শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২:১০ পূর্বাহ্ন

রেকর্ড রাজস্বের আড়ালে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের খরা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৮ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, চরম মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বৈশ্বিক নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করেছে। টাকার অঙ্কে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ হলেও, এই অর্জনের আড়ালে রয়েছে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার এক দীর্ঘশ্বাস। এনবিআরের নিজস্ব সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১১ মাসে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা।

১১ মাসের হিসেবে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১০.০২ শতাংশ বা প্রায় ৩২ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। তবে সংশোধিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার মাত্র ৮১.৬ শতাংশ। এনবিআর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে নতুন বছরে এনবিআরকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে প্রায় ৪৮.৫ শতাংশ, যা কার্যত অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

১১ মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজস্ব প্রবৃদ্ধির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করেছে স্থানীয় পর্যায়ের ভ্যাট (১ লাখ ৪০ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা), আয়কর ও ভ্রমণ কর (১ লাখ ২১ হাজার ৭২ কোটি টাকা) এবং আমদানি শুল্ক ও কর (৯৯ হাজার ৪০২ কোটি টাকা)। তবে পরিসংখ্যানে একটি বড় অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য রয়েছে—আমদানি খাত থেকে মোট কর আদায় বাড়লেও, আমদানি শুল্ক আদায়ের হার কমেছে ১০.৩৪ শতাংশ। এর অর্থ হলো, দেশের আমদানি বাণিজ্য এখনো পুরোদমে চাঙা হয়নি; মূলত টাকার অবমূল্যায়ন ও উচ্চমূল্যের পণ্য আমদানির কারণে মোট আদায়ের অংক বেশি দেখাচ্ছে।

এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো বাংলাদেশের করকাঠামোর চরম ‘ভ্যাট-নির্ভরতা’। অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, একটি বৈষম্যহীন কর ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ কর (যেমন—আয়কর) থেকে বেশি রাজস্ব আসা উচিত, কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটা। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই ক্রান্তিকালে ভ্যাটনির্ভর রাজস্ব বৃদ্ধি সরকারের কোষাগার পূর্ণ করলেও, তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় আরও উসকে দিচ্ছে। আয়কর খাতে ১২.৫৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি একটি ইতিবাচক দিক হলেও, দেশের বিপুলসংখ্যক উচ্চবিত্ত ও বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি এখনো করজালের বাইরে রয়ে গেছে।

রাজস্ব ঘাটতির এই ব্যবধান সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং ঋণ পরিশোধের হিসাব—সবই এই প্রত্যাশিত আয়ের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়। রাজস্ব আদায়ের এই ঘাটতি সরকারের সামনে তিনটি কঠিন বিকল্প তৈরি করে: অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া, বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো অথবা উন্নয়ন ব্যয় কাটছাঁট করা। দুর্ভাগ্যবশত, এই তিনটি বিকল্পই বর্তমান অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরনো কৌশলে নতুন ফল পাওয়া সম্ভব নয়। কাঠামোগত সংস্কারের জন্য পাঁচটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে নজর দিতে হবে: কর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করা, নতুন করদাতা খুঁজে বের করা, অতি-ধনীদের ওপর সম্পদ কর আরোপ, ঢালাও কর অব্যাহতি প্রত্যাহার এবং বড় করখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।

পরিশেষে, আসন্ন বাজেটে এনবিআরকে শুধু ‘কাগজে-কলমে উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা’ নির্ধারণের মায়াজাল থেকে বের হয়ে আসতে হবে। রাজস্বের চাকা সচল রাখতে হলে লক্ষ্যমাত্রার পারদ না চড়িয়ে, কর আদায়ের সক্ষমতার পারদ চড়াতে হবে। অন্যথায়, প্রতি বছরের মতো এবারও বাজেট প্রণয়নের সময় এক বুক আশা এবং বছর শেষে একরাশ হতাশার সেই পুরনো বৃত্তেই ঘুরপাক খাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


এ জাতীয় আরো খবর...