রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন

সিটি গ্রুপকে রক্ষায় ৩৬ ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখতে এবং বিশাল অংকের খেলাপি ঋণের ধাক্কা সামলাতে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপকে যৌথভাবে বড় ধরনের নীতিগত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশি-বিদেশি ৩৬টি ব্যাংক। বর্তমানে চরম ডলার সংকট, চলতি মূলধনের অভাব এবং অবকাঠামোগত স্থবিরতার কারণে তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছে পাঁচ দশকের পুরোনো এই জায়ান্ট করপোরেট প্রতিষ্ঠানটি। মূলত সিটি গ্রুপের প্রায় ২৬,৬০০ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া ঋণ পুনর্গঠন করার উদ্দেশ্যে এবং দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের প্রভিশনিং বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির বাড়তি চাপ এড়াতে ব্যাংকগুলো এই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই লক্ষ্যে রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা এই যৌথ উদ্ধার পরিকল্পনার চূড়ান্ত রোডম্যাপ ও ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে একটি বিশেষ বৈঠকে বসেন।

ব্যংকিং খাতের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, সিটি গ্রুপের বকেয়া এই বিশাল পরিমাণ ঋণ এখনো শ্রেণীকৃত বা খেলাপি করা হয়নি। তবে গ্রুপটির উৎপাদন ও আমদানি সচল না হলে এই বিশাল ঋণ যেকোনো মুহূর্তে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশের অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানে এই গ্রুপের ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক; এর বার্ষিক আয় প্রায় ৩২,০০০ কোটি টাকা এবং এখানে সরাসরি ২৫,০০০ কর্মী কর্মরত আছেন। ফলে, কোনো একটি ব্যাংক এককভাবে ব্যবস্থা না নিয়ে সফলতার সম্ভাবনা বাড়াতে সব ব্যাংক একসাথে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিন্ডিকেটেড পুনর্গঠন কাঠামোকে আইনগত ভিত্তি দিতে এবং ব্যাংকগুলোর ঋণের সুরক্ষায় আগামী ডিসেম্বর বা তার পরবর্তী সময় পর্যন্ত এই ঋণগুলোকে খেলাপি না করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে বিশেষ নীতিগত অনুমোদন বা ছাড় চাওয়া হবে।

এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, সিটি গ্রুপের ব্যবসায়িক অর্থপ্রবাহ এবং বিক্রির টাকার ওপর সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে একটি বৈশ্বিক মডেল অনুসরণ করা হবে। যদি ৩৬টি ব্যাংকই একমত হয়, তবে সিটি গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদে (বোর্ড) ব্যাংকগুলোর মনোনীত দুই বা তিনজন প্রতিনিধি স্থায়ীভাবে বসবেন। পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হবে একটি যৌথ ‘এসক্রো অ্যাকাউন্ট’ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ওয়াটারফল মেকানিজম’ (Waterfall Mechanism)-এর মাধ্যমে। এই নিয়ম অনুযায়ী, সিটি গ্রুপের সমস্ত ক্যাশ ফ্লো বা পণ্য বিক্রির টাকা সরাসরি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থাকা ওই কেন্দ্রীয় এসক্রো অ্যাকাউন্টে জমা হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি গ্রুপটি বাজারে ১০০ টাকার পণ্য বিক্রি করে, তবে সেই পুরো টাকা আগে এসক্রো অ্যাকাউন্টে আসবে। সেখান থেকে ৮০ টাকা সিটি গ্রুপকে তাদের প্রতিদিনের কারখানা চালানো ও কাঁচামাল কেনার জন্য ‘চলতি মূলধন’ হিসেবে ফেরত দেওয়া হবে এবং বাকি ২০ টাকা ব্যাংকগুলোর বকেয়া ঋণ পরিশোধের জন্য কেটে রাখা হবে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের বিশেষ মধ্যস্থতায় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নীতিগত সম্মতিতে এই সমন্বিত উদ্ধার পরিকল্পনাটি আলোর মুখ দেখছে। তবে এই কৌশলগত রোডম্যাপের অধীনে ব্যাংকগুলো সিটি গ্রুপের কিছু কঠিন শর্ত ও সংস্কারও জুড়ে দিচ্ছে। গ্রুপটির ব্যালেন্স শিটের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এবং কোনো আয় বা রিটার্ন না দেওয়া ‘নন-কোর’ (মূল ব্যবসার বাইরের) সম্পদ ও জমি দ্রুত বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এমনকি গ্রুপটির মালিকানাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইকোনমিক জোন) এবং হাই-টেক পার্ক প্রকল্পগুলোও বিক্রি করার জন্য ক্রেতা খোঁজা হবে। বাংলাদেশে এটিই প্রথম ঘটনা যেখানে কোনো সংকটাপন্ন বড় করপোরেট অ্যাকাউন্টকে এসক্রো অ্যাকাউন্ট এবং ব্যাংকগুলোর সরাসরি বোর্ড তদারকির মাধ্যমে যৌথভাবে বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সিটি গ্রুপের এই নজিরবিহীন আর্থিক সংকটের সূত্রপাত মূলত ২০২৩ সালে এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের মৃত্যুর পর থেকে। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণের পর শক্তিশালী এই গ্রুপের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় একক ও দক্ষ নিয়ন্ত্রণের কিছুটা অভাব দেখা দেয়। একই সময়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একীভূতকরণ (মার্জার) ও তারল্য সংকটের কারণে এক্সিম ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক এবং আল-আরাফাহ ব্যাংকের মতো বড় বড় ব্যাংকগুলো সিটি গ্রুপকে নতুন করে চলতি মূলধন জোগাতে অপারগতা প্রকাশ করে। এর আগে গ্রুপটি এই ব্যাংকগুলোকে বড় অংকের টাকা ফেরত দিলেও ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলো থেকে আগের মতো ক্রেডিট সুবিধা পাওয়া কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামী ব্যাংকের সাথে থাকা গ্রুপটির ১,৪০০ কোটি টাকার রিভলভিং ক্রেডিট সুবিধা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। তদুপরি, বৈশ্বিক বাজারে টাকার তীব্র অবমূল্যায়নের কারণে সিটি গ্রুপ গত দুই বছরে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রার লোকসান দেয়, যা তাদের এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার সীমা ও ক্রয়ক্ষমতাকে নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেয়।

