল টোল প্লাজা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য।

ইটিসি ও আরএফআইডি ট্যাগের কার্যকারিতা

সড়ক ও সেতুতে দ্রুত টোল পরিশোধের জন্য আধুনিক ইটিসি পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, যেখানে গাড়ির নম্বরপ্লেটে থাকা আরএফআইডি ট্যাগের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিড বা স্ক্যান করে টোল কেটে নেওয়া হয়। এই ট্যাগ কার্যকর না থাকলে ইটিসি ব্যবস্থা কোনোভাবেই গাড়ির তথ্য শনাক্ত করতে পারে না। ২০১২ সালে বিআরটিএ প্রথম যানবাহন ট্র্যাকিং, চুরি হওয়া গাড়ি শনাক্তকরণ এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার স্বপ্ন দেখিয়ে গাড়ির মালিকদের কাছ থেকে কয়েক হাজার টাকা ফি নিয়ে আরএফআইডি ট্যাগ ও ডিজিটাল নম্বরপ্লেট সংযোজন শুরু করে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত এক দশকেরও বেশি সময়ে এই বিশাল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো থেকে সাধারণ মানুষ বা রাষ্ট্র কোনো প্রত্যাশিত সুবিধাই পায়নি।

নথিতে বড় গোলমাল ও সচল ট্যাগের সঠিক হিসাব নেই

বিআরটিএর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৫৪ লাখ ৪২ হাজার ১৬০ সেট আরএফআইডি ট্যাগযুক্ত রেট্রো-রিফ্লেক্টিভ নম্বরপ্লেট প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৮ লাখ ৯৫ হাজার ১২৫ সেট নম্বরপ্লেট ইতোমধ্যে বিভিন্ন মোটরযানে সফলভাবে সংযোজন করা হয়েছে। এছাড়া শুরু থেকে চলতি বছরের ৩০শে মার্চ পর্যন্ত ২ লাখ ৭৫ হাজার ৫২৫টি সিঙ্গেল আরএফআইডি ট্যাগ প্রতিস্থাপনও করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে বিআরটিএর নিবন্ধিত ২০ শ্রেণির যানবাহনের মোট সংখ্যা প্রায় ৬৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৪৭টি। তবে এত বিশাল সংখ্যক গাড়িতে ট্যাগ লাগানো হলেও বর্তমানে ঠিক কতগুলো ট্যাগ সচল আর কতগুলো অকার্যকর, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান নেই বিআরটিএর কাছে।

সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো যানবাহন যখন বার্ষিক ফিটনেস নবায়নের জন্য আসে, কেবল তখনই ট্যাগ পরীক্ষা করা হয় এবং অকার্যকর হলে নতুন ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু দেশে যে বিপুল সংখ্যক যানবাহনের নিয়মিত ফিটনেস নবায়ন করা হয় না, সেগুলোর ট্যাগের বর্তমান অবস্থা বা কার্যকারিতা সম্পর্কে বিআরটিএ সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের রিপোর্টে ভয়াবহ চিত্র

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৬ থেকে ২২শে মে পর্যন্ত সাত দিনে সংস্থাটির ইটিসির আওতাধীন ১৫টি বড় সেতু ও সড়কের টোল প্লাজা দিয়ে মোট ৮ লাখ ৬১ হাজার ৪০২টি যানবাহন চলাচল করেছে। অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই বিশাল সংখ্যার মধ্যে মাত্র ২ লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫টি যানবাহনের আরএফআইডি ট্যাগ সফলভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে ইটিসি রিডার। অর্থাৎ, ডিজিটাল টোল প্লাজায় যানবাহন শনাক্তকরণের হার মাত্র ২৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ। বাকি ৭১ দশমিক ১৩ শতাংশ যানবাহনের আরএফআইডি ট্যাগ সম্পূর্ণ অকার্যকর বা রিড করতে ব্যর্থ হয়েছে।

সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “আমাদের সিস্টেম অ্যানালিস্টদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আরএফআইডি শনাক্তের হার বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। এই ট্যাগ সঠিকভাবে রিড না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল আদায় সম্ভব হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে গাড়ি থামিয়ে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে হাতে হাতে টোল আদায় করতে হচ্ছে। এতে ডিজিটাল টোল প্লাজা থাকার পরও টোল প্লাজাগুলোতে যানবাহনের অপেক্ষার সময় এবং তীব্র যানজট বেড়েই চলেছে।”

