সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ন

মানবপাচার থেকে রেহাই পেলেও প্রতারণার মামলায় রিক্রুটিং সিন্ডিকেট

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

দেশের জনশক্তি রফতানি ও রেমিট্যান্স খাতকে চরমভাবে নাড়িয়ে দেওয়া বহুল আলোচিত ‘মালয়েশিয়া শ্রমবাজার সিন্ডিকেট’ মামলার তদন্তে এক নাটকীয় ও চাঞ্চল্যকর মোড় এসেছে। সাবেক প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী, সাবেক শীর্ষ আমলা এবং শতাধিক প্রভাবশালী রিক্রুটিং ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দায়ের করা এই হাই-প্রোফাইল মামলায় আন্তর্জাতিক মানবপাচারের গুরুতর অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত আইনি প্রমাণ পায়নি বলে আদালতকে জানিয়েছে পুলিশ। ফলে ২০১২ সালের মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের মূল ধারাগুলো থেকে আসামিদের পূর্ণ অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত রাঘববোয়ালদের রেহাই মিলছে না পুরোপুরি; সাধারণ কর্মীদের সাথে ভয়ংকর প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, জিম্মি করে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিশাল আর্থিক ক্ষতিসাধনের অভিযোগে দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) একাধিক কঠিন ফৌজদারি ধারা মামলায় বহাল রেখে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। গত ২২ মে, ২০২৬ তারিখে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিএমপির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের সোশ্যাল মিডিয়া ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের এসআই মো: রায়হানুর রহমান ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারামতে এই সম্পূরক চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে দাখিল করেন। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে চলা এই তদন্তের সমাপ্তি প্রতিবেদনটি দেশের অভিবাসন খাত এবং আইনি মহলে নতুন করে এক বিশাল ঝড় ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ডিএমপির পল্টন থানায় আফিয়া ওভারসিজের স্বত্বাধিকারী আলতাব খান বাদি হয়ে ১নং আসামি সাবেক প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমেদ এবং ২নং আসামি সাবেক সিনিয়র সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীনসহ ১০৩ জনের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করেন। অভিযোগের মূল ভিত্তি ছিল—মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে একটি শক্তিশালী ‘মহাসিন্ডিকেট’ তৈরি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া, বিদেশে জিম্মি করা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় আদায় করা এবং পরবর্তীতে ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মানবপাচার করে কর্মীদের চরম শোষণ ও নির্যাতনের মুখে ফেলা। অভিযুক্তদের তালিকায় সাবেক মন্ত্রী ও সিনিয়র সচিব ছাড়াও রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য লে. জেনারেল (অব:) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (৫এম ইন্টারন্যাশনাল), মো: রুহুল আমীন ওরফে স্বপন (ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল), সাবেক এমপি বেনজীর আহমেদ (আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল) এবং ফেনীর সাবেক বিতর্কিত এমপি মো: নিজাম উদ্দিন হাজারী (সিংঙা ওভারসিজ)। এ ছাড়াও দেশের শীর্ষস্থানীয় রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের মধ্যে মোহাম্মদ নূর আলী (ইউনিক ইস্টার্ন), নাফিসা কামাল ও কাশমিরি কামাল (অরবিটালস ইন্টারন্যাশনাল), শাহাদাত হোসেন তসলিম (شاہین ট্র্যাভেলস), গোলাম মোস্তফা (প্রান্তিক ট্র্যাভেলস) এবং শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমানসহ শতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, মামলার বাদি মানবপাচারের যে ভয়াবহ অভিযোগ তুলেছিলেন, তার সমর্থনে সুনির্দিষ্ট কোনো ভুক্তভোগী, প্রত্যক্ষ আইনি সাক্ষ্য বা প্রামাণ্য নথি উপস্থাপন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। তদন্তের সময় বাদির কাছে বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া কিংবা নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের নাম-পরিচয়, লিখিত এজাহার বা সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে জমা দেওয়া অভিযোগপত্র চাওয়া হলেও সেগুলোর কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করা যায়নি। ডিবি পুলিশ মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে বিস্তারিত ডিজিটাল ও অফলাইন অনুসন্ধান চালায়। সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ embassy, সরকারি নথিপত্র এবং অন্যান্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হলেও মানবপাচারের আন্তর্জাতিক অপরাধকে সমর্থন করে এমন কোনো উপাদান মেলেনি। বিদেশে পাঠানো কর্মীদের মধ্যে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ, অবৈধ আটক বা জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করার বিষয়ে মামলার মূল অভিযোগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তকারী কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত হলো, মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ধারাগুলো প্রয়োগ করার মতো আইনি উপাদান মামলায় অবশিষ্ট নেই। এই কারণে মানবপাচার সংক্রান্ত অভিযোগকে ‘তথ্যগতভাবে অসত্য বা প্রমাণহীন’ উল্লেখ করে আদালতে এই সম্পূরক প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