গ্রুপটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসানের তথ্যমতে, ২০২২ সালে যখন ডলারের বিনিময় হার ৮৫ টাকা ছিল, তখন ব্যাংকগুলোতে থাকা তাদের ২৫,০০০ কোটি টাকার ঋণ সীমার আন্তর্জাতিক ক্রয়ক্ষমতা ছিল প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। কিন্তু বর্তমানে ডলারের দর ১২৫ টাকায় গিয়ে ঠেকায় সেই একই সীমার ক্রয়ক্ষমতা কমে দাঁড়িয়েছে ২১০ কোটি ডলারে। অর্থাৎ, গ্রুপটি রাতারাতি প্রায় ৯০ কোটি (৯০০ মিলিয়ন) ডলারের আমদানি সক্ষমতা হারিয়েছে। পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে যখন দেশের ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার কারণে বিদেশি সরবরাহকারী এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের কিছু নির্দিষ্ট ব্যাংকের ইস্যু করা এলসি ও গ্যারান্টি গ্রহণ করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানায়। এর ফলে কাগজে-কলমে ঋণ সুবিধা থাকলেও বাস্তবে সিটি গ্রুপ কাঁচামাল আমদানি করতে পারছিল না, যার কারণে তাদের সামগ্রিক বিক্রি স্বাভাবিকের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশের নিচে নেমে আসে। বিকল্প অর্থায়নের জন্য গ্রুপটি ১,৩০০ কোটি টাকার জিরো-কুপন বন্ড ছাড়ার আবেদন করলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা অনুমোদন পেতেই দীর্ঘ ১৪ মাস সময় লেগে যায়। ততদিনে বাজারের সুদের হার ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশে উঠে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবসার জন্য সেই বন্ডের অর্থায়ন আর টেকসই থাকেনি।

এই আর্থিক সংকটের আগুনে ঘি ঢেলেছে মুন্সীগঞ্জে গ্রুপটির অর্থনৈতিক অঞ্চলে তৈরি হওয়া ছয়টি বিশাল শিল্প প্রকল্পের গ্যাস সংযোগের দীর্ঘসূত্রতা। গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত কিন্তু অলস পড়ে থাকা এই প্রকল্পগুলোর বিপরীতে ব্যাংক ঋণের সুদ, স্থায়ী খরচ, শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেলাতে গিয়ে সিটি গ্রুপকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। অথচ এই গ্যাস পাইপলাইন ও অবকাঠামো দ্রুত নির্মাণ করতে গ্রুপটি নিজস্ব তহবিল থেকে বিপুল বিনিয়োগ করার পাশাপাশি ১৫০ কোটি টাকা সিকিউরিটি ডিপোজিটও জমা দিয়েছিল। এর ওপর নীতিগত অসঙ্গতি হিসেবে, চিনি, ভোজ্যতেল, সিমেন্ট এবং স্টিলের মতো খাতগুলোকে পরবর্তীতে ট্যাক্স হলিডে বা কর অবকাশ সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া হয়, যা যুক্তরাজ্যের যৌথ অংশীদার ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চরম হতাশ করেছে এবং তারা এখন এদেশ থেকে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের (এক্সিট অপশন) চিন্তা করছে।

সিটি গ্রুপের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার মতে, কারখানাগুলো সচল রাখা ছাড়া শুধু ঋণ পুনর্গঠন করে এই সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ নির্ভরযোগ্য জ্বালানি (গ্যাস) সরবরাহ এবং পর্যাপ্ত চলতি মূলধন সহায়তা না পেলে কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই ব্যাংকের দেনা পরিশোধ করা অসম্ভব। যদি সিটি গ্রুপের মতো দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের সরবরাহকারী শিল্পগোষ্ঠী দেউলিয়া বা খেলাপি হয়ে যায়, তবে তার চেইন রিঅ্যাকশন বা নেতিবাচক প্রভাব কেবল এই কোম্পানির ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি পুরো বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের তারল্য, আন্তর্জাতিক সুনাম এবং দেশের সামগ্রিক ‘সোভেরেন রিস্ক’ বা সার্বভৌম ঝুঁকিকে আন্তর্জাতিক রেটিংয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। দেশের ঝুঁকি বাড়লে বিদেশি ঋণদাতা ও সরবরাহকারীরা ভবিষ্যতে যেকোনো আমদানির বিপরীতে উচ্চ প্রিমিয়াম দাবি করবে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে সাধারণ ভোক্তাদের চড়া মূল্যে পণ্য কিনে।

তথ্যসূত্র: দ্যা বিজনেস সট্যান্ডার্ড


এ জাতীয় আরো খবর...