ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির বাজারে দেশের লাখো মধ্যবিত্ত পরিবার, অসহায় বিধবা, গৃহিণী এবং অর্ধকোটিরও বেশি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও পেনশনভোগীদের আয়ের প্রধান উৎসে বড় আঘাত হেনেছে সরকার। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর বিদ্যমান করের হার এক লাফে দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে সঞ্চয়পত্রে জীবনের শেষ সম্বলটুকু বিনিয়োগ করে সংসার চালানো সাধারণ মানুষের হাতে আগের তুলনায় অনেক কম অর্থ পৌঁছাবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী, তখন সরকারের এই সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ওপর এক নিষ্ঠুর ও অসহনীয় চাপ তৈরি করবে।
জাতীয় সংসদে গত বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী কর্তৃক উত্থাপিত নতুন অর্থবছরের অর্থবিলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর অগ্রিম করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ১০ শতাংশ করার এই বিতর্কিত প্রস্তাব করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানিয়েছে, অর্থবিল ২০২৬-এর মাধ্যমে ২০২৩ সালের আয়কর আইনের অত্যন্ত সংবেদনশীল ১৬৩ নম্বর ধারাটি সংশোধন করা হয়েছে। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে এতকাল ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখা হতো এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ও আইনি জটিলতা এড়াতে সেটাকেই ওই মুনাফার ‘চূড়ান্ত কর দায়’ (Final Tax Liability) হিসেবে গণ্য করা হতো। অর্থাৎ, একবার কর কাটার পর বিনিয়োগকারীকে আর কোনো আইনি ঝামেলায় পড়তে হতো না।
তবে নতুন সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, এই সহজ ব্যবস্থাটি পুরোপুরি বিলুপ্ত করা হচ্ছে। এখন থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা উত্তোলনের সময় দ্বিগুণ অর্থাৎ ১০ শতাংশ কর কেটে রাখা হবে এবং সংগৃহীত এই অর্থকে কেবল ‘অগ্রিম কর’ (Advance Tax) হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, পরবর্তীতে বার্ষিক আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় যদি দেখা যায় যে, কেটে নেওয়া করের পরিমাণ ওই ব্যক্তির প্রকৃত কর দায়ের চেয়ে বেশি হয়েছে, তবে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত বা রিফান্ডের জন্য আবেদন করা যাবে। করদাতাকে নিজস্ব ব্যাংক হিসাব নম্বরসহ আবেদন করার পর এনবিআর যাচাই-বাছাই শেষে ১২০ দিনের মধ্যে সেই টাকা ফেরত দেবে বলে আইনি বিধানে বলা হয়েছে।
যদিও বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার দাবি করেছেন যে, এবারের বাজেটে সঞ্চয়পত্র নিয়ে নতুন বা ক্ষতিকর কিছুই করা হয়নি; তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সঞ্চয়পত্র ক্রেতা ও সাবেক একজন সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, “বাস্তবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারী বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ বা গৃহিণী আদতে করদাতা নন। তাঁদের অনেকের কোনো কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নেই এবং তাঁরা নিয়মিত আয়কর রিটার্নও জমা দেন না। ফলে আইনি জটিলতার কারণে অতিরিক্ত কেটে নেওয়া করের টাকা সরকারের কাছ থেকে ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকলেও, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পক্ষে সেই জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রিফান্ড সুবিধা নেওয়া অসম্ভব হবে।”
তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, “সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর করের হার দ্বিগুণ হওয়ায় মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বহুগুণ বাড়বে। দেশের মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ মাসের পর মাস সংসার চালানোর খরচ ও ওষুধের পয়সার জন্য এই সঞ্চয়পত্রের মাসিক মুনাফার ওপর ১০০ ভাগ নির্ভরশীল। সরকারের নীতিনির্ধারকদের এই নির্মম বাস্তব সত্যটা অনুধাবন করা উচিত ছিল।”
বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে মূলত চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে—পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। এসব সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ ও শ্রেণিভেদে মুনাফার হার ১১.৭৭ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১১.৯৮ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর রয়েছে।
ব্যাংক এবং এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী কর বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের পকেট যেভাবে খালি হবে, তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:
বিনিয়োগের ধরন: পরিবার সঞ্চয়পত্র (ধরা যাক, সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ)।
বর্তমান মুনাফার হার: ১১.৯৩ শতাংশ।
প্রতি এক লাখ টাকায় মাসিক মোট মুনাফা: প্রায় ৯৯৪ টাকা।
আগের নিয়মে (৫% কর কাটার পর): বিনিয়োগকারী প্রতি মাসে হাতে পেতেন প্রায় ৯৪৫ টাকা।
নতুন নিয়মে (১০% কর কাটার পর): বিনিয়োগকারীর হাতে আসবে মাত্র ৮৯৪ টাকা।
অর্থাৎ, প্রতি এক লাখ টাকায় একজন সাধারণ মানুষ প্রতি মাসে সরাসরি ৫০ টাকারও বেশি মুনাফা হারাবেন। পাঁচ বা ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা একটি পরিবারের মাসিক আয় এক ধাক্কায় কয়েক হাজার টাকা কমে যাবে। নির্দিষ্ট আয়ের এই মানুষগুলোর জীবনযাত্রার মান এর ফলে আরও নিচে নেমে যাবে। দেশের ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মধ্যবিত্তের শেষ আশ্রয়স্থল সঞ্চয়পত্রের ওপর এমন করের বোঝা চাপানো কোনোভাবেই কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট