সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ন

অদক্ষতার মাশুলে চট্টগ্রাম বন্দরের আয়ের রেকর্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি সমুদ্রবন্দরের কার্যকারিতা ও পেশাদারিত্ব পরিমাপ করা হয় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস হওয়ার পর কত দ্রুত কনটেইনার বন্দর এলাকা ত্যাগ করতে পারছে তার ওপর ভিত্তি করে। তবে দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে এই সফলতার সংজ্ঞা সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটছে। বন্দরের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় কাঠামো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এক বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নতুন ট্যারিফ বা মাশুল হার কার্যকর হওয়ার পর প্রতি টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং থেকে বর্তমানে বন্দর কর্তৃপক্ষের গড় আয় হচ্ছে ১৫২ ডলার। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই আয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশই আসছে ‘স্টোর রেন্ট’ তথা কনটেইনার দীর্ঘ সময় ইয়ার্ডে ফেলে রাখার বিপরীতে আমদানিকারকদের কাছ থেকে আদায় করা জরিমানামূলক মাশুল থেকে। ফলে বিশ্বজুড়ে যে সূচকটিকে বন্দরের চরম অদক্ষতা এবং আধুনিক সাপ্লাই চেইনের বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা হয়, সেটিই এখন চট্টগ্রাম বন্দরের আয়ের অন্যতম প্রধান ও লাভজনক উৎসে পরিণত হয়েছে। এই নেতিবাচক চিত্রটি দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা ও কাস্টমস শুল্কায়নের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ও কাঠামোগত দুর্বলতাকেই আবার সামনে এনেছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম থেকে অর্জিত রাজস্বের ওপর ভিত্তি করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিগত পাঁচ মাসের পরিচালন আয়ের এক চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সংস্থটির দ্বিতীয় বৃহত্তম উপার্জনের খাত হয়ে উঠেছে স্টোর রেন্ট। আলোচ্য পাঁচ মাসের গড় হিসাবে প্রতি টিইইউ কনটেইনারে স্টোর রেন্ট বাবদ আয় হয়েছে ৩৪ দশমিক ২৫ ডলার, যা বন্দরের মোট পরিচালন রাজস্বের ২২ দশমিক ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ আমদানিকৃত পণ্যবাহী কনটেইনার বন্দরের অভ্যন্তরে যত বেশি দিন অলস পড়ে থাকছে, স্টোর রেন্ট খাত থেকে বন্দরের আয়ের গ্রাফ ততটাই ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। অন্যদিকে বন্দরের আয়ের সবচেয়ে বড় চিরাচরিত উৎস হলো কনটেইনার লোডিং ও ডিসচার্জিং (জাহাজের নিজস্ব ক্রেন ব্যবহার করে ওঠানো-নামানো) কার্যক্রম। এই মূল খাত থেকে প্রতি টিইইউতে গড় আয় হয়েছে ৭১ দশমিক ৬৮ ডলার, যা সামগ্রিক রাজস্বের প্রায় ৪৭ শতাংশ।

এছাড়া, কুই গ্যান্ট্রি ক্রেন (কিউজিসি) চার্জ থেকে প্রতি টিইইউতে গড়ে ১৭ দশমিক ৯১ ডলার আয় হয়েছে, যা মোট পরিচালন রাজস্বের প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি। কনটেইনার ওঠানো এবং নামানোর আনুষঙ্গিক কাজ বা লিফট-অন ও লিফট-অফ কার্যক্রম থেকে প্রতি টিইইউতে গড়ে আয় হয়েছে ৯ দশমিক ৪৩ ডলার, যা মোট রাজস্বের ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। এর বাইরে অন্যান্য আয়ের খাতের মধ্যে রয়েছে এক্সট্রা মুভমেন্ট চার্জ, ওয়ার্ফ রেন্ট, হোস্টিং চার্জ এবং স্টাফিং-আনস্টাফিং মাশুল। উল্লেখ্য, এই নির্দিষ্ট বিশ্লেষণে শুধু অপারেটিং বা সরাসরি পরিচালন কার্যক্রম থেকে অর্জিত রাজস্ব বিবেচনা করা হয়েছে। ব্যাংকে রাখা স্থায়ী আমানতের সুদ (এফডিআর), বন্দর ও কাস্টমসের জমি ও স্থাপনা ভাড়া কিংবা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অ-পরিচালন খাতের বিপুল আয় এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

