শিরোনামঃ
২৪ হয়েছিল বলেই ২৬ সালে নির্বাচন হয়েছে: ডা. শফিকুর রহমান আ. লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে কোনো শঙ্কা নেই: ডিএমপি ক্যাপসুল সংকটে ১৪ মাস ধরে বন্ধ ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন এআই কোম্পানি বেচে রাতারাতি বিলিয়নিয়ার ভারত ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত দুই তরুণ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের নিরাপত্তা সংকট জিটিএ ৬-এর প্রি-অর্ডারের তারিখ ও অফিশিয়াল কভার আর্ট প্রকাশ করল রকস্টার গেমস মুতা বিয়ে কি জায়েজ? বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিন মোতায়েন করছে পাকিস্তান: উদ্বিগ্ন ভারত এক আঘাতে দুই শান্তিচুক্তি ভেঙে দিতে চান নেতানিয়াহু নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ: যে চাপে ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে বাধ্য হলেন ট্রাম্প
শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ০৩:৪২ অপরাহ্ন

বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিন মোতায়েন করছে পাকিস্তান: উদ্বিগ্ন ভারত

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী স্মৃতিবিজড়িত বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘ পাঁচ দশক পর আবারও সামরিক উপস্থিতি জোরদার করার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে পাকিস্তান। ভারতের একাধিক মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রতিরক্ষাভিত্তিক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হওয়া সম্পূর্ণ নতুন এবং অত্যাধুনিক ‘হাঙ্গর’ শ্রেণির সাবমেরিনগুলো এখন দূরবর্তী বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘমেয়াদি অপারেশনাল সক্ষমতা ও সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রাখার প্রযুক্তিগত যোগ্যতা অর্জন করেছে। আঞ্চলিক জলসীমায় পাকিস্তানের এই সম্ভাব্য রণকৌশল ভারতের সামরিক নীতিনির্ধারক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র কৌশলগত অস্বস্তি ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

করাচিতে পৌঁছেছে চীনের তৈরি ‘হাঙ্গর’

ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-এর বিশেষ তথ্যমতে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে চীনে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশনপ্রাপ্ত হাঙ্গর শ্রেণির প্রথম সাবমেরিনটি সফল সমুদ্র মহড়া শেষ করে গত সপ্তাহে পাকিস্তানের করাচি নৌঘাঁটিতে এসে পৌঁছেছে। পাকিস্তান নৌবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদ এখন তাদের প্রথাগত আরব সাগরের গণ্ডি পেরিয়ে ভারত মহাসাগর এবং বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের গভীর জলসীমায় নিজস্ব যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের অপারেশনাল পরিধি বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। পাকিস্তান নৌবাহিনীর সাবমেরিন বহরের কমান্ডার কমোডর ওমর ফারুক আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, পাকিস্তান তাদের নৌবহরে এই উন্নত প্রযুক্তির মোট আটটি ‘হাঙ্গর’ শ্রেণির সাবমেরিন অন্তর্ভুক্ত করার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, যার একটি বড় অংশ বঙ্গোপসাগরে নিয়মিত টহল ও অবস্থান নিশ্চিত করার কাজে নিয়োজিত থাকবে।

চীন থেকে দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে পাকিস্তানে ফেরার পথে শ্রীলঙ্কার কৌশলগত কলম্বো বন্দরে পাকিস্তানের গাইডেড-মিসাইল ফ্রিগেট ‘পিএনএস তৈমুর’-এ একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত বিদেশি কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের সামনে কমোডর ওমর ফারুক এই নতুন সাবমেরিনটিকে পাকিস্তান নৌবাহিনীর জন্য একটি বড় ‘গেম চেঞ্জার’ (Game Changer) হিসেবে অভিহিত করেন। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, কলম্বো বন্দরের মাটিতে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি কমান্ডারের এই বক্তব্য স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ইসলামাবাদ এখন আর কেবল নিজেদের উপকূলীয় এবং আরব সাগরের প্রতিরক্ষামূলক গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে রাজি নয়। ভারত মহাসাগর ও দূরবর্তী বঙ্গোপসাগরে নিজেদের বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতির মাধ্যমে পাকিস্তান নৌবাহিনী আন্তর্জাতিক জলসীমার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথগুলোতে ভারতের একচেটিয়া আধিপত্যের সরাসরি মুখোমুখি হতে আগ্রহী।

সাবমেরিন ‘হাঙ্গর’ এবং ‘খুকরি’ ডুবিয়ে দেওয়ার ইতিহাস

পাকিস্তানের এই নতুন যুদ্ধকৌশলকে কেন্দ্র করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ১৯৭১ সালের নৌযুদ্ধের এক নির্মম ও ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি স্মরণ করিয়ে দিয়ে নিজেদের বাহিনীকে সতর্ক করছে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন পাকিস্তানি ডাফনে শ্রেণির সাবমেরিন ‘পিএনএস হাঙ্গর’ আরব সাগরে জলরাশিতে এক অতর্কিত টর্পেডো হামলা চালিয়ে ভারতের মূল যুদ্ধজাহাজ ‘আইএনএস খুকরি’ (INS Khukri)-কে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব নৌযুদ্ধের ইতিহাসে সেটিই ছিল সাবমেরিন দিয়ে কোনো যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করার প্রথম ঘটনা, যেখানে ভারতের ১৮ অফিসারসহ প্রায় ১৭৬ জন নৌসেনা নিহত হয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক ‘পিএনএস হাঙ্গর’-এর নামানুসারেই চীন ও পাকিস্তানের এই যৌথ প্রজেক্টের নতুন আটটি অত্যাধুনিক সাবমেরিনের নামকরণ করা হয়েছে ‘হাঙ্গর ক্লাস’, যা ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের জন্য মনস্তাত্ত্বিকভাবেও এক বড় ধরনের সতর্কবার্তা।

বদলে যাবে কি বঙ্গোপসাগরের সামরিক ভারসাম্য?

বিগত পাঁচ দশকে ভারত ও পাকিস্তানের নৌবাহিনীর শক্তির ব্যবধান আকাশ-পাতাল রূপ নিয়েছে। ভারতীয় নৌবাহিনী বর্তমানে নিজেদের অভাবনীয় সামরিক আধুনিকায়নের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই মুহূর্তে ভারতের হাতে রয়েছে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি পরমাণু শক্তিচালিত ব্যালিস্টিক মিডাইল সাবমেরিন (SSBN), দুটি বিশালাকার সক্রিয় বিমানবাহী রণতরী (আইএনএস বিক্রান্ত ও আইএনএস বিক্রমাদিত্য) এবং গভীর সমুদ্রে নজরদারি করার জন্য আমেরিকার তৈরি সর্বাধুনিক পি-৮আই (P-8I) সাবমেরিন বিধ্বংসী যুদ্ধবিমান।

ভারতের শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও স্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই নতুন হাঙ্গর শ্রেণির সাবমেরিন মোতায়েনের সিদ্ধান্ত বঙ্গোপসাগরে ভারতের বিদ্যমান একচ্ছত্র সামরিক ভারসাম্যকে রাতারাতি হয়তো উল্টে দিতে পারবে না। কারণ ভারতের প্রযুক্তিগত ও ভৌগোলিক সুবিধা অনেক বেশি। তবে এই সাবমেরিনগুলো অত্যন্ত শান্ত ও শব্দহীনভাবে গভীর সমুদ্রে দীর্ঘ সময় ডুবে থাকতে সক্ষম (AIP প্রযুক্তিসম্পন্ন)। ফলে বঙ্গোপসাগরের মতো সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য রুটে এবং ভারতের পূর্ব উপকূলের নৌঘাঁটিগুলোর অদূরে এই সাবমেরিনের নিয়মিত উপস্থিতি ভারতের কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সার্বিক নজরদারি ব্যবস্থাকে এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অস্বস্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যকার নৌ-কৌশলগত এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আগামী দিনে এক নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রায় রূপ নিতে যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক


এ জাতীয় আরো খবর...