যমুনা সেতুতে ৮০ শতাংশ ট্যাগই অকার্যকর

অনুরূপ চিত্র দেখা যাচ্ছে সেতু বিভাগের আওতাধীন দেশের মেগা সেতুগুলোতেও। যমুনা সেতু সাইট অফিসের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেখানে যাতায়াত করা অধিকাংশ যানবাহনের ট্যাগই অকার্যকর পাওয়া যাচ্ছে, যার মধ্যে পণ্যবাহী ট্রাকের ক্ষেত্রে এই সমস্যা সবচেয়ে প্রকট। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, যমুনা সেতু ব্যবহারকারী মোট যানবাহনের প্রায় ৮০ শতাংশ ট্যাগই কোনো কাজ করছে না। তবে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ দাবি করেছেন, ইটিসিতে আরএফআইডি ট্যাগের সমস্যার বিষয়টি আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে এবং যাদের ট্যাগ কাজ করছে না, তাদের ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে টোল পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ট্যাগ অকার্যকর হওয়ার নেপথ্য কারণ ও ডিএমপির উদ্বেগ

বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিবিদদের মতে, ধুলাবালি, কাদা-পানি, বাতাসের আর্দ্রতা এবং দেশের অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে আরএফআইডি ট্যাগগুলো দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। গ্রীষ্মকালের অতিরিক্ত গরমে ট্যাগের বাইরের প্লাস্টিক আবরণ ও ভেতরের সংবেদনশীল মাইক্রো সার্কিট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া বর্ষাকালে পানি বা আর্দ্রতা প্রবেশ করলে শর্টসার্কিটের কারণে ট্যাগ নষ্ট হয়ে যায়। বিভিন্ন রাসায়নিক বা গাড়ির ধোঁয়ার সংস্পর্শেও ট্যাগের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অংশ স্থায়ীভাবে কার্যকারিতা হারায়।

গত ১১ই মে এক বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, অনেক যানবাহনে এখনো ডিজিটাল নম্বরপ্লেট ব্যবহার করা হচ্ছে না। আবার বহু গাড়ির আরএফআইডি ট্যাগ অকার্যকর থাকায় আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা পরিচালনায় তীব্র সমস্যা হচ্ছে। ডিএমপির পক্ষ থেকে দ্রুত প্রতিটি গাড়িতে কার্যকর আরএফআইডি ট্যাগ নিশ্চিত করার জোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এই বিষয়ে বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, “বিগত দুই বছর ধরে শতভাগ গাড়ির আরএফআইডি ট্যাগ নিশ্চিত করা হচ্ছে। ফিটনেস যাচাইয়ের সময় এগুলো পরীক্ষা করা হয়। সেই হিসাবে প্রায় ৯০ শতাংশ গাড়ির ট্যাগ সচল থাকার কথা।”

বিআরটিএর সমন্বয়ের অভাব ও বুয়েট অধ্যাপকের সমালোচনা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট পরিবহন বিশেষজ্ঞ শামসুল হক এই অব্যবস্থাপনার জন্য সরাসরি বিআরটিএকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, “বিআরটিএ যখন গাড়ির মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে প্রথম ডিজিটাল নম্বরপ্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ প্রদান করেছিল, তখন অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ডেটাবেইসে গাড়ির মালিকের নাম, রঙ, ফিটনেস ও রুট পারমিটের তথ্য থাকবে এবং মেয়াদ শেষ হলে স্বয়ংক্রিয় এসএমএস চলে যাবে। কিন্তু এত বছরেও সেই সুবিধাগুলো সাধারণ মানুষ পায়নি। যানবাহনে আরএফআইডি ট্যাগ বা অবকাঠামো থাকলেও তা পরিচালনার জন্য দেশজুড়ে প্রয়োজনীয় রিডার স্টেশন এবং কেন্দ্রীয় সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বিআরটিএ।” ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল পেতে হলে এই প্রযুক্তিগত ফাঁকফোকর দ্রুত বন্ধ করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।


এ জাতীয় আরো খবর...