চট্টগ্রাম বন্দরের এই অদ্ভুত রাজস্ব মডেলের তীব্র সমালোচনা করে বন্দরের সাবেক পর্ষদ সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম জানান, স্টোর রেন্ট বা জরিমানা থেকে বেশি আয় কোনোভাবেই একটি আধুনিক বন্দরের জন্য গ্রহণযোগ্য বা গৌরবের বিষয় হতে পারে না। এটি মূলত সমগ্র সরবরাহ শৃঙ্খল ও বন্দর ব্যবস্থাপনার চরম অদক্ষতার এক নগ্ন প্রতিফলন। এই ধরনের জরিমানামূলক আয়কে অপারেটিং বা নিয়মিত পরিচালন আয়ের মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করাটাও যৌক্তিক নয়। বন্দরের অভ্যন্তরে কেন প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার কনটেইনার দীর্ঘ সময় ধরে অলস পড়ে থাকে, তা স্বাধীনভাবে খতিয়ে দেখা এখন সময়ের দাবি। এই ক্ষেত্রে কাস্টমস শুল্কায়ন প্রক্রিয়া, আমদানিকারকদের মানসিকতা, বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের অভাব ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের দায় কতটুকু, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা উচিত। স্বাভাবিক অবস্থায় একটি কনটেইনার বন্দরে পৌঁছার সর্বোচ্চ তিন দিনের মধ্যে খালাস হওয়ার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ইয়ার্ড দখল করে রাখে। অনেক আমদানিকারক বাইরে গুদাম ভাড়ার খরচ বাঁচাতে বন্দরকেই সস্তা স্টোরেজ হিসেবে ব্যবহার করেন, কারণ এখানে কম খরচে পণ্য রাখার অন্যায্য সুযোগ রয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানোর পর পণ্য খালাস সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত মোট সময় বা ‘ডুয়াল টাইম’ বন্দরের সক্ষমতা পরিমাপের প্রধান মাপকাঠি। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়কে দেওয়া এক অফিশিয়াল প্রেজেন্টেশনে বন্দর কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে প্রতিটি কনটেইনারের গড় অবস্থানকাল সাড়ে নয় দিন, যা আন্তর্জাতিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। এই দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের বড় অংশই ব্যয় হয় কাস্টমসের আমলাতান্ত্রিক শুল্কায়ন ও ছাড়পত্র প্রক্রিয়ায়। কনটেইনার খালাস দ্রুত করার লক্ষ্যে বহুল আলোচিত ‘কাস্টমস প্রি-অ্যাসেসমেন্ট’ বা পণ্য আসার আগেই শুল্ক নির্ধারণের আধুনিক ব্যবস্থা এবং ‘গ্রিন চ্যানেল’ বা দ্রুত খালাসের সুযোগের পরিধি এখনো অত্যন্ত সীমিত। অথচ কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স আগে থেকে সম্পন্ন করা থাকলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে যেকোনো পণ্যবাহী কনটেইনার ডেলিভারির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পুরোপুরি সক্ষম।

জার্মানির খ্যাতনামা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘হামবুর্গ পোর্ট কনসালটিং’ চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য যে সর্বশেষ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেছে, সেখানেও স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, নতুন কোনো অবকাঠামো নির্মাণ না করেও কেবল কনটেইনারের অবস্থানকাল বা ডুয়াল টাইম কমিয়ে এনেই বন্দরের সক্ষমতা দ্বিগুণ করা সম্ভব। মাস্টারপ্ল্যানে চট্টগ্রাম বন্দরের বার্ষিক আদর্শ পরিচালন সক্ষমতা প্রথমে ২৭ লাখ টিইইউ ধরা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল যুক্ত হওয়ার পর প্রায় ৩১ লাখ ৫০ হাজার টিইইউতে উন্নীত হয়। তবে বাস্তবে চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে প্রতি বছর তার ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত প্রায় ৩৪ লাখ টিইইউর বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে। জার্মান সংস্থার মতে, এটি মূলত বিদ্যমান অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির ওপর অতিরিক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জিত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল এই বিষয়ে ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেন, একটি বন্দরের প্রকৃত কার্যকারিতা শুধু জেটিতে আধুনিক ক্রেন বসানো বা দ্রুত জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আমদানি করা কাঁচামাল বা পণ্য কত দ্রুত কাস্টমসের জটিলতা পেরিয়ে কারখানার উৎপাদন লাইনে বা ব্যবসায়ীর হাতে পৌঁছাচ্ছে, তার ওপরই দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও ভোক্তা শ্রেণীর লাভ-ক্ষতি নির্ভর করে। বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে হলে কাস্টমস ব্যবস্থার আমূল আধুনিকায়ন ও পরীক্ষাগারগুলোর কাজের গতি বাড়ানো সবচেয়ে জরুরি। এছাড়া, চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মো. আমিরুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমদানি হওয়া কনটেইনারের অর্ধেকেরও বেশি এখনো বন্দর চত্বরের ভেতরেই খুলে সনাতন পদ্ধতিতে পণ্য খালাস করা হয়, যা আন্তর্জাতিক বন্দর ব্যবস্থাপনায় সম্পূর্ণ অপ্রচলিত ও আদিম। এই ম্যানুয়াল ব্যবস্থার কারণে পণ্যের নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতেই শিল্পমালিকদের দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়, যার খেসারত হিসেবে কনটেইনারগুলো বন্দরে আটকে থাকে এবং স্টোর রেন্টের নামে ব্যবসায়ীদের পকেট কাটা হয়।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...