অর্থনৈতিক উদারীকরণ, অভ্যন্তরীণ নীতিমালার আধুনিকীকরণ এবং উন্মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের মাধ্যমে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের লক্ষ্যে এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার মালয়েশিয়ার সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে বড় ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে ঢাকা। এই মহাপরিকল্পনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলসীমায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং দেশের অনুদ্ঘাটিত ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদ উত্তোলনে মালয়েশিয়ার শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোকে বড় ধরনের বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানানো হয়েছে। সম্প্রতি সমাপ্ত কুয়ালালামপুর সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার অত্যন্ত প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) সাথে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই বিশেষ প্রস্তাব দেন।
সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের শ্যাংরি-লা হোটেলে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র এবং প্রবাসীদের কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এই ব্যবসায়িক বৈঠকের বিস্তারিত তথ্য দেশী ও বিদেশী গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার অত্যন্ত প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি বিজনেস গ্রুপ—পেট্রোনাস গ্রুপ, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পেরোডুয়া এবং এমএমসি গ্রুপের শীর্ষ নির্বাহীদের সাথে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন। বৈঠকে বাংলাদেশের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা চাহিদা ও কর্মক্ষম দক্ষ যুব জনবলকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগের একটি সর্বাধুনিক ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নীতিগত সহায়তা (পলিসি সাপোর্ট) প্রদানের স্পষ্ট আশ্বাস দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ডেপুটি প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এবং মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার শাহানারা মনিকা উপস্থিত ছিলেন।
মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা দেশের অর্থনীতিকে আরও উদার ও উন্মুক্ত করার দিকে শক্তভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন বন্ধুরাষ্ট্রের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন এবং বাণিজ্য পরিপন্থী জটিল নিয়মকানুন বা আমলাতান্ত্রিক রেগুলেশনগুলো সহজ করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ডিরেক্টরি নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে আসাই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আর এই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে মালয়েশিয়া আমাদের জন্য অন্যতম প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি টার্গেট।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের রয়েছে এক বিশাল ভোক্তা বাজার এবং স্বাভাবিকভাবেই এখানে বিপুল পণ্যের চাহিদা রয়েছে, যা মালয়েশিয়ার এই বহুজাতিক কোম্পানিগুলো খুব সহজেই পূরণ করতে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে রয়েছে শ্রম খাতের এক বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টির চমৎকার সম্ভাবনা। একদিকে যেমন দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার চাহিদা অনেক বেশি, তেমনি অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় ও শক্তিশালী দক্ষ কারিগরি জনবল সরবরাহের সক্ষমতাও বাংলাদেশের রয়েছে। এই দুই শক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, তারা যদি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন, তবে বর্তমান সরকার তাদের সর্বোচ্চ নীতিগত সহায়তা প্রদান করবে এবং সব ধরনের বাধা দূর করে একটি প্রবৃদ্ধি-বান্ধব কাঠামো তৈরি করবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলোকে দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের কৌশলগত বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা ও চুনাপাথরের মতো দেশের ভূগর্ভস্থ অনুদ্ঘাটিত খনিজ সম্পদ নিষ্কাশন এবং পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সামগ্রিক রূপান্তরে মালয়েশিয়ার আধুনিক প্রযুক্তি ও বিপুল পুঁজি বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। উভয় দেশের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি এবং বেসরকারি খাতের স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী ও পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা দুই দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখবে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া যৌথভাবে স্বীকার করেছে যে, দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে হলে জ্বালানি খাতের এই পারস্পরিক সহযোগিতাকে অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এই ধারাবাহিকতায়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ, এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্য ও এর লজিস্টিকস খাতের অবকাঠামো শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে এর আগে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগানোর ওপর দুই দেশ বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। এর ফলে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ‘পেট্রোনাস’ এবং বাংলাদেশের ‘পেট্রোবাংলা’র মধ্যে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পথ আরও সুগম হবে এবং জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে বলে এক যৌথ বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আইনি ও দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ২০২৭ সালের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ (Free Trade Agreement) সম্পন্ন করার বিষয়ে যৌথ প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। এই চুক্তিটি হবে সম্পূর্ণ পারস্পরিক সুবিধা-সম্পন্ন, ব্যাপক এবং ভবিষ্যৎমুখী, যা বর্তমান যুগের আধুনিক বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতি ও অনুশীলনের সর্বোচ্চ প্রতিফলন ঘটাবে। দুই শীর্ষ নেতা এফটিএ চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চলমান আলোচনার অগ্রগতিতে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সাথে উভয় নেতাই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেন যে, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় এবং বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান শক্তভাবে ধরে রেখেছে।
অর্থনৈতিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও কাঠামোগত রূপ দিতে ‘মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল’ (জেবিসি) প্রতিষ্ঠার অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। এই কাউন্সিলটি মূলত দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে সক্রিয় সহযোগিতা, নতুন নতুন ব্যবসায়িক ধারণার আদান-প্রদান এবং একটি প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে, যা দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও প্রসারিত করবে। টেকসই অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে দুই দেশের নেতারা টেলিকমিউনিকেশন, জ্বালানি, অবকাঠামো (যেমন—সড়ক, সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার), বন্দর ও লজিস্টিকস, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংসহ উচ্চ-মূল্যের বিভিন্ন অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্প খাতে ব্যাপক সহযোগিতার তাগিদ দিয়েছেন।
এছাড়াও, দুই দেশের সরকারি সংস্থা, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিনিয়োগ সুবিধা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বৈশ্বিক ইসলামিক অর্থনীতির বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে মালয়েশিয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশের হালাল খাতের সামগ্রিক উন্নয়নেও দুই দেশ একযোগে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। এই লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার ইসলামিক উন্নয়ন বিভাগ (JAKIM) এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের মধ্যকার চলমান প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং হালাল সার্টিফিকেটের মানোন্নয়ন সংক্রান্ত চুক্তিগুলোকে স্বাগত জানিয়ে দ্বিপাক্ষিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর চূড়ান্ত পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার ও নিউ এজ