মানবপাচারের গুরুতর অভিযোগ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হলেও এই মেগা স্ক্যামের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে মামলাটি পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। তদন্ত নথিতে পরিষ্কার উল্লেখ করা হয়েছে, বিদেশগামী নিরীহ কর্মীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষতিসাধনের বিষয়ের প্রাথমিক সত্যতা তদন্তে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সেই কারণে দণ্ডবিধির ধারা ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ বা অর্থ আত্মসাৎ), ধারা ৪২০ (সুপরিকল্পিত প্রতারণা), ধারা ৩৮৫ ও ৩৮৬ (ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং জিম্মি করে জোরপূর্বক অর্থ আদায়) এবং ধারা ৪২৭ ও ৩৪ (আর্থিক ক্ষতিসাধন ও অপরাধ সংঘটনে একাধিক ব্যক্তির সাধারণ অভিপ্রায়) এর অধীনে ৫২ জন আসামির বিরুদ্ধে পৃথক চার্জশিট দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে বিচারিক কার্যক্রম সচল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ, আন্তর্জাতিক মানবপাচারের উপাদান না মিললেও, দেশের অভ্যন্তরে রিক্রুটিং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রতারণা ও অনিয়ম হয়েছে, সেই প্রশ্নকে পুলিশ পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাধারণ ফৌজদারি আইনে কাঠামোগত বিচারপ্রক্রিয়া সচল থাকবে। তদন্তকালে পুলিশ ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত সন্দেহে আসামিপক্ষ থেকে একটি স্যামসাং ও একটি আইফোন জব্দ করেছে, যা বর্তমানে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে রয়েছে।

তদন্তের এই নাটকীয় মোড়কে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না মামলার বাদি আলতাফ খান। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত এই ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে যে ১০০ রিক্রুটিং এজেন্সি সিন্ডিকেট করেছিল, সেই বিষয়ে মহামান্য আদালতে ১৬৪ ধারায় অলরেডি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছিলেন এজেন্সির মালিক ও মামলার অন্যতম আসামি রফিক সাহেব। এরপরও ডিবির তদন্তকারী কর্মকর্তা কিভাবে মানবপাচার মামলা থেকে সব আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করলেন, তা চরম রহস্যজনক। আলতাফ খান আরও অভিযোগ করেন, “তদন্তকারী কর্মকর্তা দীর্ঘ এই তদন্তকালীন সময়ে আমার অফিসেও একদিনের জন্যও আসেননি, আমার সাথে কোনো আনুষ্ঠানিক কথাও বলেননি। তিনি ওপরের বিশেষ মহলের নির্দেশে আসামিদের সাথে আঁতাত করে মানবপাচারের ধারায় এই ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছেন বলে আমার মনে হচ্ছে। আমি আদালতে এবারও জোর নারাজি (বিকল্প তদন্তের আবেদন) দেবো। পুলিশের তদন্তের ওপর আমার আর বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। দেশের স্বার্থে, দেশ থেকে টন টন টাকা পাচার বন্ধের স্বার্থে এবং রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের হয়রানি বন্ধের পাশাপাশি এই মামলার সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে আমি সরাসরি ‘বিচার বিভাগীয় তদন্ত’ দাবি করছি। কারণ এই ১০০ রিক্রুটিং এজেন্সি যে মানবপাচার ও মানিলন্ডারিংয়ে জড়িত, সেটি খোদ সংসদে দাঁড়িয়ে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও কয়েক দিন আগে বলেছিলেন।”

অন্যদিকে, অভিযুক্তদের মধ্যে ইউনিক গ্রুপের কর্ণধার মো: নুর আলী সিঙ্গাপুর থেকে জানান, মামলা একটি হলেও তদন্ত প্রতিবেদন দুই ধরনের এসেছে। তিনি তাঁর আইনজীবীর সাথে কথা বলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেবেন। আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো: আবুল বাশার পুলিশের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “আমরা দুই দেশের সরকারের নিয়ম মেনে সম্পূর্ণ বৈধভাবেই কর্মী পাঠিয়েছি, সবাই সেখানে ভালো আছে। এখানে মানবপাচার হলো কিভাবে? পুলিশ সত্যটিই তুলে ধরেছে।” ২০২৪ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। শ্রমবাজারের এই জটিলতা দূর করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ তাঁর প্রথম সরকারি সফরে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন, যেখান থেকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর দেশটিতে আবারও বৈধভাবে শ্রমিক যাওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে বলে সবাই আশা করছেন। তবে দেশের ভেতরের এই সিন্ডিকেট মামলার ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ আদালতের মর্জির ওপর নির্ভর করছে। আদালত চাইলে পুলিশের এই তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে মানবপাচারের ধারা বাদ দিয়ে কেবল প্রতারণার ধারায় বিচার শুরু করতে পারেন, আবার বাদিপক্ষের নারাজি আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলাটি আরও উচ্চপর্যায়ের কোনো সংস্থা বা বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন।

তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


এ জাতীয় আরো খবর...