শিরোনামঃ
২৪ হয়েছিল বলেই ২৬ সালে নির্বাচন হয়েছে: ডা. শফিকুর রহমান আ. লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে কোনো শঙ্কা নেই: ডিএমপি ক্যাপসুল সংকটে ১৪ মাস ধরে বন্ধ ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন এআই কোম্পানি বেচে রাতারাতি বিলিয়নিয়ার ভারত ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত দুই তরুণ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের নিরাপত্তা সংকট জিটিএ ৬-এর প্রি-অর্ডারের তারিখ ও অফিশিয়াল কভার আর্ট প্রকাশ করল রকস্টার গেমস মুতা বিয়ে কি জায়েজ? বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিন মোতায়েন করছে পাকিস্তান: উদ্বিগ্ন ভারত এক আঘাতে দুই শান্তিচুক্তি ভেঙে দিতে চান নেতানিয়াহু নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ: যে চাপে ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে বাধ্য হলেন ট্রাম্প
শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ০৩:৫৫ অপরাহ্ন

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ: যে চাপে ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে বাধ্য হলেন ট্রাম্প

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬
trump

মাত্র ১৫ সপ্তাহ আগেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে একেবারে কঠোর ও আপসহীন অবস্থানে ছিলেন। তেহরানের প্রতি তাঁর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি ছিল—‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা চুক্তি নয়। কিন্তু গত বুধবার (১৭ জুন) যখন দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ মেমোর্যান্ডম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (ইসলামাবাদ এমওইউ)’-এর বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে এলো, তখন দেখা গেল বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। চুক্তিটি কোনোভাবেই তেহরানের আত্মসমর্পণের দলিল নয়; বরং এটি দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ইরানের জন্য বেশ কিছু কৌশলগত ও সুবিধাজনক ব্যবস্থার পথ খুলে দিয়েছে। মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক বিশেষ বিশ্লেষণে ট্রাম্পের এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তনের পেছনের বাধ্যবাধকতা ও রাজনৈতিক চাপগুলো উন্মোচিত হয়েছে।

তেহরানের বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিজয়

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই চুক্তির ফলে তেহরান বিশ্ববাজারে পুনরায় অবাধে তেল রপ্তানির বড় সুযোগ ফিরে পেয়েছে। এর মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যাওয়া শত শত কোটি ডলারের আয়ের পথ নিশ্চিতভাবে খুলে যাওয়ায়, তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরানি সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ অনেকাংশে কমে যাবে। অথচ যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন—ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা এবং তেহরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোই তাঁর মূল লক্ষ্য। বাস্তবে এর কোনোটিই পূরণ হয়নি। উল্টো ইরান মার্কিন নৌ-অবরোধ ও সামরিক হামলা মোকাবিলা করে শেষ পর্যন্ত টিকে থেকে একটি উদযাপনযোগ্য কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে।

ট্রাম্প এখন দাবি করছেন, এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মাধ্যমে আগামী ১৫-২০ বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতা ও চরম দর-কষাকষির ওপর ভিত্তি করে রাজনীতি করা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষে এমন নমনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া রীতিমতো বিস্ময়কর। সমঝোতার শর্তানুযায়ী, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’র ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ইঙ্গিত রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

ওবামা আমলের নীতির পুনরাবৃত্তি ও অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ

চুক্তির সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ হলো ইরানের জব্দকৃত বিশাল অর্থ ও সম্পদ ফেরত দেওয়ার রাস্তা উন্মুক্ত হওয়া। ট্রাম্প গণমাধ্যমকে বলেছেন, এটি কেবল ইরানের ‘ভালো আচরণের’ বিনিময়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সমালোচকরা ট্রাম্পের এই যুক্তিকে সরাসরি নাকচ করে বলছেন, এটি অনেকটাই ২০১৫ সালে বারাক ওবামার দেওয়া সেই ‘জেসিপিওএ’ (JCPOA) চুক্তির মতো ছাড়, যার তীব্র বিরোধিতা করে ট্রাম্প নিজে প্রথম মেয়াদে মার্কিন ক্ষমতায় এসেছিলেন এবং সেটিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক চুক্তি’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

স্বভাবতই, ট্রাম্পের এই আকস্মিক ইউ-টার্নে ক্ষুব্ধ রিপাবলিকান দলের কট্টরপন্থী অংশ এবং ইসরায়েলের চরম ডানপন্থী নেতানিয়াহু সরকার। ইসরায়েল ইতিমধ্যে এই চুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতা শুরু করেছে। তারা মনে করছে, এই সমঝোতার ফলে লেবাননে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং ইরান পুনরায় মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রক্সি নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে।

‘হার্বার্ট হুভার’ হওয়ার ঐতিহাসিক আতঙ্ক

তাহলে ট্রাম্প কেন এমন চুক্তি করলেন? এর জবাবে নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, ট্রাম্প নিজেই সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছেন যে, তিনি ইতিহাসে নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের ৩১তম প্রেসিডেন্ট ‘হার্বার্ট হুভার’-এর মতো দেখতে চাননি, যাঁর মেয়াদে আমেরিকার অর্থনীতিতে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ‘মহামন্দা’ (Great Depression) শুরু হয়েছিল।

চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছিল এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠছিল। ট্রাম্পের আশঙ্কা ছিল, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মার্কিন তথা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসত, যা তাঁর অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তায় ধস নামাত। ইরান সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থে পাল্টা আঘাত হেনে আমেরিকার ওপর এই মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চাপটি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল।

শক্তিশালী অবস্থানে তেহরান, ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ ধোঁয়াশা

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করছেন, তিনি ইরানকে উত্তর কোরিয়ার মতো অনিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক শক্তি হওয়ার পথ থেকে রুখে দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপট বলছে, চুক্তিটি মূলত পারমাণবিক ইস্যুতে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও অন্তহীন আলোচনার পথ তৈরি করেছে মাত্র, যা আগামী ৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।

বিগত কয়েক মাসের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে, প্রাণ গেছে ১৩ জন মার্কিন সেনার এবং ৩ বা তারও বেশি হাজার ইরানি নাগরিকের। কিন্তু সব হিসাব-নিকাশ শেষে দেখা যাচ্ছে, ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল বা পঙ্গু হওয়া তো দূরের কথা, তারা আগের চেয়েও রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল ও আন্তর্জাতিক টেবিলে শক্তিশালী অবস্থানে চলে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ঘরোয়া রাজনীতিতে এটিকে কতটা বড় ‘বিজয়’ হিসেবে সাধারণ মার্কিন ভোটারদের কাছে বিক্রি করতে পারবেন, তা নিয়ে খোদ হোয়াইট হাউসের অন্দরেই এখন গভীর ধোঁয়াশা রয়েছে।


এ জাতীয় আরো খবর...